Observance of Birth Anniversary of the Father of the Nation and National Children’s Day-2018
March 23, 2018
নাদেরা সুলতানা নদী
April 30, 2018

অঞ্জন আচার্য

রোকেয়ার কবিতায় আত্মনিরীক্ষণ ও সমাজ-বিশ্লেষণ ।। অঞ্জন আচার্য

পরিমাণে বিপুল নয়, বেগম রোকেয়া বা রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের সাহিত্যকর্ম। কেবল পাঁচটি গ্রন্থের লেখক তিনি। লিখতেন ‘মিসেস আরএস হোসেন’ নামে। তাঁর ওপর মাত্র ৫২ বছরের (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০-৯ ডিসেম্বর ১৯৩২) নাতিদীর্ঘ জীবন তিনি যাপন করেছেন। একই তারিখে তাঁর জন্ম এবং মৃত্যু। সাহিত্য রচনায় তিনি যত না কাজ করেছেন, তার চেয়েও অনেক বেশি রচিত হয়েছে তাঁকে ঘিরে নানা রচনা। রোকেয়া তার স্বল্পকালের আয়ুটি নিয়েও নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে পরিগণিত হতে পেরেছেন, তাঁর সৎকার্যে, প্রগতিশীল চিন্তায় এবং সমাজে সে চিন্তার প্রায়োগিক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীশিক্ষার গুরুত্বের কথা তিনি অনুভব করেছেন তীব্রভাবে। তাই বার বার সচেষ্ট হয়েছেন নারী জাগরণে শিক্ষাকে পাশে রাখতে। গড়ে তুলেছেন উদারচেতা স্বামীর স্মৃতির উদ্দেশে, ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গালর্স স্কুল’ এবং ‘আনজুমানে-খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামে একটি সংগঠন। মূলত সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কার, রক্ষণশীল ধর্মীয় চিন্তা-চেতনাকে তিনি প্রতিহত করেছেন তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক ও গভীর ধর্মানুরাগের আলোকে। তাঁর লেখনীতে ছিল যুক্তিনিষ্ঠতা ও আপসহীন দৃঢ়ব্যক্তিত্ব। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অধিকার আদায়ে তিনি তাঁর সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত, ‘রোকেয়া রচনাবলি’র পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত নতুন সংস্করণ পৌষ ১৪১৩ বঙ্গাব্দ, ডিসেম্বর ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকার কিছু অংশ এ প্রসঙ্গে আলোচিত হতে পারে- ‘বিংশ শতাব্দীর একেবারে প্রথমদিকে রোকেয়ার যখন উত্থান, তখনও বাঙালি-মুসলমান নারী ছিল অন্ধকারে, বাঙালি-মুসলমান সমাজই ছিল অন্ধকারে। সদ্য তখন ভোর হয়ে আসছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশ থেকে শুরু হয়েছিল বাঙালি-মুসলমানের বহুবিলম্বিত জাগরণ। সেই জাগরণের মধ্যে রোকেয়া নারীকেও অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রোকেয়া ছিলেন উন্মুক্ত মনের মানুষ। ফলে বাঙালি-মুসলমান নারীর মধ্যেই তিনি আবদ্ধ থাকেননি, তিনি দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব নারীর জাগরণ আকাঙ্ক্ষা করেছেন। আবার বাঙালি-মুসলমান নারী শুধু নয়-সমগ্রভাবে বাঙালি-মুসলমানের জাগরণই তিনি চেয়েছেন শেষ পর্যন্ত। সব মিলিয়ে আমরা বলতে পারি, রোকেয়া চেয়েছেন মনুষ্যত্বের উদ্বোধন। রোকেয়ার এই আকাঙ্ক্ষা কেবল স্বপ্ন মাত্র ছিল না, তা ছিল ভূমিস্পর্শী অভিযান- রোকেয়ার তাবৎ লেখালেখি, স্কুল প্রতিষ্ঠা, সংগঠন তৈরি- সবই তার সাক্ষ্য দেবে।’

 

সময়ের চেয়ে অগ্রগামী রোকেয়ার রচনা। কেবল রচনার প্রাঞ্জলতা বা প্রসাদগুণের কারণেই তিনি পাঠক-সমাজে সমাদৃত হয়েছেন তা কিন্তু নয়; বরং নিজের লেখার মাধ্যমে তিনি কালোত্তীর্ণ হতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর লেখা আজও সজীব ও সবীজ। নিজের জীবনের এত এত কাজ করার পেছনে উদ্দেশ্য যে ছিল মহৎ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুজাতুল্য মরিয়ম রশীদ মেরীকে লেখা এক ব্যক্তিগত চিঠিতে তিনি স্বগতোক্তির মাধ্যমে প্রকাশ করেন- “খোদার ফজলে পাঁচটি ক্লাস এবং ৭০টি ছোট-বড় মেয়ে, দু’খানা গাড়ি, দুই জোড়া ঘোড়া, সহিস, কোচম্যান ইত্যাদি-ইত্যাদি সব দিকে একা আমাকেই দৃষ্টি রাখিতে হয়। …ভগিনীরে! এই যে হাড়ভাঙা গাধার খাটুনি- ইহার বিনিময় কী, জানিস? বিনিময় হইতেছে ‘ভাঁড় লিপকে হাত কালা’ অর্থাৎ উনুন লেপন করিলে উনুন তো বেশ পরিষ্কার হয়, কিন্তু যে লেপন করে তাহারই হাত কালিতে কালো হইয়া যায়। আমার হাড়ভাঙা খাটুনির পরিবর্তে সমাজ বিস্ফোরিত নেত্রে আমার খুঁটিনাটি ভুল-ভ্রান্তির ছিদ্র অন্বেষণ করিতেই বদ্ধপরিকর।” এ আত্মগত উক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, রোকেয়ার আদর্শগত চেতনা, সেইসঙ্গে সেই সৎ প্রচেষ্টায় মূর্তিমান প্রতিবন্ধকতার চিরায়ত রূপ। তাই বুঝি, ৩০ এপ্রিল ১৯৩১ সালে স্নেহস্পদা মোহসেনা রহমান মোনাকে লেখা অন্য এক চিঠিতে অনেকটা শ্লেষের সঙ্গে বলেন- “আহা! ‘কেয়া টিড্ডি, কেয়া টিড্ডি কা রান!’ কত ক্ষুদ্র, কত নগণ্য মানুষ, তার আবার আশা-ভরসা! সুতরাং যে কয়দিন বেঁচে আছি খাই-দাই- আরাম করি, হাসি-খেলি, ব্যস! আর যদি পারি ত,’ প্রাণভরে একটু আল্লাহকে ডাকি। তা’ ছাই ডাকতেও ত পারি না। আমার মতো দুর্ভাগিনী, অপদার্থ বোধ হয়, এ দুনিয়ায়, আর একটা জন্মায়নি।” এ চিঠিতেই রোকেয়া তাঁর ব্যক্তিজীবনের গভীর বেদনার কথা প্রকাশ করেন। কী পিতা, কী স্বামী, কী সন্তান, কারও কাছ থেকেই তিনি এক দন্ড সুখ পাননি। তিনি বলেন- “শৈশবে বাপের আদর পাইনি, বিবাহিত জীবনে কেবল স্বামীর রোগের সেবা করেছি। প্রত্যহ টৎরহব পরীক্ষা করেছি। পথ্য রেঁধেছি, ডাক্তারকে চিঠি লিখেছি। দু’বার মা হয়েছিলাম- তাদেরও প্রাণ ভরে কোলে নিতে পারিনি। একজন ৫ মাস বয়সে, অপরটি ৪ মাস বয়সে চলে গেছে। আর এই ২২ বৎসর যাবৎ বৈধব্যের আগুনে পুড়ছি।…আমি আমার ব্যর্থ জীবন নিয়ে হেসেখেলে দিন গুনছি।”

 

