মোঃ সাইফুর রহমান
September 2, 2019
ফেরদৌস নাহার
September 2, 2019

শাকিল আল- আমিন

:::কবি হেলাল হাফিজের নি:সঙ্গ জীবন ও প্রেমিকা হেলেন :::

“আছি।

বড্ড জানান দিতে ইচ্ছে করে, – আছি,

মনে ও মগজে

গুন্‌ গুন্‌ করে

প্রণয়ের মৌমাছি। ”

-হেলাল হাফিজ

নেত্রকোণার উর্বর মৃত্তিকায় জন্ম নেয়া সোনালি ফসল, জীবন্ত কিংবদন্তী কবি হেলাল হাফিজের প্রেম ছিলো হেলেন নামের একটি মেয়ে সাথে। পারিবারিক বোঝাপড়ার কারনে তাদের বিয়ে হয়নি।হেলেনের বিয়ে হয়ে যায় অন্য কারো সাথে।বিয়ের পর কবিদশ পনেরদিন নাকি কোন কথা বলতে পারেনি,বাকরুদ্ধছিলেন।হেলেনের বিয়ের পর কবি হেলাল হাফিজকে তার তার পরিবার বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে।একদিন এক মেয়ের ছবি দেখিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় তার(কবির) পছন্দ হয়েছে কিনা।কবি পতিত্তরে জানিয়েছিলেন মেয়েটি দেখতে নাকি তার মায়ের মত।তারপর তার পরিবার লজ্জায় কখনওঅার তাকে বিয়ের কথা বলেননি।অামৃত্য তিনি বিয়ে না করে কাটিয়ে দিয়েছেন হেলেনকে ভালোবেসে।

তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত উক্তি

” তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছ ! ”

এমন প্রেমকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায়???অামাদের মত সাধারনের জীবনে এমন দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব। বিয়ে না করার কারন জানতে চাইলে কখনও তিনি হেলেনের দোষ দিতেন না।এমনি হেলেনের ব্যাপারটিও কখনও বলতেন না।তিনি বলতেন অামি কাউকে বিয়ে করিনি এমনটা ঠিক না,বরং কেউ অামাকে বিয়ে করেনি এমনও হতে পারে।

সুন্দরের গান কবিতায় বলেন,

“হলো না, হলো না।

শৈশব হলো না, কৈশোর হলো না

না দিয়ে যৌবন শুরু, কার যেন

বিনা দোষে শুরুটা হলো না। ”

সে যায় হোক, হেলেনও নাকি কবির শূন্যতায় একসময় পাগল হয়ে যায়,তাকে(হেলেনকে)তার স্বামী পাগল হয়ে যাবার পর ডিভোর্স দিয়ে দেয়।হেলেনকে নাকি শেকল দিয়ে বেধে রাখতে হয়।অামরা মনে করি কবিদের জীবন বোধহয় নারীবেষ্টিত হয়ে থাকে কিন্তু সবসময় বোধহয় অামাদের ধারনা সত্য হয় না।রুপবতী মেয়েরা কবিতার প্রেমে পড়লেও এলোমেলো অগোছালো কবির প্রেমে পড়ে না। কবি শুধুমাত্র একজনকেই ভালোবেসে সারাজীবন নিসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন।প্রকাশ্য তিনি থাকেন না,নিসঙ্গতাই তার প্রিয় ।

অচল প্রেমের পদ্য ” কবিতায় লেখেন,

“ভালোবেসেই নাম দিয়েছি ‘তনা’

মন না দিলে

ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা। ”

