নাদিরা সুলতানা নদী
August 29, 2019
শাকিল আল- আমিন
September 2, 2019

মোঃ সাইফুর রহমান

নীলার নীলপদ্ম

এক ॥
একটার পর একটা ফুচকা খেয়ে যাচ্ছে নীলা। সে এক দেখার মত দৃশ্য। একটা ফুচকা মুখে দিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলে সে, যেন মন প্রাণ দিয়ে ফুচকার স্বাদ আস্বাদন। মামা, আরেক প্লেট ফুচকা দেন, এবার কিন্তু ঝাল আরো বেশি, টকটাও একটু বেশি লাগবে, ফুচকাওয়ালাকে উদ্যেশ্য করে নীলা বলল। ফুচকাওয়ালা ঝুন্টু মিয়াও সেইরকম উৎসাহ নিয়ে নীলার জন্য স্পেশাল ফুচকা বানাচ্ছে, নীলার মত কাস্টমার পেয়ে তার জীবন স্বার্থক, ফুচকা বানানো যে একটা শিল্প এবং সে ছাড়া এই বিদ্যা আর কারো রপ্ত নেই সেটা সে বকর বকর করে বুঝিয়ে দিচ্ছে। সুন্দরী মেয়ের ফুচকা খাবার দৃশ্য আসেপাশের মানুষজন মনোযোগ সহকারে দেখছে। মোনায়েমও এক প্লেট ফুচকা নিয়েছিল কিন্তু ঝালের কারনে তিনটার বেশি খেতে পারেনি। ফুচকা খাওয়া বাদ দিয়ে সে নীলার খাওয়া দেখছে, বলা যায় অবাক হয়ে দেখছে। নীলা আজ অত্যন্ত খুশি, হাসবেন্ডের সাথে আজই প্রথম সে ফুচকা খেতে বেরিয়েছে। নীলার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, তার প্রাণচাঞ্চল্য দেখে তাকে সদ্য কৈশোর পেরোনো কিশোরীর মত লাগছে। মোনায়েম ভেবে পায়না, একটা মেয়ে এত অল্পতেই কিভাবে এত তুষ্ট হয়। নীলাকে নিয়ে কখনই বের হওয়া হয়নি তার। বিয়ের আটমাস হতে চলল, নীলাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যায়নি মোনায়েম, এই নিয়ে নীলাও কখনো মুখ খুলে কিছু বলেনি মোনায়েমকে। আজও বের হওয়া হত না, নীলাকে ডাক্তার দেখাতে বের হয়েছিল, ছোট ভাই সোহেল ঢাকায় থাকলে সেই তার ভাবিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেত। অনেকটা বাধ্য হয়ে মোনায়েম স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়েছে।

একটা স্বনামধন্য রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত মোনায়েম। দেশজুড়েই সেই কোম্পানির অনেকগুলো প্রজেক্ট। চাকুরীর প্রয়োজনেই সারা দেশে ঘুরে বেড়াতে হয় তার। অফিসটাকেই জীবন বানিয়ে নিয়েছে সে। অফিস ছুটির পর সোজা চলে যায় বন্ধুদের আড্ডায়, কখনোবা বারে, কখনওবা কোন লিটনের ফ্ল্যাটে, যতক্ষন বাসার বাইরে থাকে ভালই থাকে। সময় কাটাবার সব রকম ব্যাবস্থা করে রেখেছে সে। ভাগ্যিস শনিবার তার অফিস খোলা, শুক্রবার যে কি বোরিং কাটে তার, অনেকটা সময় বাধ্য হয়ে বাসায় থাকতে হয়। অবশ্য ঘুমেই চলে যায় দিনের অনেকটা সময়। নীলা নামে যে তার একজন স্ত্রী আছে শুক্রবারই তার একটু একটু উপলব্ধি হয়। আচ্ছা তার কি দোষ, সে তো আর নীলাকে পছন্দ করে বিয়ে করেনি, বাবা মায়ের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। সে তো সুমনাকে ভালবাসতো, অনেকটা পাগলের মতই। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে পড়ার সময়ই দুইবছর জুনিয়র সুমনার সাথে প্রেম হয় মোনায়েমের। ক্যাম্পাস লাইফের পুরোটা সময় কাটে তাদের ঘর বাধার স্বপ্নে। সেই ভালোবাসা ছিল জন্ম জন্মান্তরের। তাইতো ইউএস সেটেল পাত্রের সাথে ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে সুমনার বিয়ে হয়ে যাবার পর ছেলের পাগল পাগল অবস্থা দেখে অনেকটা জোর করেই নীলার সাথে বিয়ে দেয় মোনায়েমের বাবা মা। কিভাবে ভুলবে সে সুমনাকে। তার জায়গায় নীলাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা মোনায়েম।