রোকেয়ার জন্ম রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামের পতিত জমিদার পরিবারে। পৈতৃক নাম রোকেয়া খাতুন। পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ও মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। তিন ভাই, তিন বোন। ভাইবোনদের মধ্যে রোকেয়ার অবস্থান ছিল পঞ্চম। বড় ভাই মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের, মেজো ভাই খলিলুর রহমান আবু যায়গাম সাবের এবং সেজো ভাই মোহাম্মদ ইসরাইল আবু হাফস সাবের (ছোটবেলায় মৃত), বড় বোন করিমুন্নেসা খানম, তারপর রোকেয়া খাতুন এবং ছোট বোন হোমায়রা তোফজ্জল হোসেন। পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। তবে রোকেয়া উর্দু ছাড়াও বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি ভাষাজ্ঞান লাভ করেছিলেন। বড় বোন করিমুন্নেসা খানমের বিয়ে হয়েছিল টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ারের জমিদার গজনভী পরিবারে। বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব স্যার আবদুল হালিম গজনভী ও স্যার আবদুল করিম গজনভী ছিলেন এই করিমুন্নেসারই দুই কৃতী সন্তান। এই করিমুন্নেসার বাড়িতেই একজন ইউরোপিয়ান গভর্নেসের কাছে রোকেয়া ইংরেজি অক্ষরজ্ঞান লাভ করেন। অঙ্গ-রূপ বর্ণনায় রোকেয়া ছিলেন গৌরবর্ণা ও রূপসী। তবুও সামঞ্জস্য বয়সের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিতে পারেননি তাঁর পিতা। আর্থিক দুরবস্থার কারণে তাই ১৮৯৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে রোকেয়ার বিয়ে হয় বিহারের ভাগলপুরের অধিবাসী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেন নামের ৩৮ বছর বয়সী, বিপত্নীক, মধুমেহরোগী পুরুষের সঙ্গে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের ব্যবধান ছিল বাইশ বছর। সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন উড়িষ্যার কনিকা স্টেটের কোর্ট অব ওয়ার্ডসের নিযুক্ত ম্যানেজার। তারপর একসময় ভাগলপুরের কমিশনারের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেন। বৈবাহিক জীবনের প্রায় সবটা সময় স্বামীর রোগের সেবা করেই কাটাতে হয় রোকেয়াকে। শেষ বয়সে অন্ধও হয়ে গিয়েছিলেন সাখাওয়াৎ। বৈবাহিক-জীবনে দুটো কন্যা সন্তান জন্মেছিল। একটি পাঁচ মাস বয়সে, অন্যটি চার মাস বয়সে মারা যায়। স্বামীর মৃত্যু হয় ১৯০৯ সালের ৩ মে কলকাতায়। রোকেয়ার বয়স তখন মাত্র ঊনত্রিশ। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর প্রথম পক্ষের কন্যা ও জামাতার হাতে লাঞ্ছিত এবং বিতাড়িত হয়ে ১৯১০ সালের কোনো একসময়ে কলকাতায় আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। রোকেয়ার দাম্পত্য-জীবনের সংক্ষিপ্তসার নানা জানা-অজানা কথার উল্লেখ পাওয়া যায় ড. আহমদ শরীফের ‘নারী মুক্তি সংগ্রামী : বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন’ প্রবন্ধটিতে। সেই রচনায় তিনি উল্লেখ করেন- ‘…প্রৌঢ় বহুমূত্ররোগী সাখাওয়াতের কাছে বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যার মতো রোকেয়ার আদর-কদর নিশ্চয়ই ছিল, এ আমরা নিঃসংশয়ে মেনে নিতে পারি। কিন্তু প্রায় পিতার বয়সের রুগ্‌ণ স্বামীতে তাঁর আকর্ষণ-অনুরাগ-আসক্তি থাকা তো স্বাভাবিক নয়। কাজেই দাম্পত্য সুখ বা আনন্দ তাঁর জীবনে অনুভূত হয়নি বলেই আমরা ধরে নিতে পারি। তাঁর এক পত্রে তার সাক্ষ্যও মেলে, প্রস্রাব পরীক্ষা আর তিক্ত রস তৈরি করাই ছিল তাঁর নিত্যকার প্রধান দায়িত্ব, কর্তব্য ও মুখ্য কর্ম। …দাম্পত্য জীবনে রোকেয়ার ছিল অশেষ মানসিক দুঃখ-যন্ত্রণা এবং স্বামীর সেবা-শুশ্রূষাসম্পৃক্ত দুঃসহ শারীরিক শ্রম।’ ড. শরীফ সে প্রবন্ধে রোকেয়াকে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। তিনি আরও বলেন- “কেবল শিক্ষাই নারীকে শাস্ত্রিক, সামাজিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক অন্ধ বিশ্বাস-সংস্কার মুক্ত করতে পারে, পারে রোজগেরে স্বনির্ভর, স্বয়ম্ভর স্বাধীন জীবনযাপনের যোগ্য করে তুলতে। এ উপলব্ধি কেবল রোকেয়া মুসলিম সমাজের হয়ে নয়, কেবল বাঙলার বা ভারতের হয়েও নয়, বিশ্বের হয়েই প্রথম অনুভব-উপলব্ধি করে কলম ধরেছিলেন লেখার মাধ্যমে প্রচার ও প্রচারণা চালানোর জন্য, শিক্ষার মাধ্যমে জানিয়ে-বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। আশ্চর্য তিনি স্বরূপে অন্তরে বিদ্রোহিনী হলেও তাঁর লেখার কোথাও রোষ, উষ্মা, ক্রোধ, ক্ষোভ তেমন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে প্রকাশ পায়নি, মানে চাবুকাঘাত হয়নি, যা লিখেছেন স্থির বিশ্বাসে ও ধীরে বুদ্ধিতে বিচার-বিশ্লেষণ করে, দৃষ্টান্ত দিয়ে, যুক্তি প্রয়োগে বিশ্বাসযোগ্য ও যুক্তিগ্রাহ্য এবং পরিবারের সমাজে গ্রহণীয়, প্রয়োগযোগ্য করে লিখেছেন, বলেছেন। ক্বচিৎ বিদ্রূপ ও রোষ প্রকাশ পেয়েছে। আর বাঙলার, বাঙালির ও নারীর দুরবস্থার জন্য ক্ষোভ, দুঃখ প্রকাশ পেয়েছে। খান্দানি জমিদার ঘরের সংস্কৃতি-সৌজন্যের প্রমূর্ত প্রতীক, প্রতিভূ ও প্রতিম এক তাৎপর্যে বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতেই প্রথম দেশাচারদ্রোহী নারী, প্রতিকার প্রতিবাদ প্রতিরোধ লক্ষ্যে প্রথম আত্মোৎসর্গকারিণী, যিনি নারীকে স্বাধিকারে স্ব-ও সুপ্রতিষ্ঠাকামী অহিংস সংগ্রামী আপসহীন বিরামহীন সংগ্রামে তিনি চালিয়ে গেছেন ১৯৩২ সনের ৯ ডিসেম্বর আকস্মিক হৃদরোগে মৃত্যু মুহূর্ত অবধি। তাঁর মৃত্যুর দিনেই তাঁর টেবিলে তাঁর অসমাপ্ত প্রবন্ধ ‘নারীর অধিকার’ দেখা গেছে। তাঁর ৫২ থেকে ৫৩ বছরের জীবনে তিনি ইংরেজিতে, বাঙলায় এবং উর্দুতে কেবল নারীশিক্ষার, নারীপর্দার ও নারীমুক্তির তথা নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার কথাই বলেছেন, লিখেছেন এবং এ-ই ছিল তাঁর ধ্যানের ও অনুধ্যানের বিষয়।” সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে ড. শরীফের বিশ্লেষণ হলো, ‘রোকেয়া কবিতা, হালকা গল্প বা রসরচনা, প্রবন্ধ-উপন্যাস লিখেছেন, সবটাই লিখেছেন অভিন্ন লক্ষ্যে। নারীর পারিবারিক, সামাজিক দুঃখ-দুর্দশা নিবারণ বা বিমোচন ছিল উদ্দেশ্য। ভাইয়ের সাহায্যে ও পরে স্বামীর সহায়তায় এ উর্দুভাষী মহিলা বাঙলা ও ইংরেজি আয়ত্ত করে বাঙলায় ও ইংরেজিতে বই লিখেছেন। তাঁর ভূমিকা ছিল শাস্ত্রিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক উপযোগবিরহী বিশ্বাস-সংস্কারের বিরুদ্ধে। তিনি ছিলেন একাধারে বিদ্রোহিনী, সমাজ সংস্কারিকা, নারী অবরোধ বা পর্দামুক্তি সংগ্রামী, নারীর শিক্ষার প্রচারে-প্রসারে নিষ্ঠ, নারীকে পরিবারে ও সমাজে স্বাধিকারে স্বপ্রতিষ্ঠ এবং স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জনে স্বনির্ভর হওয়ার পন্থা আবিষ্কারে প্রেরণাদাত্র আর পুরুষ সমাজকেও বিবেক-বিবেচনায় অনুগত হয়ে নারী কল্যাণে ও মুক্তিতে এগিয়ে আসার আহবায়িকা। কাজেই তাঁর রচনামাত্রই প্রচার-প্রচারণা সঞ্চাত। অতএব গুণে-মানে-মাপে-মাত্রায় এর শিল্পমূল্য উঁচুদরের নয় বটে, কিন্তু উদ্দিষ্ট ও অন্বিষ্ট ফল দানের এবং প্রান্তিতে উপযুক্তই ছিল অর্থাৎ এর সাহিত্য মূল্য যাই হোক, সমকালীন মুসলিম সমাজের সমস্যা-সঙ্কট সম্বন্ধে চেতনা দানে এবং প্রতিকার-প্রতিরোধ পন্থা নির্দেশে তাঁর রচনা সার্থক ও সফল হয়েছিল তখনও সীমিত শিক্ষিত মুসলিম সমাজে। তাঁর রচনার ও প্রয়াসের মূল্য তাই তাঁর সমকালীন মুসলিম সমাজে অতুল্য, অনন্য এবং গোটা ভারতে কোনো মহিলার এমনি ঐকান্তিক ও একাগ্রতা ছিল দুর্লভ ও দুর্লক্ষ্য। সেদিক দিয়েও তিনি কেবল বাঙলায়, কলকাতায় নয়, সমগ্র ভারতবর্ষে ছিলেন অনন্যা, অসামান্য।’

 

