মুনিয়া – মাহফুজুর রহমান

এক।

বালিশের নিচে সাড়ে ছ’ লাখ টাকা। হামিদুর চিৎ হয়ে শুয়ে টাকার ধাক্কায় যেন আকাশে উড়ে যাচ্ছে। বাঁ দিকে তাই কাত হয়ে শুতে হলো তাকে। আকাশে উড়ে যাওয়া তার কাজ না। মাত্র মিনিট খানেক। হামিদুরকে আবার অবস্থান বদলাতে হলো। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো সে। এবার যেন টাকার গন্ধ এসে নাকে লাগছে। মনোযোগ নিয়ে এলো নাকে। বালিশের ভেতর দিয়ে কি টাকার গন্ধ নাকে এসে লাগবে! হামিদুর আমোদ পেলো। টাকাগুলো নতুন ছিলো। কড়কড়া। গন্ধ একটা ছিলো বটে। উপুড় হয়ে শোওয়াই সুবিধেজনক। টাকাগুলো আছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। বালিশটা খুব উঁচু হয়ে গেছে বলেও মনে হয় না। উড়ে যাচ্ছে যাচ্ছে বলেও আর ভয়টা তেমন নেই।

হামিদুর। কলিগদের অধিকাংশ এ নামেই ডাকে। স্কুলে সবাই হামিদ নামে ডাকতো তাকে। কলেজেও প্রায় তাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সে হামিদুর হয়ে গেলো। এপ্লাইড ম্যাথস পড়াতে আসা এক প্রফেসর তাঁর নাম শোনা মাত্রই বললেন, হামিদ নামে তো একজনকে এরই মধ্যে ডাকলাম। এক নামে দু’জন থাকা যাবে না। তুমি বাবা হামিদুর হয়ে থাকো। সেই থেকে হামিদ হয়ে গেলো হামিদুর। এবং এরপর হামিদুর হয়েই থাকা শুরু করলো। ইন্টারভিউ বোর্ডে মিউনিসিপ্যালিটির এক বড় কর্মকর্তা নাম জিজ্ঞেস করা মাত্র সে বললো হামিদুর। কিন্তু তার এই নাম পছন্দ করে নি তার বাবা। একবার বাসায় ফোন করে কেউ হামিদুরের খোঁজ করায় তিনি খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, হামিদুর কিরে? আরবি শব্দ, আরবির মতোই হতে হবে। হামিদুর বলে কিছু নাই, বললে বলতে হবে হামিদুর রহমান। পুরো নাম। হামিদুর এইসব ভাষার মারপ্যাঁচ জ্ঞান করে নি। তার কাছে পুরো বা অর্ধেক এসবের ফারাক বোধ নেই। আর এখন তো আরও নেই। কন্ট্রাক্টার এসে তাকে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বললো না স্যার বললো তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই, মাথাব্যথা হয় কড়ায় গন্ডায় শতকরা হার না মিললে।

 

চাকরির শুরুতে ভেবেছিলো একটা স্টাইল রপ্ত করবে। মিঃ টেন পার্সেন্ট টাইপ। মিউনিসিপ্যালিটির কত শত প্রকল্প। টেন পার্সেন্ট পকেটে ঢুকলেই যথেষ্ট। বারংবার কন্ট্রাক্টারদের সঙ্গে দড়ি টানাটানি করতে হয় না। মাছের বাজারের মতো দরাদরি। হামিদুর টেন পার্সেন্ট। টেন পার্সেন্ট হামিদুর। এমন একটা বিহিতেই সে খুশি ছিলো। কিন্তু বাধ সাধার লোকের কোন কমতি নেই। অডিটের এক লোক এসে বললো, হামিদুর সাহেব, আমার এক পার্সেন্ট কিন্তু আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে। উড়ে বসা সচিব দাবি করে বসলো তার ভাগ। যেন সে ট্রাক ড্রাইভার। প্রতি মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশকে বখড়া যুগিয়ে চলবে।

 