নীলার বাবা একরামুল হক ময়মনসিংহ শহরের এক বেসরকারি কলেজের অধ্যাপক, নিপাট ভদ্রলোক মানুষ। সদা হাস্যোজ্জল। বিপতœীক হয়েছিলেন নীলার বয়স যখন নয়। আর বিয়ে করেননি তিনি, একমাত্র মেয়ে নীলাকে নিয়েই ছিল তার জীবন। নীলাকে কলেজ জীবনের বন্ধুর ছেলে মোনায়েমের হাতে তুলে দিতে পেরে অনেকটা ভারমুক্ত তিনি । এই আধুনিক যুগেও মোবাইল ফোন ব্যাবহার করেননা । নীলার খোঁজ খবর নিতে মাসে একবার ঢাকায় আসেন, বাকী সময়টায় চলে বাবা মেয়ের চিঠি আদান প্রদান। নীলার অবসর সময়ের অনেকটা চলে যায় বাবাকে চিঠি লিখে আর বাবার চিঠি পড়ে। অবশ্য মোনায়েমকেও রোজ চিঠি লিখে সে, কিন্তু চুপি চুপি, যাতে মোনায়েমের হাতে চিঠিগুলো কখনো না পরে। একরাম সাহেবের আরেকটা বিশেষ গুন আছে, চমৎকার রান্না পারেন তিনি। নীলার শশুর বাড়ি আসলে তিনি স্পেশাল কিছু মেনু রান্না করেন। বেয়াইন সাহেবাও একরাম সাহেবের এই বিশেষ গুনে মুগ্ধ। কলেজ জীবনের বন্ধুর সাথেও হয়ে যায় জম্পেশ আড্ডা।

দুই ॥
আজ খুব যতœ সহকারে শাড়ি পরেছে নীলা, কপালে লাল টিপ, বিশেষ দিন আজ। অন্যদিন অনেক রাত করে বাসায় আসলেও নীলার বিশ্বাস মোনায়েম আজ দেরী করবেনা। হয়তোবা হাতে করে নিয়ে আসতে পারে এক গুচ্ছ ফুল। আচ্ছা, ফুল না নিয়ে আসলেও চলবে, শুধু সন্ধার মধ্যে বাসায় আসলেই খুশি হবে সে। আজ সে মোনায়েমের পছন্দের সব রান্না করেছে । খিচুড়ি, ডিমওয়ালা ইলিশ ভূনা, গরুর মাংস, বেগুনভাজা, চিংড়ী মালাইকারী আরো কত কি। বাবার কাছ থেকেই রান্না শেখা তার। আজ তাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। আজ মোনায়েমকে বলে দেবে তার বাচ্চার মা হতে চলেছে সে। নিশ্চয়ই মোনায়েম অনেক খুশি হবে এই কথা শুনে। মোনায়েম যে তাকে ভালবাসেনা এবং এটা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে একথা ভালভাবেই বুঝতে পারে নীলা। কিন্তু সে তো মোনায়েমকে অনেক অনেক ভালবাসে। সেই প্রথম দিনে দেখার পর থেকেই। নীলার ভালোবাসার রাজ্য আবর্তিত হয় মোনায়েম আর মোনায়েমের পরিবারকে ঘিরে। রোজ মোনায়েমকে লেখা চিঠিতে সে প্রকাশ করে তার ভালোবাসা। প্রতিদানে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু চাওয়ার নেই তার। নীলার বিশ্বাস একদিন না একদিন মোনায়েম তাকেই ভালবাসবে মনপ্রাণ দিয়ে। সেদিনের অপেক্ষায় আছে নীলা। দরজায় কলিংবেলের শব্দে এক প্রকার দৌড়ে দরজার কাছে যায় নীলা, নিশ্চই মোনায়েম। দরজা খুলে মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। পাশের বাসার কাজের মেয়েটা আসছে একটু আদা আর ধনেপাতা নেয়ার জন্য।

