ছোট কবিতা ।। মো. জিয়াউল হক
May 2, 2018
তুষার রাজকন্যা // ঋতুশ্রী ঘোষ
May 2, 2018

রক্ত চুম্বন // অনুপম সরকার

ছেলেটি মেয়েটিকে বলেছিল, “আমাদের জন্মই যেন আজন্ম পাপ”।
ছেলেটি মেয়েটিকে অনেক বেশি ভালবাসতো। মেয়েটিও ঠিক ততটাই, যতটা ছেলেটি ভালবাসতো। অবশ্য ওরা জানতো ভালবাসা সব হিসাব-নিকাশের বাইরে। ওরা ছিল শুধুই দুজন দুজনার। একইবৃন্তে মালা হয়ে ফোটা দুটি ফুল। নীল মেঘের কোল ঘেষে উড়ে চলা অজানা-অচেনা ছোট্ট, কোমল, মিষ্টি একজোড়া পাখি হওয়ার স্বপ্ন ছিল ওদের। অবশেষে সেই স্বপ্নের স্বার্থক রূপ ওরা দিতে পেরেছিল। বিয়ে হয়েছিল ওদের। তারপর———
তারপর——! ওদের গল্প বলবো আজ।
২০০৮ সাল। ডিসেম্বরের শেষ। পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসল ছেলেটি ও মেয়েটি। ধর্মভীরু মেয়েটি তার মনের সব কল্পনা সাজিয়েছিল বাসরঘরকে কেন্দ্র করে। তীব্র প্রেমাকাঙ্খ্যায় মেয়েটি পাগল প্রায়। এ পাগলামি বিকৃত মানসিকতার নয়। এযে সৃষ্টিকর্তা অর্পিত এক অবর্ণনীয় ঐশ্বরিক দান। সুখ-দুঃখের ফারাক বোঝা সেখানে মুশকিল। একটু সুখের জন্য অকল্পনীয় দুঃখ ভোগ করা যায়। শুধুমাত্র মনের কল্পনাতেই যাদের এই স্বর্গীয় ভালবাসার সৃষ্টি, তারা তো বাসর রাতের অপেক্ষা করবেই।
কিন্তু না! বাসর রাতের কোন সুখ স্মৃতির কথাই ওদের মনে পড়ে না। মনে পড়ে শুধু দু’কান ফাটানো আর দু’চোখ ধাঁধানো তীব্র গগন বিদারী আওয়াজ, আর লাল আগুন ও কালো ধোঁয়ার পাকানো কুন্ডলী। একে অপরের হাত ধরে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা আর পেছনে পড়ে থাকা ধ্বংসস্তুপের কথা মনে পড়ে ওদের।
প্রায় এক মাস পর বাড়ীতে ফেরে ওরা। গত এক মাসে কোথায় ছিল, কিভাবে ছিল, কিছুই মনে নেই ওদের। বাড়ীতে ফিরে দেখতে পেল শুধু ধ্বংসস্তুপ আর ধ্বংসস্তুপ । আর পেল ধ্বংসস্তুপ থেকে গুনে গুনে পরিবারের বারো সদস্যের ছিন্ন-ভিন্ন, পচা-গোলা লাশ। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল লাশগুলো। আশেপাশের অনেক পরিবারেরই তখন একই অবস্থা।
না, চোখ ওদের ভেজেনি। যদিও মন পুড়েছিল; তবুও চোখে জল টলমল করেনি। হয়তো দু’এক ফোটা গড়িয়েছিল কিন্তু এযে নিদারুণ বাস্তবতা ওদের সামনে; তাই ওরা সামলে নিয়েছিল। বলা চলে, নিতে বাধ্য হয়েছিল।
নতুন করে জীবন সাজনোর উপকরন ওদের সামনে ছিল না। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ছিটকে পড়লো দুস্থ নিসম্বল মানুষে। কিন্তু ওদের ভালোবাসার জোর ছিল অসম্ভব রকমের। ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় ছিল ওদের মনে।
দেশী ও বিদেশী সংস্থার সহায়তায় নতুন করে জীবন শুরু করল ওরা। নতুন ঘর হলো, নতুন সংসার হলো। নতুন জীবনে পদার্পন করল ছেলেটি ও মেয়েটি।
ছেলেটি কাজ নিল একটা ওয়ার্কশপে। মেয়েটি ফুলের দোকানে। ছেলেটি অনেক রাত অবধি কাজ করত। মেয়েটি সন্ধ্যার আগেই বাড়ী ফিরত। সংসার গোছানোর বাড়তি দায়িত্বটিও ছিল মেয়েটির কাঁধে।
ছেলেটি চায়নি সংসারের সব দ্বায়িত্ব একাই বহন করুক মেয়েটা। কিন্তু মেয়েটি জানতো, ছেলেটিকে অর্থ্যাৎ তার স্বামীকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হতো।