কবির জীবনে একটি মাত্র মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে অাগুন জ্বলে’ প্রকাশিত হয় হয় ১৯৮৬ সালে। তারপর তিনি কেন অার কেন বই বের করেননি জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতেন যে প্রথম বইয়ের জনপ্রিয়তা অামার লেখা বন্ধ করে দিয়েছে।অামার জীবনের সবটুকু অনুভূতিই এই বইতে দিয়েছি।এরপর লিখলে তা যদি অাগের মত জনপ্রিয় না হয় তাহলে তিনি তা সহ্য করতে পারবেন না।অামার কাছে মনে হয় এই’যে জলে অাগুন জ্বলে’ কবিতার বইটি হেলাল হাফিজের নয়, সকল প্রেমিকদের মনের অব্যক্ত কথার সমন্বয়।

তাঁর মতে,

” আমাকে উস্টা মেরে দিব্যি যাচ্ছো চলে,

দেখি দেখি

বাঁ পায়ের চারু নখে চোট লাগেনি তো;

ইস্‌! করছো কি? বসো না লক্ষ্মীটি,

ক্ষমার রুমালে মুছে সজীব ক্ষতেই

এন্টিসেপটিক দুটো চুমু দিয়ে দেই। ”

কবি শুধুমাত্র প্রেমিক হৃদয়ের অনুভূতি গুলোর কাব্যরূপ দিয়েছেন।প্রতিবছর বইমেলা থেকে কত প্রেমপার্থী তরুন কত রুপবতী তরুনীকে এই বইটি উপহার দিয়ে তাদের হৃদয়ের অনুভূতি কবির কবিতা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান কেউ জানে না,রুপবতী সেইসব তরুনীরা হয়ত বইটি একবারের জন্য খুলেও দেখে না। এই জন্যই হয়ত অাজকের দিনে কেউ অার প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে ওঠেনা,বয়ফ্রেন্ডগার্লফ্রেন্ড হয়।এদের বিচ্ছেদ হয় না,হয় ব্রেকঅাপ।কেউ একজনকে ভালোবেসে তাকে না পাওয়ার বেদনা নিয়ে সারাজীবন নিসঙ্গ থাকে না,কেউ অার হেলেনের মত পাগল হয়ে যায় না,পায়ে নুপুরের পরিবর্তে শেকল পরতে হয় না।

তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের স্বরূপ লিখেছেন,

” আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে

কবি করে তুলেছে

মানুষের কাছে এওতো আমার

এক ধরনের ঋণ।

এমনই কপাল আমার

অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ”

 

শাকিল আল-আমিন

১০/১০/২০১৮

শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।

 

এশট্রে

বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতা ধরার বৃষ্টি। নয়নের অফিসের সবাই পিকনিকে গেছে সে যায়নি একটা বিশেষ কারনে। আজ নিলির জন্মদিন। নিলির জন্য একটা ঘড়ি কিনতে গিয়ে পাঁচ ছয়শো টাকা বেরিয়ে গেল। ওরা বড়লোক হাজারো গিফট এর ভীরে তার দেওয়া গিফটটা স্থান পায় কি না। নিলি মিলির ছোট বোন। ক্লাস টেনে পড়ে। অসম্ভব রূপবতী এই মেয়েটির খুত বলতে ডান হাতে ছয়টা আঙ্গুল নিয়ে সুন্দর পৃথিবীতে এসেছে।

টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। কিছু না কিছু খেতে ইচ্ছা করে। নয়নের ইচ্ছে করে ধুমায়িত এককাপ চা আর একটা বেনসন সিগারেট। ব্যস। সে চেইন স্মোকার না তাই বাসায় আসার সময় কোন সিগারেট নিয়ে আসেনা। সিগারেট সঙ্গে থাকলেই বারবার ধরাতে ইচ্ছে করে। এককাপ চা পান করে বসে রইল, কিছুতেই সিগারেট এর তৃষ্ণা মিটছেনা। সিগারেট কেনার জন্যে একটা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। যা সালা গলির মোড়ের দোকানটা বন্ধ। তাকে আরো হাফ কিলো হেটে যেতে হয়েছে। কয়েকটা সিগারেট কিনে বের হতেই ঝুম দিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, ছাতায় আর কুলাচ্ছে না। সে উঠে দাঁড়াল ঝাপ বন্ধ করা একটা দোকানে। এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে একটু আগুন চেয়ে নিয়ে সেও একটা সিগারেট ধরাল।