রাত প্রায় ১২ টা, কলিংবেলের শব্দে দরজা খুলে দিল মোনায়েমের বাবা। তীক্ষ্ দৃস্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে। রিটায়ার্ড ব্যাংকার এই লোকটাকে একটু এড়িয়েই চলে মোনায়েম। বিশেষ করে নীলার সাথে বিয়ে হবার পর থেকে মোনায়েম পারতপক্ষে তার ছায়াও মাড়ায়না। আজ একটু ড্রিংসও করে এসেছে, তাই আজ লোকটার সাথে কথা বলার প্রশ্নই আসেনা। কোনমতে বাসায় ঢুকে বেডরুমে গিয়ে দেখে নীলা নতুন একটা শাড়ি পড়ে ঘুমিয়ে আছে। একটু অবাক হল মোনায়েম, সে বাসায় না আসা পর্যন্ত নীলা সাধারণত ঘুমায় না। রাতের খাবার না খাওয়া পর্যন্ত নীলাও খায়না। আজ আবার কি হল। মনে হয় অসুস্থ, থাক ভালই হয়েছে, রোজকার মত অসস্তিকর পরবেশ সৃস্টি হবেনা। মোটেই খিদে নেই মোনায়েমের, চারপাশটা কেমন জানি ঘুরছে, দেরী না করে অফিসের পোষাকেই ঘুমিয়ে পড়ল মোনায়েম।

রিনিঝিনি চূড়ির শব্দে ঘুম ভেংগে গেল মোনায়েমের। কোনমতে চোখ খুলে দেখে নীলার দুহাতে কাঁচের চূড়ি, খুশিতে তার চোখ ছলছল করছে। এত খুশির কি আছে? বিশয়টা ধরতে কিছুটা সময় লাগল তার। গতকাল রাতে বাসায় আসার সময় রাস্তার মোড়ে ছোট একটা মেয়ে এক গোছা কাঁচের চূড়ি কেনার জন্য বেশ অনুনয় বিনয় করছিল। মেয়েটাকে এমনি কিছু টাকা দিতে চাইলেও নিলনা, অগত্যা চুড়ির বিনিময়ে পঞ্চাশ টাকা দিল। মাতাল অবস্থায় গত রাতে সেই চুড়িই রেখেছিল ড্রেসিং টেবিলের উপর। বুঝতে পেরে আবার চোখ বন্ধ করল মোনায়েম, আজ শুক্রবার ঘুমের দিন, দিনটা কোনভাবেই নস্ট করা যাবেনা।

তিন ॥
আজ ডায়াবেটিসটা একটু বেড়েছে মায়মুনা বেগমের। সকাল থেকে প্রেসারও একটু বেড়েছে মনে হয়, কেমন জানি অসস্তি লাগছে। আসলে মনটা ভাল না থাকলে শরীরটাও সাপোর্ট দেয়না। এক বছর হয়ে গেল বড় ছেলে মোনায়েমকে বিয়ে করিয়েছেন। এত লক্ষী একটা বউ আজকাল দেখা যায়না। তার নিজের মেয়ে নাই, নীলাই নিজের মেয়ের মত এই সংসারকে আপন করে নিয়েছে। শশুর শাশুড়ি অন্তপ্রাণ নীলা, তাদের দেখভাল ভালো মন্দ সব দিকেই সে সামাল দেয়। মোনায়েমের সব অবহেলা হাসিমুখেই মেনে নেয়, কখনওই বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেনি তাদের আছে। ইদানিং খুব বেশি অপরাধ বোধে ভুগেন মায়মুনা বেগম। তার স্বামীর বন্ধুর মেয়ে নীলাকে মোনায়েমের সাথে বিয়ে দিয়ে মেয়ের জীবনটা নষ্ট করলেন না তো। ভেবেছিলেন ছন্নছাড়া ছেলেটাকে নীলার সাথে বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু তার ধারনা মিথ্যে প্রমানিত হয়েছে। স্বামী আবিদ হাসানের সাথে বিষয়টা নিয়ে অনেকবার কথা হয়েছে তার, সেও আছে একই চিন্তায়। কয়েকমাস পর ঘরে নতুন অতিথি আসবে সেদিকেও মোনায়েমের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বউকে নিয়ে কোথাও বের হয়না সে এমনকি হানিমুনেও কোথাও যায়নি। ভাবতে ভাবতে দুফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল মায়মুনা বেগমের।