ছেলেটির নাম- ও হ্যাঁ, আবদেল আল মাহমুদ আল জহুর আল কোরেশী। অনেক বড় নাম, তাই নয় কি? অবশ্য সবাই ওকে কোরেশী বলেই ডাকতো। কোরেশী; কুরাইশ বংশীয়। আর মেয়েটির ডাকনাম মাহমুদা। মাহমুদা সায়গুন খতিব। বিয়ের পর ওদের জুটিবদ্ধ নাম হয়ে গেল মাহমুদা-কোরেশী।
কোরেশীকে যেহেতু অনেক রাত করে বাসায় ফিরতে হতো, তাই অধীর আগ্রহে স্বামীর পদপানে চেয়ে অপেক্ষা করতো মাহমুদা। প্রতিদিনই বাসায় ফিরলে স্বামী সেবায় মন-প্রাণ উজাড় করে দিত মাহমুদা নামের মেয়েটি।
স্বামীর বুকে মাথা রাখলে হাজারো প্রশ্ন ভিড় করতো মাহমুদার মন্।ে সেই জন্ম থেকে দেখে আসছে স্বাধীন দেশে পরাধীনতা। আর তার জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল প্রমাণ দুঃস্বপ্নের বাসর রাত। ওর কল্পনার সব রং দিয়ে সাজিয়েছিল যে ঘর। কিন্তু পরাধীনতার শিকল ওর সেই স্বপ্ন রঙিন ঘরে তালাÑঝুলিয়েছিল।
ওরা দুজন অনেক রাত অবধি গল্প করতো।গল্পে গল্পে আসতো দেশ, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি; যা ওদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক বেশি প্রভাব ফেলত। অবশ্য বেশি আলোচনা হতো রাজনীতি নিয়ে।
মাহমুদা প্রশ্ন করতো, ”বলতো কেন এমন হয়? আমাদের দেশকে তো পবিত্র দেশ বলা হয়, তবে কেন এতো ধর্মের কড়াকড়ি? কেন এতা রাজনৈতিক হানাহানি?”
মানুষের মুখে মুখে আলোচনায় মাহমুদার স্বামী কোরেশী কিছু কিছু বিষয জানতো। ও বলতো, বলোতো, “তোমার এই আমাকে যদি কেউ জোর করে কেড়ে নেয়, তবে কি তুমি তাকে সহজেই ছেড়ে দেবে? কিছুই বলবে না?”

মাহমুদা শোয়া থেকে উঠে বসতো। কোরেশীর চোখে চোখ রেখে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলতো, “আসুক না কেউ। খুন করে ফেলব”। তার পর খিল খিল করে হেসে স্বামীর বুকে গড়াগড়ি খেত।
কোরেশীর চোখে জল টলমল করতো। মেয়েটা ওকে এত ভালবাসে। অবশ্য ও ওতো ওকে কম ভালবাসে না। ও গল্পে গল্পে বলতো, “সে অর্ধ যুগ আগের কথা। দখলদার বাহিনী আমাদের ভূখন্ড দখল করে বসতি গড়্।ে তখন থেকেই অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। আর অন্যেরা হয় নিজভূমে পরবাসী। তারপর অনেক চুক্তি হলো, শান্তি উদ্যোগ হলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। ক্ষমতাবানদের সামনে ক্ষমতাহীনরা টিকলো না।”
মাহমুদা বিজ্ঞের মত প্রশ্ন ছুঁড়ে বলতো, “ আমাদেরও তো দোষ কি কম? কেন আমরা নিজেদের ভিতর হানাহানি কাটাকাটি করি? আমাদের ভিতর যদি কোন অসংগতি না থাকতো, তবে কি আমরা বর্হিশক্তিকে মোকাবেলা করতে পারতাম না?”- রাগে, ক্ষোভে মাহমুদার চোখ ফেটে জল আসে।
“হয়তো পারতাম, কিন্তু রাষ্টের ভূখন্ডে রাজনৈতিক ভাবে এমন কিছু হতেই পারে। এক এক দল, এক এক জোটের এক এক নীতি। নীতি ছাড়া যেমন মানুষ বেঁচেও মৃত তেমন নীতি ছাড়া দল, জোটও টেকে না”।- বলতো কোরেশী।
এভাবেই ওদের দিন চলতে থাকে। ভালবাসায় পরিপুর্ন হয়ে ওঠে মাহমুদা-কোরেশীর সংসার।