ভদ্রলোকের সঙ্গে অনেকক্ষণ আলাপ পরিচয়ের পর নয়ন জানতে পারলো তিনি মিলি আর নিলির বাবা। নয়নের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেছে, তার হাত পা মৃদু কাঁপছে। এই ভদ্রলোক কদিন পরে তার শ্বশুর হবেন। তাঁর বড় মেয়ে মিলিকে সে পছন্দ করে। মিলিদের বাসায় অনেকবার গিয়েছে, উনার গল্পও শুনেছে কিন্তু দেখা হয়নি।

আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি। অফিসে যাওয়ার জন্য নয়ন বের হলো।  একটু দেরি হয়ে গেল আজ। দেরি করলেই অফিসের বস সকাল বিকাল চাকুরি নিয়ে টানাটানি করে। আজ কপালে না জানি কি আছে। এমনিতেই অফিসে অডিট হচ্ছে সবার মাথা গরম।

মালিবাগ থেকে শান্তিনগরের দিকে এবরো তেবরো রাস্তায় তার রিকশা এগিয়ে যাচ্ছে। সে রিকশা থেকে দেখলো একটা জটলা বেধে লোকজন দাঁত বের করে হাসছে। সে এগিয়ে গিয়ে দেখল একটা অপরূপ সুন্দরী মেয়ে কাদা মাটিতে মাখামাখি হয়ে পড়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে। এটা দেখেই লোকজন দাঁত বের করে হাসছে। রিকশাওয়ালা একটা গর্তের মধ্যে রিকশা ফেলে দিয়ে পাবলিকের মারের ভয়ে পালিয়েছে।

হয়ত আশেপাশে কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে। ভীড় কমলে উদয় হবে।

নয়ন রিকশা থেকে দেখলো মেয়েটি উঠার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। পা কেটে রক্তারক্তি অবস্থা। নয়ন সামনের ডিস্পেন্সারিতে নিয়ে গেল মেয়েটাকে। দুটো সিলাই পরেছে পায়ে। সেদিন নয়নের অফিসে যাওয়া হয়নি। অফিসের বস কথা চিবুতে চিবুতে বললেন “আপনার তিন দিনের বেতন কাটা হল আশা করি শিক্ষা নিবেন। ”

মিলিদের বাড়িতে ঢুকতেই সে দেখে লাল স্কাট পরা ফুটফুটে একটা মেয়ে বারান্দায় রাখা দোলনায় দোল খাচ্ছে। মিলির অবস্থা দেখে স্কাটপরা মেয়েটা ভুত দেখল। তার মা ফিল্টার থেকে পানি ভরছিলেন হাত থেকে গ্লাস পরে ভেঙে গেল।

তার মা সমস্ত ঘটনা শুনে মিলিকে ইচ্ছামতো বকাবকি করলো। কারন নিজের প্রাইভেট কার থাকা সত্ত্বেও মিলি গাড়ি নিয়ে যায়না। রিকশায় করে নিয়মিত ইউনিভার্সিটিতে যায়।

ঘটনার কিছুদিন পর মিলিদের বাসায় গেল নয়ন। নিলি একটা বেতের চেয়ারে বসে আছে, তাকে দেখেই নিলি বলল” আপা ত বাসায় নেই নানুর বাসায় গেছে, আসতে দেরি হবে।”

নয়ন বেতের চেয়াটায় বসলো। নিলি দৌড়ে চা করে নিয়ে আসলো। নিলি চা দিতে দিতে বলল ” ভাইয়া, আপনি বেছে বেছে সেদিন ই আসেন যেদিন আপু বাসায় থাকেনা”!