শমরিতা হাসপাতালে ডাক্তারের চেম্বারে এসেছে নীলা। সাথে এসেছে তার একমাত্র দেবর সোহেল। ডাক্তার মিথিলা রায়হান তার শশুরের পারিবারিকভাবে পরিচিত। নীলাকে বেশ কিছুক্ষণ চেকআপ করে কিছু নতুন ওষুধ লিখে দিলেন। প্রথম বেবি, তাছাড়া একটু কমপ্লেক্সিসিটি আছে, সাবধানে থাকতে হবে। এই সময়ে হাসব্যান্ড আর পরিবারের সাপোর্ট খুব দরকার, প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে কথাগুলো বললেন ডাক্তার। সামনের মাসের সম্ভাব্য ২২ তারিখ আমরা চেস্টা করব নরমাল ডেলিভারি করার আর বেশি প্রবলেম হলে সিজার করে দিব। হাজব্যান্ড মশাইকে বলবেন মাঝে মাঝে অফিস ছুটি নিয়ে আপনার পাশে থাকতে, হাসিমুখে আবার কথাগুলো বললেন ডাক্তার। চেম্বার থেকে বের হলে সোহেল বলল, ভাবী চল আইস্ক্রিম খাই। অন্যদিন হলে নীলাই সোহেলকে বলত আইস্ক্রিম খাবার কথা। ডাক্তারের কথাগুলো খুব কানে বাজছে নীলার, আসলেই তো মোনায়েম কি পারেনা তার অনাগত বাচ্চার কথা ভেবে একটু সময় দিতে তাকে, সে তো তার জন্য কিছু চাচ্ছেনা। ভাবী তুমি কাঁদছ কেন, সোহেলের কথায় সম্বিত ফিরে ফেল নীলা। কিছু নারে, তুই ভার্সিটি যাবিনা আজ? না ভাবী, টিচার দেশের বাইরে, তাই আজ ক্লাস নেই।

নীলা কিছু না বললেও সোহেল জানে নীলা ভাবি কেন কাঁদে আর কেনইবা মাঝে মাঝে মনমরা হয়ে থাকে। নীলাকে সোহেল শুধু ভাবি না, নিজের বড় আপন বোনের মতই ভাবে। নীলার কাছেই তার সব আবদার, তার গার্লফ্রেন্ডের কথা বাসায় শুধু নীলাকেই বলেছে। একবার তো দেখাও করিয়েছে নীলার সাথে। নীলা কথা দিয়েছে পাস করার পর সেই তাদের বিয়ের সব ব্যাবস্থা করে দিবে। সোহেল বুঝে পায়না নীলার মত একটা মেয়ে পেয়ে মোনায়েম ভাইয়া কেন এমন অবহেলা করে। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা হয় ভাইয়াকে ব্যাপারটা নিয়ে জিজ্ঞেস করতে, ভেবেছিল একসময় ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু আর কত।

চার ॥
পদ্মফুল নীলার খুব পছন্দ, তার খুব স্বপ্ন ছিল বিয়ের পর তার হাসব্যন্ডকে বলবে তাকে নীল পদ্ম এনে দেয়ার জন্য। মাঝে মাঝে ভাবে মোনায়েমকে ব্যাপারটা বলবে, কিন্তু সাহস হয়না। এইভেবে নিজেকে সান্তনা দেয়, একজীবনে সবার সব ইচ্ছা পূরন হয়না। তাদের ছেলে নাকি মেয়ে হবে ইচ্ছা করেই আল্ট্রাসনো করায়নি নীলা। রুমে একা থাকলে নীলা পেটে হাত দিয়ে কথা বলে অনাগত সন্তানের সাথে। তার সন্তানও মনোযোগ দিয়ে মায়ের কথা শোনে, কিছু জিজ্ঞাসা করলে পেটে লাথি দিয়ে তার কথা উত্তর দেয়, খুব দুস্ট হয়েছে তার বাবুটা। বাবুটাকে সে বলে দিয়েছে তোমার বাবার দেয়া নীলপদ্ম আমার লাগবেনা, তুমিই আমার নীলপদ্ম। এই নামেই সে বাবুটাকে ডাকে।

