তবুও, গল্পটি বিরহের নয় // সুশান্ত পাল
May 2, 2018
বাংলাদেশ // অরবিন্দ চক্রবর্তী
May 3, 2018

যে জীবন শরনার্থীর! (আমার মায়ের স্মৃতির পাতা থেকে ১৯৭১) // সুজয় সরকার

খোলা আকাশের নিচে ছোট্ট একটা চুলায় রান্নায় ব্যস্ত সন্ধ্যা। রান্নার উপকরণ বলতে মোটা কন্ট্রোলের চাল(রিলিফের), মিষ্টি আলু, আর কয়েকটা পুঁইশাকের ডগা।বেঁচে থাকার জন্য এই ঢেঁর। তবুও তো ওদের জন্য এই ব্যবস্থাটুকু হয়েছে, তা না হলে না খেয়ে মরলেই কে দেখতো! কতগুলো রাত শুধু যব আর ছোলার ছাতু খেয়ে কেটেছে ওদের সে খবর উপরওয়ালা জানেন। প্রথম প্রথম শুকনা ছাতু গিলতে যতোটা না গলায় আটকে যেত তার থেকে বেশি আটকে যেত চাপা কান্না। সারাজীবন যে খুব স্বচ্ছন্দে কেটেছে এমনটা নয়, তবু এভাবে দিন আর কখনোই কাটাতে হয়নি। এখন অবশ্য সব সয়ে গেছে। শুকনা ছাতু গলায় এখনো বাধলেও বোবাকান্নাটুকু আর কোথাও আটকায় না। ‘ভগবান এম্বা করেই মনে হয় সব সয়ায় নেয়, সবই তার লীলেখেলা’, মনে মনে একটা কৃতজ্ঞতা উচ্চারণ করে ফেলে সন্ধ্যা। সয়ে নেওয়ানোর ব্যাপারটা নিয়ে কৃতজ্ঞতা থাকলেও ‘লীলেখেলা’ ব্যপারটায় কোথায় যেন একটু বাধে ওর, অনেকটা গলায় আটকে যাওয়া শুকনা ছাতুর মতোই।

পাশে বসে আনমনে মাটিতে কি যেন অনবরত এঁকেই চলেছে আশা।

দিদি, নোখ দিয়ে মাটিতি আঁকতি নেই, অমঙ্গল হয়।

বামহাতে বাঁশের চটা দিয়ে বানানো খুন্তির মাথায় কিছু ফুটন্ত ভাত নিয়ে ডানহাতে টিপে দেখতে দেখতে বড়জা কে বোঝানোর চেষ্টা করল সন্ধ্যা। “আর অমঙ্গল!” যেন পৃথিবীর সমস্ত অমঙ্গলকে বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্য করে আশা। সে সাহস তার আছে বৈকি। কদিন আগেই ওর বছরখানেক বয়সের ছেলেটা মারা গেল, ধুঁকে ধুঁকে। বাংলাদেশে থাকলে কি হতো বলা শক্ত, তবুও খেয়ে না খেয়ে দিনরাত কাঁদাজল পাড়ি দিয়ে এতোটা পথ হেটে -কোলে আসাই ছেলেটার জন্য যম হয়েছে তা বুঝতে আশার বাকি নেই। আশার একবছরের ছেলেটা গরুর দুধ পছন্দ করতো। রাস্তায় আসতে আসতে ওর কয়েকটা আধো বোলের মধ্যে ‘মা, দুউউ, দুউউদ’ বলে কাঁদতো, আর আশা একটা পুরাতন কনডেন্সড মিল্কের টিনের কৌটাকে কাপ বানিয়ে তাতে শুধু জল দিয়ে, ‘এই নে বাবা’ বলে ছেঁড়া আঁচলে মুখ ঢাকতো। সেদিন থেকেই অমঙ্গল শব্দটা ওর কাছে বিদ্রুপের মতো লাগে। মুর্শিদাবাদ পৌঁছানোর এক সপ্তাহ পর যেদিন ওর ছেলেটা মারা গেল, সেদিন একফোঁটা চোখের জলও ফেলেনি আশা। কয়েকদিন জলটুকু স্পর্শ করেনি ও, পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিল ওকে বেঁচে থাকতে হবে। হ্যাঁ, সবকিছু হারিয়েও বেঁচে থাকাটাও মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মঙ্গল-অমঙ্গলকে দুপায়ে মাড়িয়ে কোনমতে বেঁচে থাকাটা হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ মঙ্গলের।

দিদি, কতবার কচ্ছি, শুনিস নে ক্যান!