বাবা আপনার কথা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে কিন্তু কোন দিনই দেখা করেন নি। আজ বাবার সাথে দেখা করে রাতে খেয়ে তারপর যাবেন। ”

কি চমৎকার এদের ভদ্রতা। আমি কে?  কেউ না। মিলিকে সেদিন সামান্য উপকার করেছিলাম মাত্র। এদের কাছে আমি অতি সামান্য একজন। একটা সাধারণ প্রাইভেট কোম্পানি তে চাকুরি করি মাত্র। মাসে যে মাইনে পায় তার অর্ধেক মাকে পাঠাতে হয়।

বাকি অর্ধেকের প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখে সে। আর মিলিরা? নয়নের ধারনা এদের বাসায় যে দারোয়ান, কাজের লোকজন তার চেয়েও বেশি রোজগার করে। শুধু ভদ্রতার খাতিরেই এ বাড়িতে সে মাঝেমধ্যে আসা যাওয়া করে। বিরাট বড়লোক, সুন্দরী নারী এর লোভেই কি সে আসে এখানে?  নাকি অন্যকিছু। নিছক ভাললাগে তাই। মাঝেমধ্যে সে নিজেকে প্রশ্ন করে।

এর মধ্যে সে আরো তিন চার বার এদের বাসায় এসেছিল নয়ন। কোনদিন ই মিলির বাবার সাথে দেখা হয়নি। মিলির সাথে নয়নের একদিন দেখা হয়।

“আরে আপনি ত আসেনই না। মিলি আদুরে গলায় বলল”আসুন তো আপনার সঙ্গে চেস খেলি। শুনলাম আপনি নাকি তুখোড় দাবা খেলোয়াড়। সেদিন নয়ন ইচ্ছা করেই মিলির সাথে হেরেছিল। নারীর কাছে সব পরাজয় দোষের নয়। নয়ন হেরে গিয়ে এমন ভাব করলো যেন মিলির কাছে সর্বশান্ত হয়েছে।

“আরে হেরেছেন ত কি হয়েছে আরেকদিন এসে আমাকে হারিয়ে যাবেন। মুখটাকে আর বাংলার পাঁচ করে রাখবেন না, প্লিজ। ”

নয়ন এখানে আসার আগে মনে মনে ভেবেছিল আগামী একমাস আসবে না। ঘন ঘন আসা যাওয়া খুবই খারাপ দেখা যায়। দু দুটা যুবতী মেয়ে ঘরে সমাজ বলতে একটা কথা আছে না? কিন্তু কি চমৎকার হেরে গিয়ে আরেকবার আসার অজুহাত তৈরি হলো।

মিলির সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে নয়নের জীবনে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। বাসার মালিকের টেলিফোন দিয়ে মাঝেমধ্যে মিলির সাথে কথা হয়। মিলি টেলিফোনে সুন্দর করে হাসে। কি সুন্দর হাসি। না জানি কোন ভাগ্যবান পুরুষ তাকে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। নয়নের বুকের ভিতর খাঁ খাঁ করে ওঠে।

একদিন রিকশায় করে নয়ন মিলিদের বাসার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। প্রখর রোদের মধ্যে রিকশা না পেয়ে মিলি কোন আপত্তি না করেই নয়নের সাথে রিকশায় চেপে বসলো। নয়ন রিকশা ছেড়ে দিতে চেয়েছিল মিলির জন্য। মিলিই তাকে হাত ধরে টেনে বসাল।

-আরে আপনার রিকশা আপনি ছেড়ে দিবেন কেন? ”

নয়ন চুপ করে রইল।

-তা কোথায় যাচ্ছেন?

নয়ন ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল

-একটু নিউ মার্কেটে যাব।

মিলি অবাক হয়ে বলল -তাই নাকি? ভালই হলো। আপনি কলাভবনের সামনে একটু রিকশাটা থামাবেন। আমি স্যারের রুমের দরজার নিচ দিয়ে এসাইনমেন্ট টা চালান করে দিয়ে আপনার সঙ্গে নিউমার্কেট যাব। আমিও কিছু কিনবো।

নয়ন অবাক হয়ে ভাবছে বলে কি এই মেয়ে? সে আরো অবাক হল মিলি তার সাথে হড় হড় করে কথা বলছে। সে ভাবছে বিয়ের পর হয়তো এভাবেই তাকে নিয়ে সংসারের দু একটা খুটিনাটি জিনিস কিনবে। নয়নের বুকের ভিতর চিন চিন করে উঠে। সে হা করে শ্বাস নিল।

নয়ন মাকে সামান্য কটা টাকা পাঠিয়ে বাকিগুলো জমিয়ে আর বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে কিছু জিনিস কিনতে এলো। মিলি যদি তার বাসায় যাওয়ার বায়না করে কোনদিন, রুমের যা অবস্থা? একটি মাত্র জানালা তার রুমে তার জন্যে একটা নতুন পর্দা, বিছানার জন্য নতুন চাদর, নেটের মশারী, কয়েকটা চায়ের কাপ, চায়ের ফ্লাক্স কিনলো। সে একটা সিগারেটের টুকরা রাখার জন্যে একটা এশট্রে কিনতে চেয়েছিল, কিন্তু মিলিকে লজ্জা করে কিনতে পারেনী। ইশ আপনি সিগারেট খান? সিগারেট খাওয়া ছেলেদের আমার একদম পছন্দ নাহ।

বিয়ের পর এমন সুন্দরী বউ সিগারেট খেতে মানা করলে সে আর একটা সিগারেটও ধরাবেনা। আসার সময় সে মিলিকে একটা সুন্দর নীল রঙের ফুলদানি কিনে দিল। সেও একটা কিনতে চেয়েছিল, কিন্তু রাখবে কই? মিলিদের কি বিশাল ড্রয়িংরুম।  মিলিকেও সে বিয়ের কথা বলতে চায় কিন্তু রাখবে কই?  যেখানে একটা ফুলদানি রাখার জায়গা নেই সেখানে ফুলের মতো বউয়ের জায়গা কই?

বন্ধুরা তার ঘরটা দেখে অবাক। কিরে নয়ন তুই দেখছি রুমটাকে শ্রাবস্তীর মহল বানিয়ে ফেলেছিস? এই ঘরে বনলতা সেন ছাড়া আর কাউকে মানায় নাকি রে?

তা বনলতা সেনকে কবে আনছিস?

এক বন্ধু লম্বা গোফ মুচড়াতে মুচড়াতে বলে -বনলতা সেন নাকি শুনলাম প্রস্টিটিট ছিলো রে।

সবাই হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

আরেকজন বলল একজন বনলতাকে দুশো টাকা দিয়ে ধরে নিয়ে আয় সারারাত ফুর্তি করি।

রাগে নয়নের সমস্ত শরীরের রক্ত মাথায় উঠে যায়। কিন্তু সে চুপ করে থাকে। সারারাত জেগে সিগারেট এর টুকরা দিয়ে ফ্লোরটা সয়লাব করে দেয়, চায়ের লিকারের দাগ চাদর জুড়ে লেগে থাকে। নয়ন চুপ করে ভাবে এই অমানুষদের সাথে এতদিন কি করে ছিলো? এরা দেখি মহামূর্খ।

একজন নয়নের গায়ে চিমটি কেটে বলল -রিকশায় দেখি যারে ওর সাথে ডেটিং-টেটিং দিয়েছিস। চন্দ্রিমা উদ্যানে গোপন প্লেস আছে।

নয়ন দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে। বন্ধুরা কিট কিট করে হাসে। তার ইচ্ছে করে সব কয়টার দাঁত ফেলে দেয় তাপড়ায়ে।

সেদিন হটাৎ করেই নয়ন মিলিদের বাসায় গেল। মিলি টিয়া পাখিকে আদার দিচ্ছিল। নয়ন পাখিটার মুখের কাছে আঙুল নিয়ে বলল – এই সুন্দর পাখিটা তোমার নাকি?