সেই দিনটার কথা এখনো ভুলতে পারেনা মোনায়েম। একদিন সকালে তাকে ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়েছিল সুমনা, বলল তাড়াতাড়ি ক্যাম্পাসে আসো, জরুরী কথা আছে। তড়িঘড়ি করে ক্যম্পাসে গিয়ে যা শুনল তার জন্য প্রস্তুত ছিলনা। উত্তরে মোনায়েম বলল দেখ তুমিতো জানো আমি কয়েক জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছি খুব শিগ্রই একটা কিছু হয়ে যাবে, আর কয়েকটা দিন সময় দরকার। সুমনা সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বলল, দেখ আমিতো শুধু তোমার, তোমাকে ছাড়া আমি অন্য কোন কিছু চিন্তাই করতে পারিনা। কিন্তু এবার খালু ইউএস সেটেল এক পাত্র নিয়ে আসছে, ওখানে নাকি বেশ বড়সড় ব্যাবসা আছে। বাবাকে তো তুমি চেনো, প্লিজ তাড়াতাড়ি একটা কিছু কর, আমি আর কতদিন আটকাবো। অনার্স তো শেষ করে ফেললাম, এখন আর মানতে চাচ্ছেনা ফ্যামিলির কেউ।

সবকিছু ভালোভাবেই যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক আড়াই মাস পর গভীর রাতে একটা মেসেজ পেল সুমনার কাছ থেকে। আমাকে মাফ করো মোনায়েম, আমি অনেক চেস্টা করেও হেরে গেছি। তোমার আমার বিশয়টা নিয়ে বাবার সাথে ঝগড়া হবার পর বাবার স্ট্রোক হল, এরপর তার কথা আমি আর ফেলতে পারিনি, যতদিন বাঁচব তোমাকেই ভালবাসবো । পুরো সাতদিন কারো সাথে কথা বলতে পারেনি মোনায়েম, তার জীবনটা একেবারে এলোমেলো হয়ে গেছে। সে হয়ে গেছে এক অন্য মানুষ। সুমনার সাথে কাটানো চারটা বছর সে কিভাবে ভূলবে। ইচ্ছা ছিলনা আর বিয়ে করার কিন্তু বাবা মায়ের চাপে বাধ্য হল নীলাকে বিয়ে করতে। সুমনার জায়গা যে সে আর কাউকে দিতে পারবেনা। পুরনো কথাগুলা ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করে অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়েছিল মোনায়েম। নিশ্চয়ই সুমনাও তার মত খারাপ আছে, সেও হয়ত সুখি নেই হাসব্যান্ডের সাথে। ভাবতে ভাবতে ইন্টারকম বেজে উঠল। রিসিভ করতেই বস তার রুমে ডাকলেন।

বসের রুম থেকে বেরিয়ে মনটা বেশ ফুরফুরে মোনায়েমের। আগামী দুইমাস থাকতে হবে কক্সবাজারে, তাদের কোম্পানীর একটা ফাইভ স্টার হোটেলের প্রজেক্ট চলছে সেখানে। প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করবে সে। আগেরজন বিদেশে গেছে চিকিৎসা পারপাজে। এই দুইমাস পুরোপুরি নিজের মত থাকা যাবে।কালই রওয়ানা দিবে সে।

পাঁচ ॥
এই আমার নীলপদ্ম কি কর? দুষ্টুমি কর? বাবা কক্সবাজারে চলে গেছে তাই মন খারাপ? এইত বাবু আর মাত্র কয়েকটা দিন, তুমি আমাকে আর তোমার বাবাকে দেখতে পাবে। বাবা তোমার জন্য অনেকগুলা খেলনা নিয়ে আসবে। তুমি আসলে তোমার বাবা ঠিকই চলে আসবে তোমার কাছে। নীলা রোজকার মত কথা বলছে তার বাবুর সাথে। কয়েকদিন ধরে নীলার শরীরটা ভাল যাচ্ছেনা। হাত পা ফুলে গেছে, ডাক্তার মিথিলা বাসায় এসে দেখে গেছে। আগামী কয়েকদিন খুব সাবধানে থাকতে বলেছে।

কক্সবাজারে এসে মোনায়েম আগের চেয়েও বেশি ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। ৫ তারা হোটেল প্রজেক্টটা আগামী দুইমাসের মধ্যেই শেষ করতে হবে। দম ফেলার ফুসরত নাই। তবে অফিসের পর এবং সাপ্তাহিক বন্ধে সময়টা বেশ ভালই কাটছে মোনায়েমের। সম্পূর্ন নিজের মত করে সময় কাটাতে পারছে। মাঝে মাঝে চলে যায় সীবিচে, সুমনার সাথে তুমুল প্রেমের সময়ে কাটানো সময়ের কথা মনে করে মন খারাপ হয়ে যায় তার। নিশ্চয়ই তার মতই খারাপ আছে সুমনা।

বিকেলবেলা সমুদ্র তীরে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর এগিয়ে যায় মোনায়েম। কেউ কেউ এসেছে কাপল হিসেবে, কেউবা ফ্যামিলি নিয়ে, তার মত সিঙেল কাউকে দেখতে পেলনা। ভূত দেখার মত কাউকে দেখে থমকে গেল মোনায়েম, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা। কিছুদূরেই সুমনা খুব রোমান্টিক ভঙ্গীতে এক মধ্যবয়সী লোকের সাথে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছে। সুমনা লোকটির কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আর লোকটি এক হাত দিয়ে সুমনার কোমড় জড়িয়ে আছে। লোকটা কিছু একটা বলছে আর সুমনা হাসতে হাসতে লোকটির উপর গড়িয়ে পড়ছে। যে কেউ দেখলেইই বুঝবে তারা খুব হ্যাপী কাপল। খালি পায়ে সমুদ্রের পানি স্পর্শ করছে দুজন। এই সুমনার সাথেই মোনায়েমের খুব ইচ্ছা ছিল সমুদ্র ¯œানের। রাত অব্দি তাদের ফলো করে মোনায়েম ফিরে গেল তার রুমে।

আগে অনেক রাত হলেও মোনায়েমকে দেখতে পেত নীলা। এখনতো তাও সম্ভব না। তার নীলপদ্ম পৃথিবীতে আসার মাত্র দশ দিন বাকি আছে। তার খুব ইচ্ছা হচ্ছে মোনায়েমকে খুব জোরে আঁকড়ে ধরার। চারদিকে সবকিছুই তার অসহ্য লাগছে, কোন কিছুতেই মন বসছেনা। মোনায়েমকে কবে দেখতে পাবে সে, কিছুই ভাল্লাগছেনা তার। ময়মনসিংহ থেকে বাবাও আসবে সাত দিন পর। ইশ মোনায়েম যদি হঠাৎ করে চলে আসত।
হোটেল রুমে ফিরে এসে ঘন্টা তিনেক একটানা সিগেরেট টানল মোনায়েম। এই সুমনার জন্যই এতগুলো দিন নিজের সাথে পরিবারের সাথে, নীলার মত স্ত্রীর সাথে অবিচার করেছে সে। তার অনাগত সন্তানের কথাও ভাবেনি সে। নিজেকে খুব ঘৃন্য আর ছোট মনে হচ্ছে। মোনায়েম বুঝতে পারে নীলা তাকে অনেক ভালোবাসে। না হলে কোন মেয়ে এত নিগ্রহ অবহেলা মুখ বুঝে সহ্য করে? নীলার কাছে মাফ চাইলে সে কি মাফ করবে? সুমনা তো ভাল আছে তার নতুন জীবন নিয়ে। তাহলে সে কেন নীলাকে নিয়ে তাদের সন্তানকে নিয়ে পারবেনা ভাল থাকতে। ভাবতে ভাবতে তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল, দেখল মায়ের ফোন, ওপাশ থেকে কান্না জড়িত কন্ঠ বাবা তুই জ্বলদি ঢাকায় আয়।

