শূন্যস্থান- আফরিদা মারুফ

শূন্যস্থান

সকাল থেকে মারিয়াম খাতুনের বুক ধড়ফড় করছে। কেন সেটা তিনি নিজেও জানেন না। তাঁর স্বামী ঘরেই আছে, ছুটির দিন তাই সকালে দু’খানা পরোটা আর ডিম অমলেট দিয়ে ভরপেট নাস্তা করে, গরম এক কাপ চা আর পত্রিকা নিয়ে বসেছেন। মারিয়াম খাতুন গ্রামে বড় হয়েছেন, ছোটবেলায় অমলেট বলে কিছু আছে তাই জানতেন না। ওরকম পেঁয়াজ মরিচ মাখা ডিম ভাজাকে গ্রামে বদাভাজা বলতো। পনেরোতে পা দিতেই বিয়ে হয়ে যায় রাইসুল হকের সাথে। তার পর পরই ঢাকা শহরে পাড়ি জমান।

প্রথম প্রথম শহর খুব অচেনা আর বিশাল চিড়িয়াখানার মতো জায়গা মনে হয়েছিল তাঁর কাছে। তাঁদের প্রথম সংসারটা ছিল মালিবাগের কাছে তিনতালার ওপর দুই রুমের একটা ছোট্ট বাসায়। শুরুর দিকে ভয়ে ঘর থেকেই বের হতেন না তিনি। বাইরের যা কাজ, বাজার করা, বিল দেওয়া সব কিছু রাইসুল সাহেবই করতেন। এখন ভাবলেও হাসি পায় মারিয়াম এর। দুই ছেলে হবার পর থেকে তাদের স্কুলে আনা নেওয়া, টিউশানে গিয়ে বসে থাকা, রাইসুল সাহেবের অফিসের ব্যস্ততা বাড়ার সাথে সাথে বাজার সদাই এর কাজ ও মারিয়াম নিজেই করা শুরু করেন। আর রিটায়ারমেন্টের পর তো রাইসুল সাহেবকে ড্রয়িং রুমের ওই রকিং চেয়ার থেকে নাড়ানোর সাধ্যই নেই। কি করে যে সারাদিন খবর দেখে আর পত্রিকা পড়ে লোকটা তা বোঝেন না মারিয়াম।

অবশ্য যখন ব্যস্ত ছিলেন তখনই বা কতটুকু বুঝতেন। একটা মানুষকে অনেকখানি না চিনেই যে সাঁইত্রিশ বছর এক ছাদের নিচে কাটিয়ে দেয়া যায় তা কে জানতো। এমন না যে ভালোবাসেন না, কিন্তু পনেরো বছরের মারিয়াম আর পঁচিশ বছরের রাইসুলের সেই যে দূরত্ব তা রয়েই গেছে। সন্তান সংসারের জরুরী টুকিটাকি বিষয় নিয়ে দশ মিনিট কথা বলার পরেই বলার মতো আর তেমন কিছু থাকে না। কিইবা বলবেন, না তিনি বোঝেন বা ভালোবাসেন রাজনীতি আর ক্রিকেটের ছাইপাঁশ , না রাইসুল সাহেব জানতে চান মারিয়াম এর নতুন একটা ননস্টিক ফ্রাইপ্যান কেনা হবে কি হবে না বিষয়ক জটিলতা।

মাঝে মাঝে গ্রামে কাটানো ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে মারিয়াম এর। কি সব দিন ছিল! দিনভর পুকুরে ঝাঁপাঝাপি, গাছে উঠে ঢিল ছোঁড়া, বিশাল ছেলেমেয়ের দল মিলে গোল্লাছুট খেলা আর দলবেঁধে স্কুল। তাঁর ছেলেরা এসব কিছুই দেখেনি। জায়গাই বা কোথায় খেলার বা সময় কোথায় একটু দম ফেলার?স্কুল, টিউশান, কোচিং সবকিছুর ভারে এই শহরে শৈশব বলে আর কিছু নেই। তাঁর ছেলেরা বরাবরই পড়াশোনায় ভালো ছিল, তাদের স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি সব নিয়ে ব্যস্ততায় এত বছর দেখতে দেখতে কেটে গেছে। তাঁদের দুইজনের দূরত্ব ঘোচার তাই সুযোগই হয়নি কখনো।

সংসারে কমতি তেমন কখনোই ছিল না। রাইসুল সাহেব সাধ্যমতো করেছেন, শখ পূরণ করেছেন, এমনকি সময়ে সময়ে তাঁর বাড়ির লোকজনের উপকারও করেছেন। শুধু দুজন বসে একটু নিজেদের কথা বলার ফুসরতটাই হয়নি। এখন ব্যস্ততা নেই, কিন্তু মাঝের দীর্ঘশ্বাসটুকু রয়েই গেছে।  অতঃপর রাইসুল সাহেব ফিরে যান তাঁর পত্রিকায় আর মারিয়াম বসেন তাঁর কুশিকাটার কাজ নিয়ে। দুই ছেলের ঘরে তিন নাতি নাতনীর জন্য কিছুদিন পর পরই নতুন জামা বানানোর অভ্যাস তাঁর।

আজ কাজ করতেই করতেই এই বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন মারিয়াম। কেমন জানি কু-ডাক দিচ্ছে মনে। দুই ছেলেকে ফোন করবেন কিনা ভাবলেন। বড়জন এর পোস্টিং সিলেটে, মাঝে মাঝেই তিনি যান দুই একদিন এর জন্য। চলে গেলে রাইসুল সাহেব একা পড়ে যাবেন তাই বেশিদিনের জন্য যাওয়া হয় না কখনো। ছেলে আসে ঈদে পার্বণে যখন সুবিধে হয়। ছোট ছেলে উত্তরায় থাকে, সে এবং তার স্ত্রী দুজনেই ওখানে চাকরি করে, শাহবাগ থেকে যাওয়া আসা করা অসম্ভব তাই ওখানেই নিয়েছে বাসা। আজকাল স্বামী স্ত্রীর ভেতরের বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্কটা বেশ লাগে মারিয়াম এর। আর দশটা শ্বাশুরির মতো হিংসে বোধ করেন না তিনি। নিজে যা পারেননি, ছেলের বউদের তা করতে দেখে বেশ ভালো লাগে তাঁর। মাঝে মাঝেই তারা  বাচ্চাটাকে তাঁর কাছে রেখে এখানে ওখানে ঘুরে আসে, নিজেদের মতো সময় কাটায়। নাতিকে কাছে পেয়েও মারিয়াম এর সময়ও ভালো কেটে যায়।

শেষ পর্যন্ত ফোন করেই ফেললেন। যতদিনই শহরে থাকুন, এধরনের কুডাকের ব্যাপারগুলো তিনি এখনো বিশ্বাস করেন। একবার এমন হয়েছিল যখন বড় ছেলে ক্লাস এইটে পড়ে। কেমন জানি অস্থির বোধ করছিলেন তিনি বাড়িতে বসে সারাদিন। পড়ে স্কুল থেকে ফোন এল তাঁর ছেলে দোতালার বারান্দা থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙ্গে ফেলেছে। যাই হোক, ফোন ধরলো বড় বউ, মেয়েটা বেশ লক্ষী ধরনের, এত সুন্দর করে মা ডাকে যে মেয়ের অভাব ভুলে যান মারিয়াম। একটু নাতি নাতনিদের সাথেও কথা বলে নিলেন এই ফাঁকে। ছেলে বাড়িতে নেই তাই কথা হলো না, এমনি প্রায় দিনই কথা বলেন ছেলেদের সাথে। ফোন রেখে ছোট ছেলের নাম্বার ডায়াল করলেন, ফোন ধরে ছেলে বললো তারা গাজীপুর যাচ্ছে অফিসের পিকনিকে।

যাক, কথা বলার পর একটু শান্ত হয়ে কাজে মন দিলেন মারিয়াম। আজ জামার এই হাতের অংশটুকু শেষ করে রান্না চড়াতে যাবেন। সকালে বুয়া এসে সব কেটে কুটে দিয়ে যায়, মারিয়াম শুধু রাঁধেন। কিন্তু কি আশ্চর্য, বুক ধড়ফড়ানিটা যাচ্ছেনা কেন? হার্টের সমস্যা না তো? রাইসুল সাহেবের কিছুটা হৃদরোগ জনিত সমস্যা থাকলেও তাঁর এসব কিছুই ছিল না এখন পর্যন্ত। একবার কি ডাক্তার দেখাবেন? কাঁটা গুলো হাত থেকে রেখে উঠে দাঁড়ালেন ড্রয়িং রুমে যাবার জন্য। উনাকে বলে একবার চেকাপটা করিয়েই নেবেন।

ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেখেন রাইসুল সাহেবের মাথাটা কাত হয়ে আছে রকিং চেয়ারে। এই সময় তো ঘুমায় না লোকটা! ডেকে তোলার জন্য কাছে গিয়ে মারিয়াম এর বুক ধড়ফড়ানি হঠাত বন্ধ হয়ে যায়। নিশ্বাস বন্ধ করে ছুঁয়ে দেখেন মানুষটাকে একটু। এতদিনের পরিচিত স্পর্শ এত প্রচন্ড শীতল যে মারিয়াম চিৎকার করে উঠেন। একটু হা হয়ে থাকা প্রাণহীন মুখটার দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারেন কু-ডাক আজ কার জন্য এসেছিল। হুট করে প্রচন্ড রকমের শূন্যতা বোধ করেন তিনি।চোখের সামনে রাইসুলের হাত ধরে গ্রাম থেকে শহরে আসা, একটু একটু করে সংসার গোছানো, চুপচাপ একসাথে কাটিয়ে দেয়া সন্ধ্যা আর এতগুলো বছরের ছবি এলোমেলোভাবে ঘোরপাক খায়। কান্না পায় না মারিয়াম এর। শুধু ছোট্ট বাসাটা হঠাত ভয়ংকর বিশাল আর ফাঁকা মনে হয় তাঁর।

কখনো সত্যিকার অর্থে জীবনে জায়গা না করে নেয়া মানুষটা যাবার সময় এতো জায়গা খালি করে যাবে তা কে জানতো?

 

আফরিদা মারুফ,

বুদাপেস্ট, হাংগেরি