পরক্ষণেই নয়নের মনে হলো হায় হায়! একি করলাম আমি? তার মাথাটা একটা চক্কর দিল। মিলি হয়তো তার দিকে রূঢ় চোখে তাকিয়ে বলবে-এতো লুতুপুতু করার চেষ্টা করছেন কেন? তুমি বলার সাহস আপনাকে কে দিল? আমি আপনার কে হই?

মিলি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার সুন্দর হাসি দিয়ে বলল-জি আমার।

পাখিটা চিৎকার করে বলছে চুর চুর চুর…!

দুজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসল পাখির কথা শুনে। মিলি তার হাতে পাখির আদারগুলো দিয়ে বলল -আপনি ওকে খাওয়ান আমি আপনার জন্য চা করে আনছি।

দুজনে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে। নিলির পরীক্ষা। তাই সে আড্ডায় নেই। তা নাহলে ভ্যাজ ভ্যাজ করে নয়নের মাথা খায়।

মিলি ঠোট দুটো গোল করে গালে আঙুল টুকাতে টুকাতে নয়নের দিকে তাকিয়ে বলল –আপনি হাত দেখতে পারেন?

নয়ন ইতস্ততঃ করে বলল -জি না পারি না।

মিলি আঙুলের মধ্যে চাবির রিংটা ঘুরাতে ঘুরাতে বলল- আপনি একটা গ্রেট চান্স মিস করেছন। আপনি যদি বলতেন পারি। তাহলে একটা অপরূপ সুন্দরী মেয়ের হাতটা কিছুক্ষণ কচলানোর সুযোগ পেতেন। বলে মিলি হো হো করে হেসে উঠল।

নয়ন লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মনে মনে ভাবে বলে কি এই মেয়ে।

নয়ন মিলিদের বাসায় যাওয়ার জন্যে অজুহাত তৈরি করে রাখে। গল্পের বই নিয়ে যায়, পরের দিন না পড়েই আবার ফেরত দিয়ে যায়। চলছেই। বইয়ে মিলির হাতের স্পর্শের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। বই পড়ার তার অভ্যাস নেই,শুধু পাতা উল্টে দেখে।

বইয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে চমৎকার গুটি গুটি হাতের একটা লেখা পেল সে। সব বইয়ের উপরে মিলির নাম লিখে রাখে। এই বইয়ে লেখা-

“মিলি রহমান

গ্রন্থ সংগ্রহ -৪৮০”

নয়ন চিরকুটটি হাতে মিলির হাতের লেখার মিলিয়ে নিল।

চিরকুটে লেখা রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত পঙতি গুলো।

“প্রহর শেষে আলোয় রাঙা

সেদিন চৈত্রমাস

তোমার চোখে দেখেছিলাম

আমার সর্বনাশ। ”

নয়ন ভেবে পেলনা, লিখাটা কি তাকে নিয়ে? তারিখটাও সম্প্রতি। ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।

মিলি আর নয়ন দুজন নৌকায় করে কোথায় যেন যাচ্ছে। দুজন নৌকার দু প্রান্তে, জলকেলি হচ্ছে দুজনের। বাতাসে উড়ছে মিলির অবাধ্য চুল। টংঙের দোকানে বসে দুজন চা খাচ্ছে, কিন্ত চায়ে চিনি হয়নি। মিলি মুখ ব্যাঙাচ্ছে। সে গরম চা নয়নের মুখে ঢেলে দিল। নয়ন চিৎকার করে ঘুম ভেঙে উঠলো। সে স্বপ্ন দেখেছে।  একটিমাত্র জানালা দিয়ে সকালের কড়া রোদ তার মুখ পুড়িয়ে দিচ্ছিলো।