ছয় ॥
রাত বাজে বারটা, এত রাতে কোন ফ্লাইট নেই, নেক্সট ফ্লাইট সকাল ১১ টায়। ঢাকার সব নাইট কোচ কক্সবাজার ছেড়ে চলে গেছে। অফিসের ড্রাইভারও দিনের শেষে চলে গেছে উখিয়ায়, আসতে বলেও দুই ঘন্টার আগে আসতে পারবেনা । কিন্তু যে কোন মুল্যেই তাকে ঢাকা পৌঁছাতে হবে। নিজেই অফিসের গাড়ী ড্রাইভ করে রওয়ানা দিল ঢাকায়। কিছুক্ষণ পর পর চোখের পানিতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, ঠিকমত সামনেও তাকাতে পারছেনা। সে তার সব ভূলের প্রায়াশ্চিত্ত করতে চায়। নীলাকে সে বলবে তোমাকে আর কস্ট দিবনা, আমরা আবার নতুন করে সব শুরু করব।

শমরিতা হাসপাতালের আইসিইউতে এখনো জ্ঞান ফিরেনি নীলার। বাথরুমে পা পিছলে ফ্লোরে পড়ে গিয়ে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা লেগেছে পেটের উপর। প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে, এখনো ব্লিডিং পুরোপুরি থামেনি। অবস্থা খুব আশংকাজনক। নীলার শাশুরী, দেবর সোহেল, শশুর সবাই হাসপাতালে, খবর পেয়ে নীলার বাবাও ময়মনসিংহ থেকে রওনা দিয়েছে। সার্জন এসে জানালেন বাচ্চার মুভমেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে, পেটের বাচ্চাকে বাঁচাতে হলে জ্বলদি অপারেশন করতে হবে। মা,বাচ্চা দুজনের অবস্থাই আশংকাজনক। জরুরী ভিত্তিতে রক্তের ব্যাবস্থা করতে হবে। কাছের মানুষদের মধ্যে থেকে রক্ত দিতে পারলে ভাল। সোহেলের রক্তের গ্রুপ ম্যাচ করায় সে প্রস্তুতি নিল রক্ত দেয়ার। আরও কমপক্ষে চার পাঁচ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন।

পথ যেন ফুরোতেই চায়না মোনায়েমের, কিছুক্ষণ পর পর ঢাকায় ফোন দিচ্ছে নীলার অবস্থা জানার জন্য। যেকোন মুল্যে নীলাকে বাঁচাতে হবে। সে আর কিছু ভাবতে পারছেনা। পটিয়ার কাছাকছি এসে মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে যায় মোনায়েমের। পথ এত দীর্ঘ কেন। নীলার কাজল কালো চোখ আর মায়াভরা মুখটাই বারবার ভেসে উঠছে মোনায়েমের মানষপটে।

শমরিতা হাসপাতালে মোনায়েম পৌঁছায় সকাল দশটায়। মোনায়েমের মা এক নবজাতক মেয়ে শিশু এনে কোলে তুলে দেয় তার। নিষ্পাপ বাচ্চাটা তার হাত পা নাড়িয়ে মোনায়েমকে যেন কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। সবাই মাথা নিচু করে আছে, কারো মুখে কোন কথা নেই। সবার চোখে শুকনো অশ্রুর দাগ। নীলা কেমন আছে মা, মোনায়েমের আকুল জিজ্ঞাসা। মুখে আঁচল দিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে মা জানায় অনেক দেরী করে ফেলেছিস রে বাবা। নীলা নেই, আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে।

নীলার ডেড বডির মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে মোনায়েম পাথরের মত দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে । নীলার মায়াবী মুখটা খুব ফ্যাকাশে হয়ে আছে। দুচোখের পানি ধরে রাখতে পারলোনা মোনায়েম। হাউমাউ করে বাচ্চাদের মত কাঁদতে লাগল নীলাকে জড়িয়ে ধরে। এমন কেন হল তার সাথে। একটা শেষ সুযোগও দিলনা নীলা। সে জানলোও না রাজ্যের ভালোবাসা নিয়ে মোনায়েম ফিরে এসেছে তার কাছে। মোনায়েমও কি জানলো নীলার খুব পছন্দের নীল পদ্মের কথা। জীবনটা হয়ত এমনই। ভালোবাসা হয়ত সঠিক সময় সবাইকে ধরা দেয়না।

লেখকঃ
মোঃ সাইফুর রহমান
উপ-কমিশনার
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রাম।