ক তো সইন্দে, আমরা বাংলাদেশ ছাড়ে না আলি কি হত? মরলি গুলি খায়ে ওকেনেই মরতাম, শ্বশুরির ভিটেই পরে থাকতাম!

মাটিতে আঁকিবুঁকি না থামিয়েই যেন খানিকটা স্বগতোক্তির মতো বলে গেল আশা।

হ, শ্বশুরির ভিটে!

কন্ঠের আবেগটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও তার ঝাঁঝটা ঠিকই গিয়ে পড়ে ডানহাতে দিয়ে রাখতে যাওয়া বাঁশের চটার খুন্তিটার উপর। টিপে পরখ করে দেখার জন্য তোলা ভাতগুলো ভাতের হাড়ির কিনারে খুন্তির আঘাতে ছিটকে পড়ে চারিদিকে। আঁচল দিয়ে হাড়িটার সাথে আবেগটাকেও যেন সামলে নেয় সন্ধ্যা।

শ্বশুরির ভিটেয় মরে থাকতাম! কিয়ামত চাচারা না থাকলি সে স্বাধ কবেই পুরোন হয়ে যাতো।’

বলতে বলতে চোখ ছলছল করে ওঠে সন্ধ্যার। চোখের সে জল কালীগঙ্গার জলের চেয়েও স্বচ্ছ মনে হয়। সন্ধ্যার বাবার বাড়ি ছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলায়। বাবার বাড়ির ঠিক পাশ দিয়েই একটা ছোট্ট নদী। ওর বিয়ে হয়েছিল একই জেলায়। শ্বশুর বাড়ির কাছ দিয়েও চলে গেছে ছোট্ট একটা নদী, নাম কালীগঙ্গা, স্বচ্ছ কালো জল। প্রথম প্রথম বাবার বাড়ির মতো শ্বশুর বাড়ির পাশেও নদী দেখে সেকি খুশি না হয়েছিল মেয়েটা। সেখানে স্নান করতে যেয়ে কত মনে হয়েছে একটু সাঁতার দিতে। চৌদ্দ বছরের বালিকার জন্য সেটা স্বাভাবিক হলেও কয়েকমাসের নববধূর জন্য সেটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন তো বটেই, খানিকটা পাপও। অথচ সেই নদীই গতদুমাসে কয়েকবার সাঁতরে -দৌঁড়ে পার হতে হয়েছে মেয়েটাকে। পাপ-পুণ্যের হিসাব তখন বিধাতা করেছিলেন কিনা সে বিষয়ে ভাববার ফুরসত ওর মেলেনি, মেলেনি এ নিয়ে পাশের বাড়ির ভেলীদিদি বা কমলা পিশীমা কতোটা মুখ বাঁকিয়েছিল সে খবর নেওয়ার ফুরসত।

চৈত্র মাসের শেষের দিকে যখন পাকিস্তানি মিলিটারিরা বিভিন্ন গ্রামে আক্রমণ শুরু করল তখন প্রায়ই মিলিটারির ভয়ে ওদের আশ্রয় নিতে হতো নদী পার হয়ে কিয়ামত চাচার বাড়ি। সন্ধ্যার শ্বশুর ফটিকচন্দ্র সরকার আর কিয়ামত আলী বাল্যবন্ধু। ছোটবেলা থেকে একসাথে লাঠিখেলা, মাঠেঘাট চষে বেড়ানো, মাছ ধরা, এমনকি ফটিকচন্দ্র সরকারের বাড়ির নাড়ুমুড়ি কিয়ামত আলী বহুবার সাবার করলেও হিন্দুয়ানি আচারের কারনে ফটিকচন্দ্রকে নিজের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়াতে পারেনি কিয়ামত আলী। প্রজন্মের পরিবর্তনে আচারে শিথিলতা আসলেও সংকোচ রয়ে গেছে, যেন পঁচা মাছের মতো; সড়িয়ে ফেললেও দুর্গন্ধ থেকে যায় বেশটা সময়। ফলে এ গ্রামে দেড় বছর বিয়ে হয়ে আসার পরে কিয়ামত আলী তার মিতার পুত্রবধূদের একবারের বেশি দাওয়াত দিয়ে বাড়িতে নিতে পারেনি। আর আজ তাদেরকেই যখন তখন দৌড়ে যেতে হচ্ছে চাচাশ্বশুরের আতিথ্য গ্রহন করতে, সংকোচ আর আচার কালীগঙ্গার কালো জলে ধুয়ে। কিয়ামত চাচাও নিজের মেয়েদের মতোই আগলে রেখেছিলেন বাল্যবন্ধুর পুত্রবধূদের। কিন্তু বেশিদিন পারেননি,একদিন সাঁঝের আঁধারে নিজেই এসে বাল্যবন্ধুকে জানালেন।