পরের দিন মিলির লেখা চিরকুটটা এলিফ্যান্ট রোড থেকে বাধিয়ে আনলো। পাগলামি কাকে বলে! তার ইদানীং রাতে ঘুম হয়না। বাঁধানো ফ্রেমের দিকে তাকিয়ে অনেক রাত কেটে যায়। সে ভাবে মিলি একদিন না একদিন তার ঘরে আসবে। তখন ফ্রেমটার দিকে তাকিয়ে বলবে।

-“ওমা সেকি কান্ড, সুন্দর তো! ”

নয়ন একা একা হাসে।

নয়ন পরেরদিন সন্ধ্যায় মিলিদের বাসার ড্রয়িংরুমে বসে আছে। অনেকক্ষণ কিন্তু কারো সাড়া শব্দ নেই। সে সাতটা বিশে এসেছিল এখনো সাতটা বিশই বাজে। কি ব্যাপার সময় কি থেমে গেল নাকি? সে খেয়াল করে দেখল ঘড়িটা নষ্ট। আহা নষ্ট ঘড়িও কিন্তু বারো ঘন্টা পর সঠিক সময় দেয়।

নিলি নয়নকে এককাপ চা দিয়ে ভেতরে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল। আপা বিউটি পার্লারে গেছে সাজতে। আজ তাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। নয়নের বুকটা একটু ধক করে উঠল।

ঘরটা আগে থেকেই পরিপাটি করে সাজানো। যে সোফাটায় সে বসে আছে তার সামনে একটা টেবিলে রাখা তার কিনে দেওয়া ফুলদানি টা সুন্দর করে সাজানো। নিশ্চয়ই মিলি বাগান থেকে তাজা ফুল এনে রেখেছে। সে মিলির স্পর্শ পাওয়ার জন্যে ফুলগুলি স্পর্শ করলো।

নয়ন চায়ে চুমুক দিতেই তার শরীরটা গুলিয়ে আসলো। নিলি সুন্দর করে সেজেছে। কি স্বাভাবিকভাবেই না আলাপ করছে নিলি। মাঝেমধ্যে হেসে ভেঙে পরছে। তার দুলাভাই ফরেন ক্যাডারে সৌদি আরবে সেকেন্ড সচিব হিসেবে কর্মরত আছে তাও জানালো। তাড়াহুড়োর বিয়ে। বিয়ে পড়িয়ে আগামী সপ্তাহে ই নিয়ে যেতে চায়। আজ দিনক্ষণ ঠিক করতেই ছেলের বাড়ি থেকে ছেলে আর তার মামা আসবে।

নয়ন ভাই আপনিও এসেছেন আপাও বের হয়েছে। আসতে ঘন্টা দুয়েক লাগবে। একটু কি বসবেন?

নয়ন ফিরে যাচ্ছে তার ঘরে। আজ রাতেও তার ঘুম হবে না। ফ্রেমটার দিকে তাকিয়ে সারারাত কেটে যাবে। এই পরিবারটির কাছ থেকে, মিলির কাছ থেকে একটু সান্নিধ্য পেয়েছে তাই তার সৌভাগ্যের ব্যাপার। এর চেয়ে বেশি কিছু সে পেতেই পারেনা। এই সহজ স্বাভাবিক কথাটি তার মাথায় আগে কেন ঢুকেনি। মিলির সাথে আর দেখা হবে না সেটা ভাবতেই তার বুক ডুকরে উঠছিল। যাওয়ার সময় সে চমৎকার একটা এশট্রে কিনে নিল। সে ছেলে, সে কাঁদতে পারেনা। দু:খে ছেলেরা কাঁদে না, আরেকটা সিগারেট ধরায়।

 

শাকিল আল-আমিন

০৫-০৫-২০১৮ খ্রি

নেত্রকোনা।