পরিযায়ী।। তারিক হাসান
April 30, 2018
ছোট কবিতা ।। মো. জিয়াউল হক
May 2, 2018

যেমন দেখলাম জাপান- নিহাদ আদনান তাইয়ান

জাপানে আছি প্রায় বছরখানেক হয়ে এল। কিছুটা হলেও জাপানিজ কালচার সম্পর্কে একটা আইডিয়া তৈরি হয়েছে, কিছুটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায়, কিছুটা বা পারিপার্শ্বিক লোকজনের সাথে আলোচনায় পরোক্ষলব্ধ অভিজ্ঞতায়, তবে যেভাবেই বলি না কেন, একটা বিষয় আমি মোটামুটি নিশ্চিত, জাপানিদের মতন শৃঙ্খলিত আর পরিশ্রমী জাতি হয়ত আরও পাওয়া যাবে কিন্তু এর পাশাপাশি এতটা বিনয়ী আর অমায়িক অন্য কোন জাতি আছে কিনা তা সন্দিহান। আমার একটা জিনিস ভেবে আসলেই কষ্ট হয় ,এরা যখন নিজ দেশের বাইরে অন্য কোন বিশৃঙ্খলিত পরিবেশে যায়, শারীরিক কষ্টটা হয়তো এরা খুব সহজেই মানিয়ে নিতে পারে কিন্তু মানসিকভাবে যে ধাক্কাটা খায় তা এরা কন্ট্রোল করে কিভাবে? কি জানি, হয়ত এটাও তারা জীবনের একটা লেসন হিসবে ধরে নেয়! যাই হোক, নিজের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করি।

কাস্টমার সার্ভিস ডেলিভারি, এককথায় অসাধারণ বললেও কম হবে! যেকোন সার্ভিস দেয়ার জন্য যে সময় চাইবে আপনার কাছে, নিশ্চিত থাকতে পারেন তার চেয়ে আগেই সেটি পেয়ে যাবেন, যেমন- ৩ ঘণ্টা বললে ২ ঘণ্টায় বা ৫ দিন বললে ৩ দিনেই হাতে পাবেন। কিছুটা সময় এরা হাতে রেখে এক্সট্রা হিসেবে রেখে দেয় রিস্ক এড়াতে, যাতে কোনভাবেই কাস্টমারকে ওয়েট না করতে হয়!

কোন একটি রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে যদি কোন মেন্যুর ইনগ্র্যাডিয়েন্ট নিয়ে জানতে চাই এবং কোন কারনে যদি সে শতভাগ নিশ্চিত না থাকে, তাহলে এটার পিছেই হয়ত ১০-১৫ মিনিট ব্যয় করে ফেলবে, প্রথমে গুগল সার্চ, না হলে অন্য ২/৩ জন ওয়েটারকে নিয়ে একটা ছোটখাট গবেষণা, তারপরও না হলে দরকারে হেড অফিসে ফোন পর্যন্ত দিতে দেখেছি! দেখা গেছে, পরে আমার নিজের কাছেই এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করায় বিব্রত লাগতে থাকে কিন্তু তিনি ঠিকই সিরিয়াসলি সবকিছু করে এসে আমাকে হাসিমুখে উত্তর জানিয়ে যায় এবং কালক্ষেপণ করায় আমাকে ২/৩ বার ‘গোমেন্নাসাই’ মানে ‘সরি সরি’ বলে দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে।

ম্যাকডোনাল্ডসে মাঝে মাঝেই যাওয়া হয়, ওখানে এক ধরণের ‘কোন’ আইসক্রিম পাওয়া যায়, অর্ডার করলে ইনস্ট্যান্টলি রেডি করে দেয়, মানে আমাদের দেশের মতনই, বিস্কুটের অংশটা নিয়ে মেশিন প্রেস করে আইসক্রিমটা বসিয়ে দেয় আরকি! কিন্তু ‘কোন’ এর যে স্পেসিফিক একটা সেইপ থাকে, ওটা যদি সামান্য একটু এদিক ওদিক হয়, সাথে সাথে ওটা ফেলে দিয়ে সম্পূর্ন নতুন করে তৈরি করে, অথচ ওটা আমার কাছে হয়ত ঠিক চোখেই ধরা পড়ত না, কিন্তু তারা কনসার্ন, ঐযে কাস্টমার সার্ভিস বলে কথা, যদি মাইন্ড করি!

আরেকটা জিনিস খেয়াল করলাম, রেস্টুরেন্ট এ যদি কোন ওয়েটার কোন ভুল করে যেমন হাত থেকে কিছু ফেলে দেয় বা একটা করতে আরেকটা করে, তাহলে বাকি ওয়েটাররা বিরক্ত হওয়া তো দূরের কথা, সবাই মিলে এটা নিয়ে মজা করা শুরু করে পরিস্থিতি নরমাল করে ফেলে! হয়ত এটাও একটা স্ট্রাটেজি!