ফটিকরে, তোরে আর মনে হয় বেশিদিন বাঁচাতি পারবোনানে, মেলেটারিরা যেম্বা শুরু করেছে, এখন নাকি আর হিদু-মোছনমান বাছতেছে না, তুরা ইন্ডিয়া চলে যা।

তারপর কয়েকদিন ফটিকচন্দ্র তার দুই ছেলে, নাতি,আর দুই বৌমাকে নিয়ে শুধু হেটেছে; কখনো রাতের আঁধারে চুপিচুপি, ঝোঁপঝাঁড় সাপখোপের ভয় কোথায় উড়ে গেছে। বাড়ি থেকে ইন্ডিয়া বেশি দূর তা নয়। ভয় একটাই, মেলেটারির হাতে পড়লে আর রক্ষা নেই, ‘মালাঊন’ দেখলেই গুলি। ওরা আজ যেখানে আছে সেটা একটা ছোটখাটো শরনার্থী শিবির, মুর্শিদাবাদ জেলায়, একেবারে পদ্মার কোল ঘেঁষে।

আচ্ছা সইন্দে, আমরা কি আর দ্যাশে ফিরতি পারব?

আমি ক্যাম্না কব?

তোর তো ম্যালা বুদ্ধি, তুই তো সবার সাতে কতাও কইস, কিচু শুনিস নি?

বাদ দে না দিদি, আমরা তো ভালই আছি একেনে। ইন্ডিয়া সরকার রিলিপ দেচ্চে…

কদিন আগেও ছেলেটা মারা যাওয়ার পর যখন আশা একেবারে চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল তখন সন্ধ্যা ওর সাথে কথা বলার কতো চেষ্টাই না করতো। উদ্ভট গল্প করত। অথচ আজ নিজেই থামিয়ে দিতে চাইছে।

অই দ্যাখ, ভাত হয়ে গেছে। তুই ইট্টু পুঁইশাকগুনু বাচে দেতো দিদি, আমি মৌ-আলুগুনু কুটে নিই।

হায় হায় গো, জয়বাংলার লোক মরল গো, নৌকাটা গেল গো!

পদ্মার পাড় থেকে হৈচৈ শব্দ কানে আসে। রান্না ফেলে সন্ধ্যা আর আশা সেদিকে দৌঁড় দেয়। ওর স্বামী আর ভাশুর দুজনে একটা ছোট নৌকা নিয়ে গিয়েছিল পদ্মার চরে, রান্নার জন্য কিছু লাকড়ি আনতে। ফেরেনি এখনো। ওদের শরনার্থী শিবিরটার কাছেই পদ্মার একটা বেড়িবাঁধের মতো, নদীটা এখানে একটা বাঁক নিয়েছে। সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা ভয়ংকর পাঁকের মধ্যে পড়ে ওদের নৌকাটা অনর্গল ঘুরপাক খাচ্ছে, আর দুজন কিছু উপায় না পেয়ে অবিরত বৈঠা মেরে যাচ্ছে।

হায়, হায় গো! ঐ পাকে গতবছরও কয়জন লোক ডুবে মরেছে!

ভীড়ের মাঝ থেকে একগাদা অচেনা কন্ঠ ভেসে আসছে সন্ধ্যার কানে, আশা তো অনেক আগেই কাঠেরপুতুল হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যা যেন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, ওর দৃষ্টি যেন কোথায় হারিয়ে গেছে; ওর সামনে যেন ভয়ংকর পদ্মা না, ছোট্ট কালীগঙ্গা। ও যেন শুধু আশার কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে, “সইন্দে, দৌড়ো, সামনে অল্পজল, সাঁতার দিয়া লাগবি নানে, দৌড়ো… ”

লোক দুইটার কপাল বুলিহারি, এ পাঁক থেকে বেঁচে আসল, জয়বাংলার লোকের কপাল গো…

রাখে হরি, মারে কে!

এই দেখে আস, তোমাদের জয়বাংলার লোকের কপাল গো…

ভীড়ের মধ্যে একগাদা কন্ঠস্বর।

চোখের সামনে স্বামী আর দেওরকে জীবন্ত ফিরতে দেখে গোঁ গোঁ করে কেঁদে ওঠে আশা; ঘোর কাটে না সন্ধ্যার; ওর সামনে শুধুই ছোট্ট কালীগঙ্গা, ও আর আশা যেন শুধু দৌঁড়ে যাচ্ছে, তবু যেন দৌড়ানো শেষ হয়না ওদের, একটুকরো নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য…

 

*******