রোকেয়ার সবচেয়ে অনালোচ্য অধ্যায় হয়তো তাঁর কবিতা। এর কারণ হয়তো তাঁর কোনো কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি জীবদ্দশায়। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাগুলোর মধ্যে যা যৎসামান্য পাওয়া যায়, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় পাঠককে। এ যাবৎ প্রাপ্ত প্রকাশিত সেই কবিতাগুলো পত্রিকার নাম উল্লেখপূর্বক কালক্রমিক সাজালে দাঁড়ায়- ‘বাসিফুল’, নবনূর, ফাল্গুন ১৩১০; ‘শশধর’, নবনূর, চৈত্র ১৩১০; ‘প্রভাতের শশী’, মহিলা, বৈশাখ ১৩১১; ‘পরিতৃপ্তি’, মহিলা, জ্যৈষ্ঠ, ১৩১১; ‘নলিনী ও কুমুদ’, নবনূর, আষাঢ় ১৩১১; ‘স্বার্থপরতা’, মহিলা, আষাঢ় ১৩১১; ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, নবনূর, পৌষ ১৩১১; ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, মহিলা, পৌষ ১৩১১; ‘প্রবাসী রবিন ও তাহার জন্মভূমি’, মহিলা, মাঘ ১৩১১; ‘সওগাত’, সওগাত, অগ্রহায়ণ ১৩২৫; ‘আপিল’, সাধনা, ফাল্গুন ১৩২৮; ‘নিরুপম বীর’, ধূমকেতু, আশ্বিন ১৩২৯ বঙ্গাব্দ। তবে রোকেয়া-গবেষকদের মতে, রোকেয়া গদ্যসাহিত্য রচনায় যতখানি স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন, ততটাই নিষ্প্রভ ছিলেন কবিতা রচনায়। গদ্য ‘মতিচূর’, ‘অবরোধ-বাসিনী’, উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’, রূপকধর্মী ইংরেজি রচনা Sultana’s Dream সহ বাংলা ও ইংরেজি প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও রস-রচনা প্রভৃতি সাহিত্যকর্মে রোকেয়ার যে পরিচিত অবয়ব দেখা যায়, কবিতায় সেই রূপটি প্রায় নেই বললেই চলে। কবিতায় তিনি ভিন্নরকম। প্রতিবাদী ও নারীবাদী মানুষটিকে এখানে প্রায় পাওয়াই যায় না। কবিতায় তিনি যেন কুসুম-কোমল অথবা শত আঘাতের পরে যেন এক আত্মসমর্পণকারী নারী; প্রণীত প্রার্থনায় যে প্রণত-রত। তাঁর যাবতীয় দুঃখ-যাতনার আশ্রয়স্থল। তাঁর অস্ফুট কথামালা মূলত প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে। যেমন, ‘বাসিফুল’ কবিতায় দেখা যায় কোনো এক পিসিমা তার অকালমৃত ভ্রাতৃপুত্রতুল্যের স্মৃতি রোমন্থনে শোকাতুর। মৃতের প্রতি কী এক অমোঘ টানে বন্দি। আকুলতায় বার বার কাছে পেতে চায় হারিয়ে যাওয়া পরম স্নেহের মানুষটিকে, স্মৃতিময় সেই দিনগুলো ক্রমাগত দংশন করে যেন। কিয়দংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে-

 

“পিসিমা! তোমারি তরে এনেছি এ-ফুল।”

সেই কথা পুনরায় শুনিতে পরান চায়,-

কোথা সে বালক মোর প্রেমের পারুল?

… সেই কথা শুনিতে এ পরান ব্যাকুল।

বাজে কি স্বর্গ-পুকুরে গন্ধর্বের বীণা-সুরে

“পিসিমা! তোমারি তরে এনেছি এ-ফুল?”

 

 

পাব না প্রাণের ধন, পাব না সে ফুল।

আর শুনিবে না প্রাণ সমাহিত করিবারে

অমন স্বর্গ-শিশু, বিশ্বে যে অতুল?

 

 

শুধু স্মৃতি-কুঞ্জে ফুটে আছে “বাসি ফুল”

সে মুখের স্মৃতি-সুখ ভরিয়ে রেখেছে বুক,

অঙ্কিত সে চিরতরে, হইবে না ভুল।

 

‘শশধর’ কবিতায় দেখা যায়, কবির চাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপন। চাঁদকে কবি নিজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একান্ত বন্ধু ভেবে চাঁদকে কবি বলছেন-

 

কি ভাবিছ শশধর! বসি’ নীলাসনে?

কি রেখেছ শশধর! হৃদয়ে গোপনে?

লু’কাতে পারোনি তাহা প্রভূত যতনে, আহা!

দেখা যায় কালো ছায়া ও চাঁদ-বদনে!

কি ভাবিছ শশধর! বসি যোগাসনে?

 

 

কি দেখিছ, শশধর! আমার হৃদয়?

তোমারি কলঙ্ক-সম অন্ধকারময়!

শুধু পাপ, তাপ, ভয়, শোকে পূর্ণ এ-হৃদয়,

এ নহে উজ্জ্বল শুভ্র সরলতাময়।

কি দেখিবে, শশধর, এ পোড়া হৃদয়?

 

এ নহে কোমল স্নিগ্ধ স্বচ্ছ সুনির্ম্মল,-

এ হৃদয়ে স্তরে স্তরে তীব্র হলাহল!

নৈরাশ্য বেদনা শত, কালানল-শিখা কত,

কি ক’রে দেখাব, শশি! তোমা সে-সকল?

এ নহে পবিত্র রম্য স্বচ্ছ সুনির্ম্মল!

 

‘প্রভাতের শশী’ কবিতায় দেখা যায় সকালে দৃশ্যমান মস্নান চাঁদের সঙ্গে কথা বলছেন কবি। সুন্দর সকাল হওয়ার পরও রাতের ঝলমলে চাঁদ কেন এমন শুকনো-মুখো হয়ে আছে, তা-ই জানতে চান তিনি। তাই চাঁদকে উদ্দেশ্য করে বলেন-

 

সুপ্রভাত! কেন শশি! বিষণ্ন বদন

কোন সুগভীর ভাবে হয়েছ মগন?

সারারাত জেগে এবে নিশাশেষ ভাগে

ঘুমে ঢুলু ঢুলু মরি! নিষ্প্রভ নয়ন।

 

সেই কবিতার শেষ প্যারাটিতে প্রকাশ পেয়েছে কবির চলমান কর্ম-স্বপ্ন। তাই তিনি লেখেন-

 

আর ভাই শশধর! এই আশীর্ব্বাদ কর,

পরদুঃখে পারি যেন করিতে রোদন,

জাগি দীর্ঘ শশি! দুঃখীর শিয়রে বসি

ঢালি যেন শান্তি সুধা তোমার মতন।

 

‘পরিতৃপ্তি’ কবিতাটি ‘সুখ’ নামক অলীক বস্তুটি নিয়ে রচিত। মানবজাতির কাছে গূঢ়তম তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়েছে এ কবিতাটির মধ্য দিয়ে। কবিতায় রাজা ও ভিখারির কথোপকথনের ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় প্রকৃত সুখের মন্ত্র। শত্রুকে পরাস্ত করে রাজা মহাসুখী। তার প্রসাদ নতুন সাজে সজ্জিত। রত্নখচিত সোনার সিংহাসনে তিনি উপবিষ্ট হন। বিজয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা রাজা সভাসদ নিয়ে বসেন। নিজের মতো সুখী এ পৃথিবীতে আর যেন কেউ নেই। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হয় এক ভিখারি। তার গায়ে কাপড় নেই। এই দেখে রাজা তাকে অর্থ ও কাপড় দিতে চান। কিন্তু আত্মশ্লাঘায় সেই ভিখারি তা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কোনো কিছু-ই না-থেকেও যে ভালো থাকা যায়, কোনো প্রাপ্তি না-রেখেও যে সুখী হওয়া যায়, তা-ই প্রকাশ করতে যেন এই ভিখারির আবির্ভাব। কবিতাটির শেষ পঙ্ক্তিগুলো কবির আত্মবিশ্লেষণ-

 

অনেকেই ভাবে তৃপ্তি ধনে মানে হয়,

কিছুতে নাশিতে নারে অতৃপ্তি দুর্জয়!

তৃপ্তি লভিবার তরে এটা সেটা লাভ করে,

এ শুধু মনের ভ্রম আর কিছু নয়।

তৃপ্তি বিধাতার দান, তৃপ্তি দিয়ে যে পরাণ

বিধি তুষিয়াছে- তৃপ্তি সেইখানে রয়।

 

‘নলিনী ও কুমুদ’ কবিতাটিতে ‘নলিনী’ জীবন-বিষাদগ্রস্ত, মৃত্যুপ্রত্যাশী। অন্যদিকে ‘কুমুদ’ প্রাণময়, উচ্ছল জীবনের অধিকারী। নলিনীর কাছে জীবন অর্থহীন, কুমুদের কাছে অর্থবহ। নলিনী মৃত্যুর দিন গুনে, কুমুদ তাকে বাঁচার প্রেরণা জোগায়।

 

নলিনী।

 

দুর্বল হৃদয় পারে না বহিতে দারুণ যন্ত্রণা হেন;

জীবন-সর্বস্ব হারায়েছি যদি, পরান যায় না কেন?

শরীর-পিঞ্জর এ প্রাণ-বিহগ থাকিতে চাহে না আর,

এস মৃত্যু। ত্বরা কর বিদূরিত দুঃসহ জীবন-ভার।

 

কুমুদ।

 

সখি! কি অপূর্ব শোভা স্বভাবের, দেখ দেখি, খোল অাঁখি!

 

নলিনী।

 

দেখেছি অনেক, কি দেখিব আর, এখন মরণ বাকি।

 

কুমুদ।

 

কৌমুদী-স্নাত বিশ্ব-চরাচর! যেন ডুবিয়াছে সব

রজত-সাগরে। এ পূর্ণিমা-শশী, আ মরি। কি অভিনব!

কোথা বা মালঞ্চ মধুর হাসিছে আনন্দে শতেক ফুল;

সুধাকর প্রেম-সুধা পান হেতু ব্যাকুল চকোর-কুল।

 

‘স্বার্থপরতা’ কবিতায় কবি বলতে চেয়েছেন, সত্যিকার অর্থে পৃথিবীর সবাই স্বার্থপর। আত্মতুষ্টিই আসল কথা। এ তুষ্টির জন্যই সংসারে মানুষ যাবতীয় কাজ করে যায়। কেবল রুচির ভিন্নতায় তারতম্য দেখা দেয় আত্মসুখের। মন্দ লোক যেমন নেতি কাজ করে আনন্দ পায়, ভালো মানুষ তেমনই ইতি কাজ করে সুখভোগ করে। পরার্থপরতা বলতে চূড়ান্ত অর্থে কিছু নেই।

 

দস্যু অপরের সর্বস্ব লুটিয়া

যথা পুলকিত হবে

দানবীর তথা সর্বস্ব বিলায়ে

পরম আনন্দ লভে।

শুধু বল, রুচি যেমন যাহার

তাঁর সুখ সেই মত।

কোন রোগী জল দেখি’ হয় ভীত

কেহ জলে সুখী কত!

 

 

গুবরে পোকা যত ভালবাসে শুধু

ঘৃণিত দুর্গন্ধভার।

মধুপ ভ্রমর ভালবাসে ফুল,

ফুলের অমিয় ধারা।

তাই বলি, রুচি যেমন যাহার

সেইরূপ সুখ তার

সবে স্বার্থপর, “পরার্থপরতা”

কথা শুধু ছলনার

 

গিরি কাঞ্চনজঙ্ঘা নিয়ে কবি একই নামকরণে লিখেছেন দুটি কবিতা। দুই কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে অপার সৌন্দর্যময় কাঞ্চনজঙ্ঘার অবর্ণনীয় রূপের মহিমা। তবে দ্বিতীয় ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ কবিতাটির নিচে দেখা যায় কবির লেখা একটি ছোট্ট পাদটীকা। সেখানে লেখা- ‘ঈগেলস ক্রগ’ নামক পর্ব্বত-শিখর হইতে (আকাশ নির্ম্মল থাকিলে) প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেরূপ দেখায় তদবলম্বনে রচিত। গিরি কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রায় সর্বদা মেঘের অন্তরালে লুক্কায়িত থাকে, সুতরাং তাহার দর্শন-লাভ সাধারণ ব্যাপার নহে।

 

প্রথম লেখা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ কবিতাটি শুরু হয় পরিতৃপ্তি আলোকে ব্যক্ত ধ্বনি দিয়ে এভাবে-

 

আহা!

কি শান্তির কোলে নীরবে ঘুমাও রানী।

তুষার অম্বরে ঢাকি মোহন মূরতিখানি।

নাই কি তোমার রাজ্যে জনতার কোলাহল,

গাহে না কি কলকণ্ঠ মুখর বিহগ দল?

নাই কি কুসুম তথা, -অলির ঝঙ্কার নাই?

নির্বিবাদে শিশু হেন নিদ্রিত রয়েছে তাই।

 

শেষ পঙ্ক্তিতে এসে দেখা যায় এমন সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তাতে কবি প্রণাম জানাতে। এমন বিস্ময়াভূত শিল্পকর্মের শিল্পীকে কবি উপায়িত করেছেন ‘মহাশিল্পী’ বলে। তাই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে উদ্দেশ্য করে কবি বলেন-

 

তোমার স্রষ্টারে আমি করি শত নমস্কার,

তোমা হেন গিরিকাব্য অতুল রচনা যাঁর।

ধন্য সেই মহাশিল্পী, করি তাঁরে পরণাম,

যাহার কৃপায় মম পূর্ণ হল মনস্কাম।

 

অপর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ কবিতার এক জায়গায় গুণমুগ্ধ কবি উচ্চারণ করেন-

 

ওকি ও অনেক দূরে উত্তর-গিরির চূড়ে

স্তূপাকার মুক্তা হেন ও কি দেখা যায়?

ও বুঝি কাঞ্চনজঙ্ঘা? তাই ত কাঞ্চনজঙ্ঘা।

কি হেতু ‘কাঞ্চন’ নাম কে দিল উহার?

ও ত স্বর্ণবর্ণ নয়, মুক্তা-নিভ সমুদয়

ধবল তুষার-স্তম্ভ অতি মনোহর!

মরি! কিবা সমুজ্জ্বল রবি-করে ঝলমল

করে! কত মনোরম প্রাণমুগ্ধকর!

 

‘প্রবাসী রবিন ও তাহার জন্মভূমি’ কবিতাটি মূলত বাধ্য হয়ে প্রবাসে বসবাসকারী হাজারও মানুষের স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার কবিতা। রবিন সেইসব পীড়িত, ক্ষুব্ধ অথচ প্রেমময় প্রবাসী মানুষের একজন প্রতিনিধি মাত্র। তাই তো রবিন উচ্চারণ করে- ‘বড় জ্বালা মাতঃ বিদেশে এসেছি,/বড় দুঃখে জননী গো। তোমায় ত্যাজেছি।’

 

এই লাইনটির পরেই ব্যক্ত হয় নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ- ‘তেমন মুখর স্থান কোথা কি দেখেছি?/কি যে সুখ ছিল তায় বলিতে পারি না হায়।/ওই মাতৃকোলে বসে স্বরূপ তুলেছি।/পেয়ে ঐ মাতৃবুক ভুলেছি বেদনা দুঃখ,/কুটীরে থাকিয়া মাগো! প্রাসাদ ভেবেছি।/জনম ভূমিরে হায়! সহজে কি ছাড়া যায়?/স্বর্গাধিক গরীয়সী তোমারে জেনেছি।’

 

‘আমি ও মন’ কবিতায় দেখা যায় মনের সঙ্গে মানুষের কথা বলা। এখানে ‘মন’ ঈশ্বরকে খুঁজে ফিরে, আর মনকে খুঁজে ফিরে মানুষ। এখানে ‘আমি’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে সমগ্র মানুষের আমিত্বকে। কবি তাঁর নিজের আমিকে প্রকাশ করতে প্রয়াস করেননি এ কবিতায়। বরং সমগ্র মানবজাতির আমিকে একত্রিত করতে চেয়েছেন। চঞ্চল মন কেবল ছুটে বেড়ায়, আর মানুষ তাকে কেবলই খুঁজে যায়। মনকে সে কোনোভাবেই বাঁধতে পারে না। তাই তো মানুষ বলে- ‘আত্মহারা মন! তুমি কোথায় কোথায়?/ঘুরিয়া বেড়াও তুমি কিসের আশায়?’ মন তখন উত্তর দেয়- ‘সোনার পিঞ্জরে ধরে রেখো না আমায়/আমারে উড়িতে দাও দূর নীলিমায়।’ তবে ঈশ্বরের সন্ধান পাওয়ার ব্যাকুলতা তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে কবিতার বিভিন্ন ছত্রে। ‘দেখা দাও প্রেমময়! রয়েছ কোথায়?/কোথা আছ প্রেম-সিন্ধু জগৎ-ঈশ্বর?’ বা ‘দেখা দাও প্রেমসিন্ধু জগৎ ঈশ্বর!’ বা ‘দেখা দাও দীনবন্ধু! থাক হে কোথায়?’ ইত্যাদি পঙ্ক্তিই তার স্বাক্ষর বহন করে। কবিতার উপসংহারে এসে এ কথায় উপনীত হয়, অন্য কোথাও নয়; মনের মাঝেই ঈশ্বরের আশ্রম।

 

‘সওগাত’ কবিতাটি আহ্বানের কবিতা। কবি বাঙালিদের জেগে ওঠার ডাক দেন। সবার উদ্দেশে আশার বার্তা নিয়ে বলেন- ‘জাগো বঙ্গবাসী!/দেখ, কে দুয়ারে/অতি ধীরে ধীরে করে করাঘাত।/ঐ শুন শুন!/কেবা তোমাদের/সুমধুর স্বরে বলে : ‘সুপ্রভাত!’ এখানে ‘সুপ্রভাত’ই ডালা ভরে নানা উপহার নিয়ে আসে সবার জন্য। ‘আপিল’ কবিতায় নব্য জমিদারদের চাটুকারিতাকে ব্যঙ্গ রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। কবি তাদের ‘লেজধারী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। নিজেদের উপাধি হারানোর ভয়ে ত্রস্ত এ জমিদাররা ইংরেজদের প্রসাদ লাভের আশায় কী করে নিপীড়িত, বঞ্চিত সাধারণ জনগণের বিদ্রোহ দমন করতে সচেষ্ট হয়েছিল, তার প্রচ্ছায়া এ কবিতায় পরিলক্ষিত হয়। ‘নিরুপম বীর’ কবিতায় কবি মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করা বীরদের স্তুতি গেয়েছেন। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে যে পরের জীবন রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়, তার কাছে ফাঁসির আদেশ কোনো ভীতিকর বস্তু নয়। কেননা সে মরে গিয়ে অমর হয়ে থাকতে চায়। কবিতায় ‘কানাই’ বা ‘শ্যাম’ যেন নিরন্তর সংগ্রামে রত বিপ্লবী মানুষের অন্য নাম।

 

ব্যক্তিজীবনে রোকেয়া নিজে তুমুল লড়াই করেছেন প্রতিকূল সমাজের সঙ্গে। তবে পরাস্ত হয়ে নতি স্বীকার করেননি। সরে দাঁড়াননি স্বাধীনচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা থেকে। নারী-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। তাঁর জীবনচর্চায় এবং সাহিত্যকর্মে সেসব বিষয়ই বিধৃত রয়েছে। তাঁরই আত্মদানের ফলে নারীরা আজ সমাজে অগ্রগামিনী। তাঁরই কলমের ফসলে আজ পাঠকরা ঋদ্ধ।

 

…………………………….

সুনীলের কবিতা, কবিতায় সুনীল ।। অঞ্জন আচার্য

“নিজের কবিতা বিষয়ে কিছু লেখা এক বিড়ম্বনা মাত্র। তাতে প্রকান্তরে স্বীকার করা হয় যে, আমার কবিতার বিশেষ কিছু মূল্য আছে। আমি নিজে বিশ্বাস করি, এতদিন শুধু কবিতা রচনার চর্চা করেছি মাত্র, আসল কবিতা এখনও লেখা হয়নি। এক অসম্ভব অতৃপ্তি ও যাতনা – যা অন্য কারুর পক্ষে অনুধাবন করা অসম্ভব – আমাকে একটি নতুন কবিতা লিখতে বাধ্য করে। সেটি শেষ করার পরই সেই অতৃপ্তি ও যাতনা আবার শুরু হয়। চিকিৎসার অতীত ক্ষয়রোগের মতন এরা আমার সারা জীবনের সঙ্গী থাকবে।” ‘সুনীল সম্পর্কে সুনীলের রচনা’য় এভাবেই কবি সুনীলকে আয়নার সামনে দাঁড় করান ব্যক্তি সুনীল। এই ক্ষয়রোগ প্রতিটি কবিকেই হয়ত বহন করতে হয়। সুনীলও এর বাইরের কেউ নন। তিনি বহন করেছিলেন, আর করেছিলেন বলেই তিনি প্রধানত কবি; তারপর অন্য কিছু। এ কথার গ্রহণযোগ্যতা মেলে সুনীলকে নিয়ে লেখা কবি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের একটি সমালোচনা-নিবন্ধে। তাঁর মতে – কবিতা লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছিল নেশা। গল্প, উপন্যাস লেখা ছিল তাঁর (সুনীল) পেশা বা কাজ। [সূত্র : ভ্রাম্যমাণ লেখকের স্মৃতিসঞ্চয়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, বইয়ের দেশ, এপ্রিল-জুন ২০১০, পৃষ্ঠা ৩৭]। অর্থাৎ অর্থের জন্য সাহিত্যের নানাবিধ শাখায় বিচরণ করলেও কবিতার অঙ্গণটি ছিল সুনীলের একান্ত আপন। বলতে গেলে সেই রহস্য গভীর গোপন।

১৯৫২ সালের ২৯ মার্চ সংখ্যার দেশ পত্রিকা। সেখানেই প্রথম প্রকাশিত হয় সুনীলের কবিতা। দেশ-এর বয়স তখন ১৮। আর কবির বয়স ছিল ১৭। কবিতার নাম ‘একটি চিঠি’। তখনও কবির নামের পেছনে ঝুলে ছিল ‘কুমার’ শব্দটি। এরপর ১৫ জানুয়ারি ১৯৫৫ সংখ্যায় ‘কুমার’ শব্দটি খসে পড়ে কবির নাম থেকে। নাম হয় শুধুই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। প্রথম লেখাটি ছিল এক কিশোরীর মন পাওয়ার আশায় রচিত। কারণ সুনীল জানতো, সেই কিশোরীর বাসায় অন্যান্য পত্রিকার সাথে রাখা হতো ‘দেশ’ পত্রিকাটি। তাই তার মন পাওয়ার জন্য অথবা নিজের অব্যক্ত কথা ব্যক্ত করার জন্য বের করলো অভিনব এক বুদ্ধি। নিজেকে কবি হিসেবে কিশোরীর কাছে পৌঁছানোর অন্য কোনো উপায় না পেয়ে একরকম পথ বেছে নেন তিনি। সুনীলের নিজের কথায়Ñ “একটি রচনা ঝোঁকের মাথায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ‘দেশ’ পত্রিকায়। কবি-খ্যাতির আশায় নয়, শুনেছিলাম, কোনো লেখা ছাপা হলে সেই পত্রিকা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয়, সত্যিই ডাকযোগে একদিন ‘দেশ’ পত্রিকার একটি প্যাকেট পেলাম। আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৫১ সালের কোনো এক মাসের ‘দেশ’ পত্রিকায়, কবিতার নাম ‘একটি চিঠি’ (দেশ পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক হর্ষ দত্তের হিসেব মতে ১৯৫২ সালের ২৯ মার্চ সংখ্যা; সূত্র : “প্রিয় ‘দেশ’, প্রিয় মানুষ”, হর্ষ দত্ত, দেশ, ১৬ কার্তিক ১৪১৯, ২ নভেম্বর ২০১২, ৮০ বর্ষ, ১ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ৪০)। বন্ধুবান্ধব এবং সেই কিশোরী আমায় বলেছিল দেখেছ, দেশ-এ একজন একটা কবিতা লিখেছে। ঠিক তোমার সঙ্গে নাম মিলে গেছে। আমিই যে ওটা লিখতে পারি কেউ কল্পনাও করেনি, আমিও বলিনি।” প্রথম কবিতা প্রকাশের আরও কিছু তথ্য জানা যায় সেসময়ে ‘দেশ’ পত্রিকার কবিতা বিভাগের সম্পাদক কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর এক লেখায়Ñ “আমি এককালে দীর্ঘ পঁচিশ বছর দেশ পত্রিকায় কবিতাবিভাগ সম্পাদনা করেছি। একদিন ফাইল খুলে দেখি প্রচুর কবিতা জমে আছে। কিছু কবিতা মনোনীত হত, অমনোনীত কবিতা ডাকটিকিট থাকলে ফেরত পাঠানো হত, নাহলে ফেলে দিতে হত। সেখানে সুনীলকুমার গঙ্গোপাধ্যায় নামে একজনের কবিতা আমার খুব ভাল লেগে যায়। আমি সেই কবিতাটি মনোনীত কবিতার ফাইলে রেখে দিই। …নতুন কেউ ভাল লিখছে, এ তো খুবই আনন্দের। আমি তখন সুনীলকে একটা চিঠি লিখি, ঠিকানা দেওয়া ছিল তো। সুনীল পরে আমাকে বলে যে, চিঠিটা পেয়ে সে খুব সঙ্কোচ বোধ করেছিল। সুনীল আর সেই চিঠির কোনও উত্তরই দেয়নি।” [সূত্র : কখনও মানুষে বিশ্বাস হারায়নি, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সংখ্যা : প্রগুক্ত, পৃষ্ঠা : ২৭]।

কবিতাটি যে সুনীল সেই কিশোরীর উদ্দেশেই লিখেছিলেন তা তিনি ওই বয়সে না হোক; পরে অবশ্য অকপটেই স্বীকার করেছেন তাঁর অনেক লেখায়। তা ছাড়া সেসময় প্রেমের ক্ষেত্রে কবিদের পাতে মোটামুটি ভাত জুটতো বলা যায়। আর সাহিত্য-প্রেমী নারীদের কাছে তো কথাই নেই। যাই হোক, হুট করে একদিন দেশ পত্রিকার দফতরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো কবিতা, ছাপাও হয়ে গেল। তবে ঘটনা অন্য জায়গায়। সেই কবিতা দেখিয়ে ওই কিশোরী এসে সুনীলকে বলেছিলÑ “দেখো দেখো, দেশ পত্রিকায় একজনের কবিতা বেরিয়েছে। তার নামও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।” দেখ কা-! যে কিশোরী এ কথাগুলো বলছিল তার চোখের সামনেই যে স্বয়ং কবি দাঁড়ানো তা তাকে কে বোঝায়? তার ওপর মেয়েটি জানতেও পারেনি সেই কবি তার উদ্দেশ্যেই এ কবিতা লিখেছেন। নিজের কবিতার বিষয়ে অক্লেশে বলে গেছেন সুনীল, কোনো রাখঢাক কখনো কোথাও ছিল না (কেবল নীরা-বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর ছাড়া, এ প্রশ্নে সুনীল বরাবরই বড় রহস্যময় ছিলেন)- “আমি প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করি একটি মেয়েকে উদ্দেশ করে, আমার বয়েস তখন পনেরোর একটু কম (হিসেব অনুযায়ী ১৭)। কিন্তু কথা হচ্ছে এই, হঠাৎ আমি কবিতা লিখতে শুরু করলাম কেন? আমাদের বংশে বা পরিবারে কেউ কখনো লেখক ছিলেন না। সাহিত্যানুকূল আবহাওয়া ছিল না আমাদের বাড়িতে। আমার ধারণা থাকা স্বাভাবিক ছিল যে, কবিতা রচনা অন্য একপ্রকার মনুষ্যজাতির কাজÑ কারণ আমার চেনাশুনো আত্মীয়স্বজন, বাবা-কাকা-জ্যাঠামশাইরা আহার-বাসস্থান সংগ্রহেই ব্যতিব্যস্ত। তবে আমার মধ্যে দুর্বলতা হঠাৎ জেগে উঠলো কীভাবে?” [সূত্র : কবিতার সুখ-দুঃখ, যুগলবন্দী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা- ৭৩; প্রথম দে’জ সংস্করণ : শ্রাবণ ১৪০২, আগস্ট ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ৯]

এ প্রসঙ্গে সুনীল তাঁর ‘সাহিত্যের কোন শর্ত নেই গ্রন্থের, ‘স্বীকারোক্তি, স্মৃতি, স্বপ্ন’ শিরোনামের লেখায় এভাবেই উত্তর দিয়েছেন নিজেÑ “দুটি কারণে আমি প্রথম কবিতা লিখি। প্রথম যে বালিকার প্রণয়ে লিপ্ত হই সে কবিতা পড়তে ভালবাসতÑ সে আমাকে যেসব চিঠি লিখত, তার অধিকাংশই কবিতার লাইনে সাজানো। সুতরাং তাকে মুগ্ধ করার জন্য স্বরচিত কবিতায় একবার চিঠি লেখার কথা মাথায় এল। এই সময়েই ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরবর্তী ছুটিতে, আমার বাবা আমাকে দুপুরবেলা বাড়িতে আটকে রাখবার জন্য টেনিসনের কবিতা অনুবাদ করতে দিতেন। কয়েকদিন বাদেই আমি নিজেই একটি কবিতা টেনিসনের বলে চালিয়ে দেই। সেটাই সন্ধেবেলা সেই বালিকাটির হাতে দিই, আমার নতুন চিঠি হিসেবে। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না ওটা পুরোপুরি আমার লেখা। তখন কবিতাটি কপি করে ডাকে পাঠিয়ে দিই ‘দেশ’ পত্রিকার ঠিকানায়। … ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয় আমার কবিতা, নাম ‘একটি চিঠি’। তখন আমি কলকাতার রাস্তাঘাটও ভাল করে চিনি না, ‘দেশ’ পত্রিকার কার্যালয় কোথায় তাও জানি না। আমি শুধু বন্ধুদের ও সেই বালিকাটিকে দেখাতে চেয়েছিলাম যে, ঐ কবিতাটি আমারই লেখা এবং কবিতা লেখা ব্যাপারটা এমন কিছু শক্ত না।” [সূত্র : কালের খেয়া, সমকাল, ২ নভেম্বর ২০১২, পৃষ্ঠা : ৬]। উল্লিখিত গ্রন্থেরই ‘আমি’ শিরোনামের অন্য এক লেখায় সুনীল প্রসঙ্গটির উল্লেখ করে লিখেছেনÑ “একটি কিশোরীকে হকচকিয়ে দেবার জন্য আমার জীবনের প্রথম কবিতাটি ডাকে পাঠিয়েছিলাম সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় এবং কী আশ্চর্য, ছাপাও হয়ে গিয়েছিল! সেই সদ্য স্কুল-উত্তীর্ণ বয়সে আমার সাহিত্যচর্চার মনোনিবেশ করার জন্য তেমন আগ্রহ ছিল না। আমি ছিলাম বুভুক্ষু পাঠক এবং সুচতুর বইচোর, নিজে কখনও গ্রন্থ রচনা করব, এমন স্বপ্নেও ভাবিনি। কলেজে এসে কয়েকজন সহপাঠী ও বন্ধুকে দেখেছি কবিতা লেখার জন্য তারা অন্যদের কাছ থেকে কিছুটা খাতির পায়, তখন আমার মনে হয়েছিল, ও আর এমন কী শক্ত কাজ। আমিও পারি।” [সূত্র : শ্রদ্ধাঞ্জলি : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমকাল, ২৪ অক্টোবর ২০১২, পৃষ্ঠা : ৫]

এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, কবি হওয়ার জন্য সুনীল মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। কবিতার আশপাশে ঘুরতে দেখা যায়নি তাকে কিশোর বয়সে। কবি হওয়ার স্বপ্ন তো দূরে থাক, বরং জীবনে তার স্বপ্ন ছিল জাহাজের খালাসি হয়ে দেশে দেশে ভ্রমণ করার। ছাত্র বয়স থেকেই পায়ের তলে সর্ষে নিয়ে হুটহাট বেড়িয়ে পড়তেন সুনীল। নিজেই বলতেন, লেখক হওয়ার কোনো দুরাকাক্সক্ষা ছিল না তাঁর। কলেজ-জীবনেও তাঁর সেই জাহাজের খালাসি হওয়ার স্বপ্নটা জিইয়ে ছিল। জাহাজের খালাসির চাকরি অবশ্য তাঁকে করতে হয়নি। তবে বাংলা সাহিত্য পেয়েছে দিকশূন্যপুর যাত্রী নীললোহিতকে। নতুন কোথাও বেড়ানোর নেশা আমৃত্যু লালন করে গেছেন তিনি। আনন্দবাজার পত্রিকায় ২৬ অক্টোবর ২০১২ সালে প্রকাশিত সম্পাদকীয় পাতায় ‘শ্রী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’ শিরোনামে যে স্মরণ অংশটি প্রকাশিত হয় যেখানেও উঠে আসে সুনীলের আমৃত্যু বহেমিয়ান চরিত্রÑ “ছাত্র বয়স থেকেই হুটহাট বেরিয়ে পড়তেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই বাউ-ুলেপনা কোনও দিন থামেনি। সাঁওতাল পরগনা থেকে প্যারিস, নিউইয়র্ক থেকে শান্তিনগরÑ সুনীলের উৎসাহ সমান।” সুনীলের আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তিÑ “অনেক লেখকের খুব বাল্যকাল থেকে সাহিত্য রচনার দিকে অনেক ঝোঁক দেখা যায়। আমার ছিল না। আমি বই পড়তে ভালবাসতাম, বই লেখার দায়িত্ব অন্য লোকের। আমার ঝোঁক ছিল নানারকম অ্যাডভেঞ্চারের দিকে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমি কোনও না কোনও বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ-হঠাৎ বাইরে কোথাও চলে যেতাম। এমনও হয়েছে, সিমলা শহরের স্ক্যান্ডাল পয়েন্টে বসে বিখ্যাত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছি আমি আর আমার বন্ধু দীপক মজুমদার, পেটে দাউদাউ করে জ্বলছে খিদের আগুন, পকেটে একটাও পয়সা নেই, রাত্তিরে কী খাব তার ঠিক নেই। শুধু সঙ্গে আছে একটি রেলের পাস, তাও অন্যের নামে, সেটার সাহায্যে আমরা যে কোনও জায়গায় চলে যেতে পারি। …অনেকের মতো আমারও ছেলেবেলা থেকেই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। জাহাজে আলুর খোসা ছাড়াবার চাকরি নিয়েও কোনও একদিন বিদেশে যাব, এ রকম ভেবে রেখেছিলাম এবং আর ফিরব না। সত্যি সত্যি বিদেশে যাবার কিছুদিন পরেই আমি ছটফটিয়ে উঠেছিলাম, আমার মন টেকেনি। তখন আমার কোনও বন্ধন ছিল না। যে কোনও ছুতোনাতায় বাইরের যে কোনও দেশে পাঁচ-সাত বছর কাটিয়ে দেওয়া যেত অনায়াসেই, কিন্তু বাংলা ভাষা আমার মর্মে এমন গেঁথে গেছে যে এই আবর্জনা-ভরা, শত অসুবিধেয় ভরা কলকাতা ছেড়ে কিছুতেই বেশি দিন দূরে থাকতে পারি না।”

‘চলে গিয়েও সুনীল রয়ে গেল’ শিরোনামের লেখায় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখাটি শুরু করেছেন এভাবেÑ “যখন এ লেখা লিখছি, তখন সুনীল বড় একা হয়ে শুয়ে আছে ঠান্ডা ঘরে, পিস হাভেনে। ডোরবেল বাজিয়ে কেউ আসবে না আজ। সুনীল উঠে গিয়ে দরজা খুলে প্রসন্ন মুখে বলবে না, আরে, এসো এসোÑ! … বেড়াতে যেতে বড় ভালবাসত সুনীল। নতুন অচেনা কোনও জায়গায় যাওয়ার কথা শুনলেই উজ্জ্বল হয়ে উঠত চোখ। আজও সুনীল চলল নতুন এক দেশে।” [সূত্র : চলে গিয়েও সুনীল রয়ে গেল, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, দেশ, ১৬ কার্তিক, ১৪১৯; ২ নভেম্বর ২০১২; ৮০ বর্ষ; ১ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ২৩]

ব্যক্তি সুনীল প্রসঙ্গে শীর্ষেন্দু লিখেছেনÑ “মানুষ সুনীলকে যাঁরা জানেন, তাঁরাই খবর রাখেন, এই মানুষটির হৃদয়বত্তা কত গভীর ছিল। অর্থী প্রার্থীকে সে ফেরায়নি কোনওদিন। বেশ কয়েক বছর আগে ও বেকার ছেলেদের অকাতরে জাহাজভাড়া আর এক হাজার টাকা করে দিয়েছিল আন্দামানে গিয়ে চাকরি বা কাজ করার জন্য। তখন আন্দামানে কাজের লোকের খুব চাহিদা ছিল। গাঁয়ের গরিব মেয়েদের সাহায্যার্থে খুলেছিল ‘পথের পাঁচালী’ নামে একটা সংস্থা, বনগাঁয়ে। কত মানুষকে যে গোপনে সাহায্য করেছে তার ইয়ত্তা নেই। বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও আমি তাই বারবার সুনীলকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম।” [সূত্র : প্রগুক্ত, পৃষ্ঠা : ২৫-২৬]

আর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কথায়Ñ “সুনীল খুব বড় মাপের লেখক, আবার খুব বড় মনের মানুষও বটে। ওর সমসাময়িক যাঁরা সাহিত্যিক, ও চেয়েছে তাঁদের প্রাপ্যটা যেন তাঁরা পান। ওর মধ্যে কখনও ঈর্ষা, হিংসা দেখিনি। ওর চেয়ে বয়েছে যারা ছোট, তাদের দিকে ও সবসময়ই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু যে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাক, তা নয়, সংসার চালানোরও একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া! যাতে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে। এসব ব্যাপারে প্রখর নজর ছিল সুনীলের। … এখান থেকেই বলা যায়, সুনীল ভালবাসাকেই তার ধর্ম বলে মেনে এসেছেন। ও বিশ্বাস করত, ভালবাসার ওষুধ প্রয়োগ করে মানুষের সব অসুখ সারিয়ে তোলা যায়! ধর্মে বিশ্বাস না করুক, ঈশ্বরে বিশ্বাস না করুক, কিন্তু ভালবাসায় বিশ্বাসী। আসলে, কবিদের কাছাকাছি পৌঁছতে হলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের একটা মইয়ের প্রয়োজন হয়, নইলে নাগাল পাব না তো! …সুনীল ঘোষিত নাস্তিক।… সুনীল নাস্তিক হলেও, মানুষের কল্যাণ কামনা করত সব সময়। যদি আমরা ঈশ্বরকে মঙ্গলময় বলে ভাবি, তবে মানুষও তো সেই ঐশ্বরিক দায়িত্বটা নিতে পারে। সুনীল তো মানুষে বিশ্বাস হারায়নি কখনও, অনেক মানুষের অনেক কুকীর্তি সে প্রত্যক্ষ করেছে, তা সত্ত্বেও মানুষের প্রতি ভালবাসা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল। সে দুঃখবাদীও নয়, হতাশাবাদীও নয়, সুনীল অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ এবং মানুষ সম্পর্কে তার আশা ভরসাকে সে শেষদিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল।” [সূত্র : কখনও মানুষে বিশ্বাস হারায়নি, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সংখ্যা : প্রগুক্ত, পৃষ্ঠা : ২৮-৩০]

আসা যাক সুনীলের কবিতা প্রসঙ্গে। সুনীলের প্রকাশিত সামগ্রিক কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : ‘একা এবং কয়েকজন’, ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’, ‘বন্দী, জেগে আছো’, ‘আমার স্বপ্ন’, ‘সত্যবদ্ধ অভিমান’ (শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘যুগলবন্দী’ গ্রন্থের সুনীলের কবিতাংশ), ‘জাগরণ হেমবর্ণ’, ‘দাঁড়াও সুন্দর’, ‘মন ভালো নেই’, ‘এসেছি দৈব পিকনিকে’, ‘দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়’, স্বর্গ নগরীর চাবি’, ‘সোনার মুকুট থেকে’।

সুনীলের কবিতা প্রসঙ্গে বলতে হয় তাঁর প্রতিটি কবিতাই আত্মস্বীকারোক্তিমূলক। সুনীলের এমন কোনো কবিতা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তিনি নিজে উপস্থিত নন। এজন্যই তাঁর কবিতাগুলো উত্তমপুরুষে (আমি, আমার, আমাকে, আমায় প্রভৃতি) লেখা। সুনীলের ভাষায়, “আমার প্রতিটি কবিতাই আমার জীবনযাত্রার প্রতিফলন, সেই জন্যেই আমি একাধিক জায়গায় বলেছি, আমার কবিতাগুলো স্বীকারোক্তিমূলক!” অকপটেই তিনি স্বীকার করেছেন, “আমার এমন একটিও কবিতা নেই, যে কবিতায় আমি ‘আমি’ শব্দটা অন্তত একবারও ব্যবহার করিনি।” সুনীলের সরল দাবি, “আমি তো কবিতাতে আমার জীবনকেই ব্যবহার করেছি। আড়াল করিনি।”

কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক :

আমারও আকাক্সক্ষা ছিল সূর্যের দোসর হবো তিমির শিকারে
সপ্তাশ্ব রথের রশি টেনে নিয়ে দীপ্ত অঙ্গীকারে।
অথচ সময়াহত আপাত বস্তুর দ্বন্দ্বে দ্বিধান্বিত মনে
বর্তমান-ভীত চক্ষু মাটিতে ঢেকেছি সঙ্গোপনে।
[প্রার্থনা, একা এবং কয়েকজন]

অথবা,
আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ
এই কি মানুষজন্ম? নাকি শেষ
পুরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধেবেলা
আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা
করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে
থাকিÑ তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে।
[আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি, আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি]
অথবা,
আমি ভয়ে কেঁপে উঠি, আমি জানি, আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই, গিয়ে বলি,
নীরা, তুমি মন খারাপ করে আছো?
লক্ষ্মী মেয়ে, একবার চোখে চাও, আয়না দেখার মতো দেখাও ও মুখের মঞ্জরী
নবীন জলের মতো কলহাস্য একবার বলো দেখি ধাঁধার উত্তর!
[নীরার অসুখ, বন্দী, জেগে আছো]

অথবা সেই অমোঘ উক্তি,

আমার ভালোবাসার কোনো জন্ম হয় না
মৃত্যু হয় নাÑ
কেননা আমি অন্যরকম ভালোবাসার হীরের গয়না
শরীরে নিয়ে জন্মেছিলাম।
[জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না, আমার স্বপ্ন]

অথবা পাঠকপ্রিয় সেই উক্তি,

এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?
… এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়? [সত্যবদ্ধ অভিমান, সত্যবদ্ধ অভিমান]

কিংবা বলা যায়,

পাঁচজনে বলে পাঁচ কথা, আমি নিজেকে এখনো চিনি না।
চেয়েছিলাম তো সকালবেলার শুদ্ধ মানুষ হতে
দশ দিকে চেয়ে আলোর আকাশে আয়নায় মুখ দেখা
আমিও ছিলাম, আমিও ছিলাম, এই সুখে নিঃশ্বাস।
[আমিও ছিলাম, জাগরণ হেমবর্ণ]

অথবা উল্লেখ করা যেতে পারে,

আমি তো মৃত্যুর কাছে যাইনি, একবারও,
তবুও সে কেন ছদ্মবেশে
মাঝে মাঝে দেখা দেয়!
এ কি নিমন্ত্রণ, এ কি সামাজিক লঘু যাওয়া আসা?
হঠাৎ হঠাৎ তার চিঠি পাই, অহংকার
ন¤্র হয়ে ওঠে
যেমন নদীর পাশে দেখি এক নারী
তার চুল মেলে আছে
[দেখি মৃত্যু, দাঁড়াও সুন্দর]

কিংবা উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়,

যতদিন পারি আমার নীল পেয়ালায়
পান করে যাবো ক্ষণিকের কৌতুক
বাসনা আমার, হে মর্ত্য লোভী বাসনা,
বিশাল ডানায় সন্ধ্যা যে মধুভুক্্
বিহঙ্গমের বন্দনা গান গায়Ñ
বাসনা আমার, হে মর্ত্য লোভী বাসনা,
তাকে কি পারি না দিতে আমি যৌতুক
এই পৃথিবীটা নিত্য অবহেলায়
বারে বারে ভরে অনিত্য নীল পেয়ালা!
[বাসনা আমার, মন ভালো নেই]

অথবা,
হে উত্তরের জানালার ঝিল্লি, হে মধ্যসাগরের অভিযাত্রী মেঘদল
হে যুদ্ধের ভাষ্যকার, হে বিবাগী, হে মধ্য বয়সের স্বপ্ন, হে জন্ম
এত অসময় নিয়ে, এমন তৃষ্ণার্ত হাসি, এমন করুণা নিয়ে
কেন আমাকে জড়িয়ে রইলে,
কেন আমাকে…
[আমাকে জড়িয়ে, এসেছি দৈব পিকনিকে]

অথবা,
একটা মাত্র জীবন তার হাজার রকম দুনিয়াদারি
এক জীবনে চক মেলানো উল্টো সোজা দিলাম পাড়ি
পায়ের তলায় মায়া সর্ষে, পায়ের তলায় ঝড়ের হাওয়া
ফুলঝরানো দিনের শেষে ফুল-বিলাসী কুহক পাওয়া
একটা মাত্র জীবন তার হাজার রকম দুনিয়াদারি!

স্বপ্নে আমার জীবনটাকে বদলেছিলাম সহ¯্রবার
স্বপ্ন ভাঙা অন্যজীবন ভাঙলো কত বন্ধ দুয়ার
এদিক ওদিক তাকাই আমার কুল মেলে না দিক মেলে না
খরচ হলো এক আধুলি খাতায় লেখা রাজ্য দেনা
একটা মাত্র জীবন তার হাজার রকম দুনিয়াদারি!
[একটা মাত্র জীবন, দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়]

অথবা সুনীলের সেই চির অম্লান কবিতা,

ভারতবর্ষের মানচিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম
নিঃশব্দ রাত্রির দেশ, তার ওপরে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ
অদূরে খাজুরাহো মন্দিরের চূড়া
মিথুন মূর্তিগুলো দেয়াল ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠেছে আকাশে
নীল মখমলে শুয়ে নক্ষত্রদের মধ্যে চলছে শারীরিক প্রেম
আমি যে-কোনো দিকে যেতে পারি
অথচ আমার কোনো দিক নেই!
[ভারতবর্ষের মানচিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে, স্বর্গ নগরীর চাবি]

আমাদের পদধ্বনি শুনে থেমে যায় ঝিল্লিরব
আঁধার উজ্জ্বল হলো আমাদের নিজস্ব মশালে
শরীরের রোমহর্ষ, প্রথম শীতের ¯িœগ্ধ স্বাদ
পুরোনো কালের সেই শতরঞ্জি, খুবই যেন
চেনাশুনো ধুলো
[বন্ধু-সম্মিলন, সোনার মুকুট থেকে]

কবিতা লেখার বিষয়ে সুনীলের সুন্দর একটি পঙ্ক্তি আছে। সেখানে প্রকাশ পেয়েছে কবিতার প্রতি এ কবির সুন্দর ভালোবাসা।

কবিতা লেখার চেয়ে কবিতা লিখবো এই ভাবনা
আরও প্রিয় লাগে

মনে ফুরফুরে হাওয়া, এবার কবিতা, একটি নতুন কবিতা…
তবু আমি কিছুই লিখি না
কলম গড়িয়ে যায়, ঝুপ করে শুয়ে পড়ি, প্রিয় চোখে
দেখি সাদা দেয়ালকে, কবিতার সুখস্বপ্ন
গাঢ় হয়ে আসে, মনে মনে বলি, লিখবো
লিখবো এত ব্যস্ততা কিসের
[কবিতার লেখার চেয়ে, দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়]

নিজের সেরা লেখাটির লেখার তৃষ্ণা সব লেখকের মধ্যে বাস করে। সুনীলেরও তেমনটি অত্যন্ত তীব্রভাবে। নিজের সেরা লেখাটি উপহার দেওয়ার বুভুক্ষা প্রতিটি কবিমনেই চলতে থাকে আমৃত্যু। এ যেন এক দিকশূন্যপুরের পথে অক্লান্ত যাত্রা।

সেই লেখাটি লিখতে হবে, যে লেখাটি হয়নি
এর মধ্যে চলছে কত রকম লেখালেখি
এর মধ্যে চলছে হাজার হাজার কাটাকাটি
এর মধ্যে ব্যস্ততা, এর মধ্যে হুড়োহুড়ি
এর মধ্যে শুধু কথা রাখা আর কথা ভাঙা
শুধু অন্যের কাছে, শুধু ভদ্রতার কাছে, শুধু দীনতার কাছে
কত জায়গায় ফিরে আসবো বলে আর ফেরা হয়নি
[সেই লেখাটা, দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়]