হামিদুর একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিলো। টাকার গন্ধটা পাওয়াই জরুরি। সাড়ে ছ’ লাখ। এই টাকায় কারো ভাগ নেই। বালিশটা অসমান লাগছে। হামিদুর তার মাথা একটু নড়াচড়া করে নিলো। টাকা মনে হয় কথাও বলছে। হামিদুরের ঠোঁটে এক টুকরা হাসি চলে এলো। চোখের মধ্যেও তৃপ্তির ঝিলিক। আগামিকালই মুনিয়ার সঙ্গে দেখা করবে। এর আগে ব্যাংকে গিয়ে ছোট ছোট নোট যোগাড় করবে। হাজার দশেক হলেই মুনিয়ার চোখ গাড়ির হেড লাইটের মতো হয়ে যাবে। সপ্তাহান্তে বাড়ি গিয়ে ঢালবে পুরো দু’ লাখ। বাবার চিকিৎসা হোক। ছানিটাও কাটুক। হামিদ আর হামিদুরের ফারাক নিয়ে বুড়ো বাবা আরও কিছুদিন তাকে সবক দিক। হাটে গিয়ে আস্ত একটা কলার কাদি কিনবে। সাড়ে ছ’ লাখ অনেক টাকা। গ্রামের মসজিদও কিছু পেতে পারে।

 

হামিদুর আবারও চিৎ হলো। নাহ। বালিশের নিচটা সুবিধেজনক জায়গা না। একটা বরং স্টিলের ভল্ট কিনবে। সাড়ে ছ’ লাখ তো আসতেই থাকবে। স্টিলের ভল্ট খুলেই সে মুনিয়ার দিকে টাকার বান্ডেল ছুঁড়ে দেবে। যেন কবুতরকে দানা ছিটাচ্ছে। বাজারে অনেক ভল্ট এসেছে। হামিদুর একটা ডিজিটাল ভল্ট খুলবে। চাবি নিয়ে হাঁটাচলা তার জন্য আরামদায়ক না।

 

সিলিংটা যেন মানচিত্রের মতো। ঘরের বাতি নেভানো। কিন্তু তারপরও সিলিংয়ে মানচিত্রের মতো দাগ। সড়ক পথ। রেল পথ। দু’ দেশের বিভাজন রেখা। কোথাও পাহাড় বা সমুদ্র। এবড়ো থেবড়ো। হামিদুরের ঘুম আসে না। মুনিয়াকে বলবে কপালে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে। আগামিকালই যেতে হবে মুনিয়ার কাছে। মেয়েটা নাচে ভালো। কিন্তু নাচার সময় হিন্দি গান ছেড়ে দেয়। হিন্দি গানের সঙ্গে সঙ্গে মুনিয়ার শরির নড়তে থাকে। নিজেকে সে হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের মতোই মনে করে। নেহাত এই জল জংলার দেশে জন্ম। হামিদুরের হিন্দি গান ভালো লাগে না। কিন্তু আগামিকাল সব মাফ। আগামিকাল মুনিয়া তার ইচ্ছেমতোই নাচুক।

 

হামিদুরের চোখ একটু বন্ধ হয়েছিলো। হঠাৎ কোথাও ট্রাকের হর্ন শুনতে পেয়ে হামিদুরের তন্দ্রা কেটে গেছে। হামিদুর একটু অবাক হলো। ট্রাক আসবে কোত্থেকে। মিউনিসিপ্যালিটির রেস্ট হাউজ নদীর ধারে। আশে পাশে ট্রাক বা কোন গাড়ি চলাফেরার সুযোগ কই! হামিদুর ভয় পায়। অন্য কোন কিছুর শব্দ হয়তো। একটু কাত হয় সে। একটা হাত বালিশের পাশে নিয়ে হাতাতে থাকে। আগামিকাল টাকাগুলো কোথাও সরাতে হবে। তোষকের নিচেও রাখা যায়। হঠাৎ হামিদুর উঠে বসলো বিছানায়। চট করে ফ্লোরে নেমে ঘরের লাইট জ্বালালো। বালিশ সরিয়ে টাকাগুলো দেখলো। একশো পাওয়ারের বাল্ব। টাকাগুলো চকচক করছে। হামিদুর এক তোড়া টাকা হাতে নিলো। পঞ্চাশ টাকার নোট। এক তোড়ায় পঞ্চাশ হাজার হবে। এরকম আরও ছ’টি তোড়া। হামিদুর সবগুলো তোড়াতেই হাত লাগায়। ঘুমানোর দরকার নেই। হামিদুর তাকিয়ে থাকে বালিশের নিচে রাখা সপ্তর্ষিমন্ডলের সাতটি তারার দিকে।

 

দুই।

কোলবালিশের ভেতর সাড়ে ছ’ লাখ টাকা। কন্ট্রাক্টার ব্যাটা একটা আস্ত ছোটলোক। কোথা থেকে যেন ভুষাওয়ালা ময়লা টাকা যোগাড় করে এনেছে। টাকার রঙ গন্ধ নিয়ে হামিদুরের কোন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এখন কোলবালিশের ভেতর টাকা রাখতে গিয়ে তার কেমন যেন বমি বমি লাগছে। দুনিয়ায় কি আর ফর্শা টাকা ছিলো না। এমন ল্যাতপ্যাতে টাকা এই কন্ট্রাক্টার কই পায়! হামিদুর এক মুহূর্ত ভাবলো। মিউনিসিপ্যালিটিতে তার বিশ বছর চাকরি হয়ে গেছে। এখন জুনিয়র অফিসার, ইঞ্জিনিয়ার সবাই তাকে তোয়াজ করে চলে। করিডোরে দেখা হলে সালাম দিয়ে কেউ কেউ এক কোনে সেঁটে থাকে। কোন প্রকল্প নিজে না দেখলেও তার একটা ভাগ তার একাউন্টে ঠিকই জমা হয়। অথচ এই কন্ট্রাক্টার তাকে বাজারের সবচে নোংরা টাকাগুলো গছিয়ে গেলো! টাকার রঙ গন্ধ না থাকুক, হামিদুর আর পচা টাকা নেবে না। মোবাইল ফোনটা হাতে নিলো। এখনই কি কন্ট্রাক্টারকে বলে দিবে?

 

হামিদুর কোলবালিশটাকে দূরে ঠেলে দিলো। বিশ বছরের চাকরি তার। বিয়ের আট বছরের মাথায় বউ ভেগে গেছে। হামিদুরের গায়ে লাগে নি। মিউনিসিপ্যালিটিতে অনেক মেয়েছেলে আসে। কেউ কেউ এসে আধা রাত কাটিয়ে যায়। ধন্য হয় যেন। এবারে নিয়ত করেছিলো কোলবালিশের পুরোটাই কাউকে দিয়ে দেবে। যে কেউ। যে প্রথম আসবে হয়তো সেই পেতো। কিন্তু টাকাগুলো এমন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, হামিদুরের ইচ্ছে করছে টয়লেটে গিয়ে ফ্ল্যাশ করে দিতে। কিংবা আরও ভালো হতো যদি স্রেফ ড্রেইনে ফেলে দিতে পারতো। টাকা পয়সা ড্রেইনেরই জিনিষ। সংসার করা হয়নি তার। অথচ প্রতি মাসে এখনো তার স্ত্রীকে টাকা পাঠাতে হয়। ড্রেইনেই তো ঢালছে সে সব টাকা। হামিদুরের সত্যি সত্যি বমি আসছে।

 

ঘরে আলো নেই। আলিশান রেস্ট হাউজ। বাবুর্চি যখন ডিনারের জন্য বলতে এসেছিলো তখন তাকে দিয়ে সে বাতি নিভিয়ে নিয়েছে। হামিদুরের একটা বৈশিষ্ট্য আছে। যে প্রকল্প বা যে কন্ট্রাক্টারই হোক, তার ভাগটুকু তার প্রথম দিনই চাই। আর সেদিন ঘরের বাতি থাকে নেভানো। উপরি টাকা যেন নিভৃতে থাকে। হামিদুর দেখলো অন্ধকার ঘরেও সব আসবাব পত্র দেখা যাচ্ছে। যেন অন্ধকারেরও আলো আছে। কোলবালিশের দিকে তাকালো সে। বিশ বছরে একটা অভ্যেস হয়ে গেছে হামিদুরের। কোলবালিশের ভেতর টাকা রাখা। পাশের ঘরে একটা স্টিলের আলমারি আছে। বিয়ের সময় কেনা। কিছুদিন সেখানে টাকা রেখেছিলো বটে। কিন্তু বউ ভেগে যাওয়ার পর থেকে আবার বালিশ আর কোলবালিশ করতে করতে তা শেষ পর্যন্ত কোলবালিশে স্থিত হয়েছে। এমনও সময় গেছে, ব্যাংক একাউন্ট থেকেও বেশি টাকা হামিদুরের কোলবালিশে ছিলো।

 

হামিদুর কোলবালিশের দিকে তাকালো। ফুলে একটা ভালুক হয়ে গেছে কোলবালিশটা। অবিকল ভালুকের মতো যেন চোখও আছে দুটো। হামিদুর ভয় পেলো। বিশ বছরে এই ভয়টা তার আসে নি। এখন কোলবালিশটাকে দেখে তার ভয় হচ্ছে। ভালুকের মতো ভয়ংকর এক কোলবালিশ। ছোট বেলায় খেলা দেখাতে আসা এক ভালুক ভিড়ের মধ্যে আচমকা হামলে পড়ে এক লোকের নাক খেয়ে নিয়েছিলো। হামিদুর তার নাকে হাত দিলো। কোলবালিশটা কেন হঠাৎ ভালুক হয়ে গেলো। শাদা। ভয়ংকর। হামিদুর স্পষ্ট ভালুকের লেজ দেখতে পেলো। বিছানায় কিভাবে ভালুক আসবে। ভালুক কি কোলবালিশটা খেয়ে নিয়েছে?

 

হামিদুরের মাথা ঝিম ঝিম করছে। তার মাথার নিচে কোন বালিশ নেই। পুরো ঘরটাই কেমন রহস্যময় হয়ে যাচ্ছে। একটু আগে দেখা আসবাব পত্রের কিছুই এখন আর সে দেখছে না। বরং ভালুকটাকে এখন তার আয়তনে দ্বিগুন মনে হচ্ছে। বিশ বছর আগে মুনিয়া নামের এক মেয়েকে সে এক রাতের সংগ পেতে এক লাখ টাকা দিয়েছিলো। মুনিয়া সেই উপহারকে ভালোবাসা ভেবে ভুল করেছিলো। এরপর একদিন মুনিয়া আত্মহত্যা করে। পুলিশ এসে ময়না তদন্তের নামে তার শরির ফ্ল্যাটের সিড়িতে ফেলে রাখে। শাদা চাদরে ঢাকা সেই শরির ফুলে এমন ভালুকের মতোই হয়েছিলো। তবে কি মুনিয়া ফিরে এসেছে? হামিদুর বিছানা ধরতে চায় কিন্তু দু হাত ক্রমাগত নেড়েও সে বিছানা খুঁজে পায় না। হামিদুর প্রচন্ড ভয় পায়। বিছানা কোথায় গেলো। সে কি তবে বিছানায় নেই। কোথায় সে? সি কে শূন্যে ভাসছে? না কি সে পানিতে? ভালুকের চোখ দু’টো স্টিমারের সার্চ লাইটের মতো লাগছে।

 

তিন।

হামিদুরকে কেউ বেঁধে রেখেছে বিছানার সঙ্গে। সে কোনভাবেই উঠতে পারছে না। নড়তেও পারছে না। চোখেও খুব বেশি কিছু সে দেখছে না কারন চোখের সামনে যেন আড়াই হাজার ওয়াটের লাইট। হামিদুর প্রায় অক্ষম ভাবে শুয়ে আছে। কিভাবে তাকে বাঁধা হয়েছে তাও সে বুঝতে পারছে না। হাত বা পায়ে দড়ি বা অন্য কোন কিছু সে অনুভব করতে পারছে না। আবার উঠে দাঁড়াতেও পারছে না। হামিদুর কি করবে তাও বুঝতে পারছে না। আশে পাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে। পোকার ডাক সম্পর্কে হামিদুর নিশ্চিত হতে চাইলো। পোকামাকড় থাকা মানে সে এই ধরাতেই আছে।

 

কিন্তু চোখের সামনের আলো এবার রূপ বদলাচ্ছে। রঙ ধনুর মতো রঙের পরিবর্তন হচ্ছে। হামিদুর তার চোখ দুটো সতর্ক করে রেখেছে। ধীরে ধীরে সে একটা মানুষের অবয়ব অনুভব করতে পারছে। আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। হামিদুর চাইছে কেউ আসুক। তাকে বাঁচাক। সে তার বাবার চিকিৎসা করেছিলো। প্রথমে চোখের ছানি অপারেশন। তারপর ডান হাঁটুর অস্ত্রোপচার। শেষ বয়সে প্রায় তিন মাস এক নাগাড়ে কিডনি ডায়ালাইসিস। হামিদুরের মা অবশ্য হঠাৎ করে মারা যায়। সম্ভবত স্বামীবিয়োগ শোকে। ছোট দু’টো বোনের বিয়েতে হামিদুর খরচ করেছে দেদার। দু’ জামাইকেই মোটর সাইকেল কিনে দিয়েছে সে। এক বোনের জামাই অবশ্য মিউনিসিপ্যালিটির সাপ্লায়ার হতে চেয়েছিলো। হামিদুর চায়নি। সেই জামাইটা তাকে বরাবরই হিংসের চোখে দেখে। হামিদুর ভালোভাবে ক্রমশ স্পষ্ট হওয়া মানুষের অবয়বে তার চোখ দু’টো স্থির করলো। এই অবয়ব সেই জামাইয়ের হতে পারে না। কেমন যেন এক নারী অবয়ব মনে হচ্ছে। কে হতে পারে? কে তাকে এভাবে বেঁধে ফেলেছে? তার স্ত্রী? তার স্ত্রী বিয়ের পরও তার প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলতো। হামিদুর গা করে নি। সে নিজেও মিউনিসিপ্যালিটিতে ঘুরঘুর করা মেয়েছেলেদের দিকে নজর ঘুরাতো। এক ড্রেইনে টাকা না ঢেলে সে তা ভাগ করে দিয়েছে ক্ষনিকের সঙ্গীদের মধ্যে।

 

শহরের অভিজাত এলাকায় তিনটি ফ্ল্যাটের তিনটিই স্ত্রীর কব্জায়। ভাড়া বাবদ যা আসে তা দিয়ে তার স্ত্রী বিলাসী জীবন কাটাতে পারে। হামিদুর এসবের ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করে নি। চাকরির কল্যানে তার কোলবালিশ বরাবরই স্ফীত থেকেছে। একটা দু’টো ফ্ল্যাটবাড়ি তাই তার হিশেবে আসেনি। কিন্তু তার স্ত্রী ঠিক খো্লা চুলে কখনো থাকে নি। সব সময় স্কার্ফ দিয়ে চুল ঢেকে রেখেছে। হামিদুরের সামনে যে নারী অবয়ব তার চুল খোলা। কে হতে পারে এই নারী? মুনিয়া নয় তো? মুনিয়ার চুল এমন খোলা ছিলো। হাওয়ায় উড়তো। নাচের সময় সে বারবার এক হাতে চুলের পরিচর্যা করতো। মুনিয়ার প্রতি কি সে অন্যায় করেছে? আজ কি মুনিয়ার প্রেতাত্মা এসেছে? হামিদুর বহুদিন ভেবেছে মেয়েটা কেন আত্মহত্যা করলো। আত্মহত্যা কেউ করলে না কি সে প্রেতাত্মা হয়ে যায়। আহা। আজ বেঁচে থাকলে মুনিয়াও কয়েকটা ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে যেতে পারতো। হামিদুর কখনোই মুনিয়াকে টাকা দিতে কার্পন্য করে নি। আজ মুনিয়া থাকলে হামিদুর না হয় তার কাছে ক্ষমাই চাইতো।

 

নারী অবয়ব এখন আরও স্পষ্ট। হামিদুর মুনিয়া বলে চিৎকার দিচ্ছে কিন্তু তার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। সে ডানে নড়তে পারছে না। বাঁয়েও নড়তে পারছে না। হামিদুর জানে মুনিয়া কোনদিন তার ক্ষতি করতে পারবে না। সে আবারও অধীর হয়ে মুনিয়াকে ডাকতে চায়। এবারে নারী অবয়ব আরও স্পষ্ট। অবিকল মুনিয়া যেন। হামিদুর কম বেশি নিশ্চিতই হয়। সে প্রায়শ্চিত্ত করতে প্রস্তুত। মুনিয়া যা বলবে সে তাই করবে। তার তো বিবাহিত জীবন বলতে আর কিছু নেই। মুনিয়াকেই সে ঘরে তুলতে পারে। মুনিয়াকে সে আবারও ডাকতে চায়। অবিকল সেই মুখাবয়ব। পারস্যের আপেল। পুষ্ট গ্রীবা। হামিদুর খেলাচ্ছলে একবার তাকে রুটি বানানোর বেলন বলেছিলো। মুনিয়া আহত হয়েছিলো। পরিপাটি করা চুল যেন সারি সারি জলপাই গাছ। মুনিয়া প্রকৃতই সুন্দর। হামিদুর কেবল তার চোখ জোড়া দেখতে পাচ্ছে না। চোখে আলো নেই। কিংবা কালো চশমা পড়ে আছে। মুনিয়া কখনো চশমা বা সানগ্লাস পড়ে নি। আজ তাহলে মুনিয়া ভিন্ন রূপে এসেছে। হামিদুর অভিভূত হলো।

 

নারী অবয়বটা আরও স্পষ্ট হলো। হামিদুর দেখলো মুনিয়া সদৃশ সেই নারী অবয়বের মধ্যে গ্রিক টাইটানেস থেমিসের প্রতিচ্ছবি।

//ওয়ারশ, পোল্যান্ড