জাপানের সকাল ৮-৯ টার ট্রেন, বাংলাদেশে ইদ-কোরবানিতে ঠিক ২/৩ দিন আগে যে ভিড় হয়, অনেকটা তেমন! আমি পারতপক্ষে এই টাইমটা এড়িয়ে যাই, কিন্তু তাও যে কয়দিন বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছে, নিজেকে অনেকটা স্যান্ডউইচের মতন মনে হয়েছে, সামনে পিছে ডানে বামে সবার মাঝে চিরে চ্যাপ্টা হবার অবস্থা, ছেলে মেয়ে সবাই একসাথে! কখনও কারও শরীরে ধাক্কা লেগে যাচ্ছে কিংবা কারও জুতোয় পাড়া! কিন্তু কারও একবিন্দু ধৈর্যচ্যুতি হতে দেখিনি, শুধু বগি না, পুরো ট্রেনেই বলতে গেলে শুনশান নিরবতা! ভাবলেও অবাক হতে হয়, হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে বা বসে আছে, কিন্তু কোন কোলাহল তো দূরের কথা, কোন সাউন্ডই নেই, শুধু ট্রেন চলার শব্দ! কী করে এটা সম্ভব?

আরেকটা বিড়ম্বনায় প্রায়ই পড়তে হয়, ট্রেনে বসতে যাব, সিট একটা কিন্তু মানুষ দুজন হয়ে গেল, কে কাকে বসতে দেবে এটা নিয়ে কয়েক দফা অনুরোধের আদান-প্রদান করতে হয়! শুধু ট্রেনেই না, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমন একটা কম্প্রোমাইজ করার প্রাকটিস করে এরা! যেন যে ছাড় দিতে পারল সেই জিতে গেল এই টাইপ!

এবার ব্যক্তি মানুষের কথায় আসি! জাপানে আসার পর আমাকে ভালো একটা অ্যাাপার্টমেন্ট খুঁজে দিতে স্কলারশিপ অথরিটি থেকে একজন গাইড দেয়া হল, মানে অনেকটা আমাদের দেশের দালালের মতন! আমার গাইড একজন মহিলা, বয়স ৪০ এর মতন, আমাকে নিয়ে ২/৩ দিন ঘুরে সব কিছু ঠিক করে দিলেন, নিজের অফিসিয়াল কাজ হিসেবে ফোন দিয়ে গ্যাস, কারেন্ট, পানি, ইন্টারনেটসহ সবাইকে ডেকে এনে সবকিছু ঠিকমতন ফিক্সড তো করলেনই,ফাঁকে ফাঁকে আমাকে ফ্ল্যাট গোছাতে যাবতীয় হেল্প যেমন- পর্দা টানানো, জিনিসপত্র সেট করা, এমনকি আমার বালিশের কাভার, বেড কাভার সব নিজ হাতে সেট করলেন। আমি জিম করি শুনে আমার জন্য পরদিন আশেপাশে কোথায় কোথায় ভালো জিম আছে তার ম্যাপ ডাইনলোড করেও নিয়ে আসলেন, আর বিদায় বেলায় তার হাতে থাকা বিশাল ব্যাগটি রেখে বললেন, “এখানে কিছু জিনিস আছে, আশা করি তোমার কাজে আসবে।” খুলে দেখলাম, একটি ঝাড়বাতি টাইপ লাইটিং সিস্টেম, কিছু কিচেন আর বাথ আইটেম এবং সাথে টুকটাক আরও অনেক কিছু, আমি একটু কনফিউসড হয়ে যখন ওনাকে এর মূল্য দিতে চাইলাম, উনি বললেন, ” না না, এটা বিক্রির জন্য না! তোমার জন্য নিয়ে এসেছি, জাপানে তোমার নিউ লাইফ শুরু করার জন্য আমার তরফ থেকে তোমার জন্য উপহার!” আমি তাকে লাঞ্চে ইনভাইট করলে উনি বললেন ,”এখন না,জাপান থেকে যাবার আগে বল, এখন করলে মনে থাকবে না পরে, যাবার আগে করলে মনে থাকবে অনেকদিন! আর তোমার ফ্যামিলি মেম্বারদের কেউ যদি তখন থাকে তাহলে তাদের সাথেও দেখা হল!” আমি তখন মনে মনে ছোটবেলা থেকে দেখে আসা দালালদের কথা ভাবছি, আর পাশাপাশি ওনাকেও দেখতে লাগলাম!

আসলে এমন যে আরও কত ঘটনা! তাই জাপান থেকে এক বছরে একাডেমিক সেশনের বাইরে যে কী কী শিখলাম তা যদি এক বাক্যে বলি তা হল প্রতিটি মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা আর নিজের কমিটমেন্টের প্রতি ডেডিকেটেড এবং স্ট্রং থাকা। আর কিছু কমন টপিক যেমন- নারীপুরুষের সমতার কথা যদি বলি, তাহলে বলব জেন্ডার ভেদে যে কোন বৈষম্য করা যায়, এদের ইয়াং জেনারেশন মনে হয় এটা জানেও না যে এমন কিছু করা যায়! শুধু এটা না, অনেক নেগেটিভ টার্ম এর সাথেই এদের আদৌ পরিচয় আছে কিনা সন্দেহ হয়, থাকলেও হয়ত গল্প বা ইতিহাসের পাতার মাধ্যমে আছে, বাস্তব জীবনে হয়ত তেমন নেই। মাঝে মধ্যে আসলেই মনে হয়, স্বর্গের খুব কাছাকাছি আছে হয়ত এরা চলে এসেছে! এজন্যই তো বলে-
“কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর? মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!”