সুনীলের প্রিয় ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুর পর স্মরণ সংখ্যায় ‘একা এবং কয়েকজন’ শিরোনামের সম্পাদকীয় লেখাটি তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। সেই লেখাটিতে প্রকাশিত হয়েছে প্রয়াত কবি সুনীল সম্পর্কে মোটা দাগে অনেক জানা-অজানা কথা, মৃত্যু-পূর্ব ও মৃত্যু-পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনার বহুলীকরণÑ “কবির মৃত্যুতে রোরুদ্যমান এই শহর। কারণ, তিনি সেই কবি, যাঁর চিন্তাচেতনা জুড়ে ছিল সর্বজনীনতার ভাব। সৌজন্য ও সৌহার্দের বিষয়ে যিনি ছিলেন সর্বাগ্রগণ্য, সেই কবির অন্তিমযাত্রা উপলক্ষে তাঁর নিজের প্রিয় শহরে তাঁকে ‘আমাদের লোক’ বলে প্রতিপন্ন করার প্রয়াসটি কারও চোখ এড়ায়নি। আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে এরাজ্যের বামপন্থী নেতৃবর্গ মার্কিনপন্থী এক ভোগবাদী সাহিত্যিক বলেই জ্ঞান করতেন। কবিতার অনুবাদ সংক্রান্ত স্কলারশিপ নিয়ে মার্কিন মুলুকে যাওয়াই হোক অথবা মার্কিন কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে সখ্যÑ বঙ্গজ বামপন্থীদের চোখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন ¯্রফে সিআইএ-র একজন দালাল বই কিছু নন! তাঁর বিরুদ্ধে চরবৃত্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রমাণ না মিললেও, তাঁকে ও তাঁর সৃষ্টিকে নিয়মিত গালমন্দ করে গিয়েছেন বামপন্থীরা। তাতে অবশ্য বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি কবি। প্রতিবাদ করার প্রয়োজনও অনুভব করেননি। কারণ, আজীবন তিনি বিশ্বাস করেছেন তিনি কবি, রাজনীতির কারবারি নন। তাই রাজপথের মিছিলে পা মেলানোর চেয়ে কলম ধরতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ। এখানে তিনি অক্লান্ত, অপ্রতিরোধ্য। সেই সময়েই তাঁর জনপ্রিয়তা, মানুষের সঙ্গে নাড়ির যোগ রেখে চলার অপার আগ্রহ দেখে চোখ ট্যারা হয়ে গিয়েছিল তদানীন্তর শাসক দলের। টনক নড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁকে নিয়ে যে পড়ে গেল কাড়াকাড়ি অবস্থা! বস্তুত, তিনি যখন স্বীয় প্রতিভায় মানুষকে কাছে টানতে পেরেছেন, তখন তাঁর সেই জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক কৌশলে কাজে লাগাতে চেয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদলের প্রতিভূরা। সেদিন থেকেই কবিকে করে নিলেন তাঁদের ঘরের লোক! আবার ঘোষিতভাবেই তিনি পরিবর্তনপন্থী ছিলেন না। বরং, সুনীল লিখেছিলেন, বাম-জমানার পরে যারা এরাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারে, তাদের কথা ভাবতে গেলে তাঁর বিবমিষা হয়। এরাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের নীতির একজন দৃঢ় ও কঠোর সমালোচক ছিলেন কবি। ফলে তাঁর সঙ্গে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্কে শৈত্য থাকাই হয়তো স্বাভাবিক ছিল। সুনীলের সমালোচনায় গাত্রদাহের কারণ ঘটেছিল বলেই তাঁকে শিশু-কিশোর অকাদেমির সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিতে সৌজন্য-শিষ্টাচারে বাধেনি পরিবর্তনপন্থী সরকারের। কিন্তু এসময়ের জনপ্রিয়তম সাহিত্যিকের মৃত্যুতে বিহ্বল বাঙালির আবেগ বাঁধ ভাঙতে চাইছে। আর সেই বাঁধভাঙা আবেগের ঢেউয়ে যদি বর্তমান শাসকদলের প্রবলতম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সিপিএম বিন্দুমাত্র উপকৃত হয়, তবে তা মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে মেনে নেওয়া দুরূহ! অতএব কবির শেষযাত্রায় শোকের আবহ ভঙ্গ করে নিজের প্রবলতম ‘সাংস্কৃতিক’ উপস্থিতি ব্যতীত অন্য কোনও পন্থা জানা ছিল না তাঁর। কিন্তু আশির দশকের মধ্যভাগের মতোই কে জানে হয়তো জীবন-পারাপারের সরণি ধরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একাই চলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না। সৌজন্যে, রাজনীতির সেই কয়েকজন!”
মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে একজন কবিকে নিয়ে এমন দলাদলি এবং হাত কালো করা রাজনীতির প্রসঙ্গ না হয় থাক। বরং লেখাটি শেষ করতে চাই ‘দেশ’-এর প্রগুক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত সুনীলকে নিয়ে জয় গোস্বামীর একটি কবিতার (২৫ অক্টোবর, ২০১২) মধ্য দিয়ে-

একবার আকাশ আর দু’বার আকাশ আর তিনবার আকাশ
এইভাবে সতেরো বছর
তারপর ক্রমাগত শেষ হয় আলো
সমুদ্রের দিকে ফেরে রক্তমাখা জ্বর
লোহাপাথরের শব্দ ঢুকে পড়ে মনের ভিতর
সেই অবকাশে
হাড়ের অন্দরে কীট একদিন দু’দিন তিনদিন
খেতে থাকে সব ¯েœহঋণ
কীটদল ক্রমশ অঙ্গার
জ্বালা শুধু জ্বালা শুধু জ্বালা
যতটুকু নীল ছিল পুড়ে ছাড়খার
বড় হল আমার-ই অহং
অন্যের কারণে শুধু অন্যের কারণে অন্যদের কারণে কারণে
একদিন তোমার কাছ থেকে
সম্পূর্ণ ফিরিয়ে আনলাম
মন।

তুমি কিছু বলোনি তখন।
স্মিত হেসেছিলে শুধু।
পোড়া একটা হাওয়া উঠল। কালো জল ঘূর্ণিপাক মেরে
উঠে গেল আমার মাথায়
যেদিকে তাকাই দেখি বিষ ভেসে যায় শুধু বিষ
ভেসে যায়
সেই বিষ¯্রােত ধরে এতদূর এসে পৌঁছলাম
রইল না ফেরার উপায়
যা হল তা হয়ে গেল। দিন গেল একের পর এক

বিরোধিতা করলাম অনেক।
তোমার সুস্পষ্ট বিরোধিতা।
আজ, তোমার মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে
মনে হয় ভুল-ই করেছি। মনে হয় সমস্ত কারণেই অকারণ
সজোরে সমূহ বাধা ঠেলে একবার সামনে গিয়ে যদি বসতাম
একবার পা ছুঁতাম যদি
আবার আগের মতো পা ছুঁতাম যদি…

কিন্তু তা হওয়ার নয়। তুমি রইলে না
মানুষের মুখে মুখে রয়ে গেল আমাদের মধ্যেকার সেই বিষনদী
তুমি যে-¯েœহের ডালা হাতে দিয়েছিলে
তা কবেই ভেসে গেছে রক্তমাখা অহং-এর জ্বরে
সমুদ্র ছাপিয়ে যাওয়া তোমার নামের পাশে
আমার ধূলিকণার নাম
শোকের সুযোগ পায় না-
অনুশোচনায় পুড়ে মরে

কবিতা প্রসঙ্গে সুনীল লিখেছেন অনেক। ‘সুনীল সম্পর্কে সুনীলের রচনা’র এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন- “কবিতা লিখতে আমার কষ্ট হয়। আমি ইদানীং গল্প-উপন্যাসও রচনা করে থাকে, কিন্তু ওসবের তুলনায় কবিতা রচনার কষ্ট অনেক বেশি। এই শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করা যে কী সাঙ্ঘাতিক বিপদজনক ব্যাপার- ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যে তা বুঝবে না। যেন একটু অসতর্ক হলেই আঙুল ঝল্সে যাবে কিংবা তুষার ক্ষত হবে। শব্দের এই খেলার সময় সমস্ত স্নায়ু এমন উগ্র টনটনে হয়ে থাকে যে তার ফলে শারীরিক যন্ত্রণা হতে পারে। কবিমাত্রই যে কারণে কিছু না কিছুভাবে অসুস্থ। …ভালোবাসারই মতন, কবিতা নেয় অনেক বেশি, দেয় খুব কম। শুষে নেয় জীবনীশক্তি, ফিরিয়ে দেয় শুধু সম্ভাবনার ঝলক।” কবিতা নিয়ে সুনীলের আত্মবিশ্লেষণটি ছিল এমনÑ “বিরলে বসে যখনই নিজের কবিতা বিষয়ে ভাবি, তখন মনে হয় কিছুই লিখতে পারিনি। যত লিখছি, যত চেষ্টা করছি, ততই বুঝতে পারছি শব্দের সেই পবিত্রতাকে স্পর্শ করা কত দুরূহ। ছেলেমানুষি বয়েস কেটে গেলে বোঝা যায় কবিতা লেখাটা ছেলেখেলা নয়, তখনই লিখতে গেলে ভয় করে। আবার এ-কথাও ঠিক, কোনো কোনো দুর্বল মুহূর্তে নিজের দু-একটা কবিতা পড়ে বেশ লাগে। কণ্ঠ নষ্ট হয়ে যাবার পর শ্যালিয়াপিন রেকর্ডে নিজের যৌবনের সোনালি কণ্ঠস্বর শুনে যেমন কেঁদেছিলেন, তেমনই নিজের পূর্বেকার কবিতা পড়তে পড়তে গলায় বাষ্প জমে, মনে হয়, আমিও একদিন বেঁচেছিলাম, আমারও মূল্য ছিল- যত সামান্যই হোক।”