মাহমুদা অবসরে সাহিত্য পড়তো। সাহিত্য পড়ে ও দেশের সামগ্রিক অবস্থার কথা জানার চেষ্টা করতো। ও পড়তো রত্তভি ইয়াসিন-আল খালেদী, নাজিব নাসার, মুহাম্মদ ইস’ আফ আন-নাশ্শাশিরি ও খলিল আস-ষাকাকিনীর বিখ্যাত ও সৃজনশীল সব গদ্য সাহিত্য। ওর প্রিয় গ্রন্থের মধ্যে ছিল’ গাস্সান কানাকানি রচিত বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘রেজিস্ট্যান্স লিটারেচার ইন অকুপায়েড প্যালেষ্টাইন’। নাজমা খলিল-হাবিবের ছোট গল্প ওকে খুব টানতো। আরাম কেদারায় বসে মুগ্ধহয়ে পড়তো ফাদওয়া তুক্কান, গায়সান জাক্কতান, ইবরাহিম নাযরাল¬হ- এর কবিতা। স্বামী বাড়ীতে এলে এসব বইয়ের গল্প ও করতো।
মাঝেমাঝে খেপানোর জন্য কোরেশী মাহমুদাকে বলতো, “তোমায় যদি প্রেসিডেন্ট করি, তখন তুমি কি করবে? ”- লজ্জা পেলেও ও বলতো, “ আপসে মীমাংসা করবো। ওদেরটা ওরা ভোগ করবে। আমাদেরটা আমরা ”।- বলেই খিল খিল করে হেসে ম্বামীর চওড়া বুকে গড়াগড়ি খেত।
ওদের সুখে-দুঃখে দিন কাটতে লাগলো। দুঃখ ছিল একটাই, বাচ্চা না হওয়ার। অবশ্য সেটা ওরা গায়ে মাখতেই চাইতো না। ওদের ভালবাসা এতটাই গভীর ছিল।
এভাবেই এল ২০১২ সাল। নভেম্বর তখন, একটা গোষ্টীকে দমনের নামে ‘অপারেশন পিলার অব ডিফেন্স’ নামে আবারও রক্তাক্ত অভিযান চালায় ভিনদেশীরা। সাধারন মানুষেরাই মরতে থাকলো পাখির মতো।
ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেল মাহমুদা-কোরেশীর ঘর-বাড়ী, সংসার ও তারা নিজেরা। মাহমুদা ভাবে, এভাবে কি কোন সভ্য মানুষ মানুষকে মারতে পারে? কোরেশী বলে, পারে না। পারে মানুষ নামের রক্তপিপাসু বর্বররা।
২০১৪ সাল। মাহমুদা-কোরেশীর জীবনের সব থেকে আনন্দঘন বছর। বাবা হতে যাচ্ছে কোরেশী। মা মাহমুদা জন্ম দেবে তাদের অকৃত্রিম, অপার্থিব ভালবাসার ফসলকে।
দেশ এখন মোটামুটি শান্ত হলেও মাঝে মাঝে অশান্ত হওয়ার আশংঙ্খায় বাবা কোরেশী আর মা মাহমুদা। সন্তানের অমঙ্গলে বাবা-মার মনে বাঁধে অজানা শঙ্কা।
অজানা শঙ্কা খুব শীঘ্রই সত্যে পরিনত হল্।ো জুলাই মাসের ৭ তারিখ। দখলদার বাহিনী ‘ অপারেশন প্রটেক্টিভএজ’ নামে ধবংসাতœক অভিযান শুরু করে। তিন তরুনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
আবারও শুরু হয়ে যায় রক্তাক্ত ধবংসযজ্ঞ। মানবতা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে থাকে মানুষ। সারাদেশ ধবংস স্তুপে পরিণত হতে থাকে। মানুষ- পাখির মতো মরে পড়তে লাগলো সমস্ত রাস্তা, ঘাটে, মাঠে, ঘরে। চতুর্দিকে।
কোরেশী নিজেদের জীবন আর অনাগত সন্তানের জীবন বাঁচাতে ছুটে চলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। বিদেশি এক সংস্থার আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয় ওরা।
এর মধ্যে প্রসব বেদনা ওঠে মাহমুদার। আশ্রয় কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে এক মিষ্টি সুন্দর মেয়ে সন্তানের জন্ম দেয় মা মাহমুদা।
মাহমুদা আর কোরেশীর মুখমন্ডল চকচক করে ওঠে আনন্দে, উৎফুল্লতায়। ওদের জীবনে সবথেকে বড় পাওয়া এত বছর পর আসে। তাতে আনন্দ আরও দ্বিগুণ হয়। অন্য সব কিছু ভুলে যায়।
কিন্তু ওদের ভাগ্য যে বড্ড বড় বেইমানী করে। কোরেশী যেই না সন্তানের কপালে আদরের চুম¦ন এঁকে দিতে যাবে তখনই অঘটনটা ঘটে। উপরে গগন বিদারী বিমানের আওয়াজ আর নিচে আশ্রয় কেন্দ্রের ধবংসস্তুপ।

  • অনুপম সরকার, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা