ঈর্ষা // তপন দেবনাথ
May 2, 2018
অরণ্যযজ্ঞ // মুহাম্মাদ তালুত
May 2, 2018

মহাপুরুষ // বাদল সৈয়দ

“বুয়েন্স আয়ারস থেকে বিদায়ের সময় আর্জেন্টাইন ফার্স্ট লেডি তার উদ্দেশ্যে পার্টি দিয়েছিলেন। এটা কিন্তু সাধারণ প্রটোকলে পড়ে না। এম্বাসেডরদের ফার্স্টলেডিরা কখনোই আনুষ্ঠানিক বিদায় জানান না। কিন্তু তাকে দেয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, তিনি তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমরা আজ শুধু একজন রাষ্ট্রদুতকে বিদায় জানাচ্ছি না, আমাদের শহর থেকে দুনিয়ার সবচে স্মার্ট ভদ্রলোককেও বিদায় জানাচ্ছি।”
বলতে বলতে আমার সামনে বসা ভদ্র মহিলা হাসলেন, সে হাসিতে রাজকীয় ভাব ফুটে উঠে। বুঝতে বাকী থাকে না, কেন থাকে সত্তুর দশকে তাঁকে এ অঞ্চলের ‘গ্রেস কেলি’ বলা হতো।
” হা, জানি, এমনকি তিনি তো একবার মাদ্রিদে ‘ফরমুলা ওয়ান’ রেসে ও অংশ নিয়েছিলেন তাই না?”
“সেটা নিয়ে কত কান্ড!!!” তিনি আমার কথা কেড়ে নেন। “এখানকার ফরেন অফিস তো পারমিশন দেবেই না। ডিপ্লোম্যাট কেন রেসে গাড়ি চালাবে?
শেষ পর্যন্ত তার স্পন্সর ‘ওডি মোটরস’ অনুরোধ জানানোর পর তৎকালীন মিনিস্টার সাহেবের উৎসাহে তাঁর অংশ নেয়া সম্ভব হয়। যদি ও রেসে তেমন ভাল করেনি, কিন্তু এর আগে কোন ডিপ্লোম্যাট গাড়ির রেসে নামেননি।”
একটানা কথা বলে তিনি হাঁপাতে থাকেন, তারপর দম নিয়ে বলেন, হি ওয়াজ আ হিরো, ইন রিয়েল সেন্স।”
আমি জানালা দিয়ে বাইরে থাকাই। হাল্কা হলুদ গার্ডেন লাইটে মনোরম পরিবেশ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা রঙের ফুল গাছগুলোকে কেমন অপার্থিব মনে হয়। আজ হচ্ছে বিভ্রান্ত জোসনার রাত। পাখিরা ভোর হয়ে গেছে ভেবে বেড়িয়ে এসেছে ঘুম ভেংগে। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ডাকছে। চারিদিকে তাঁদের কিচিরমিচির শব্দ। অনেক দুর থেকে ভেসে এলো পরিচিত ট্রেনের ঝুমঝুম শব্দ, তারপর টানা হুইসেল। ।
আমি ভদ্রমহিলার দিকে তাকালাম। দেখা পেতে সকাল থেকেই অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রচুর ব্যস্ততা তাঁর।
আশ্রমে অনেক কাজ, সব কিছু নিজেই দেখেন। বাচ্চাদের ক্লাশ নেন, দুরদুরান্ত থেকে আসা মানুষদের সময় দেন। এছাড়া আরো অনেক কাজ। দেশ-বিদেশের নামকরা নামকরা লোকজনও আসেন। কেন জানি তাঁরা মনে করেন, এ জায়গাটায় আসলে তাঁদের সমস্যার সমাধা হয়ে যাবে। আসলে কি হয়। আমার বিশ্বাস হয় না।
সব কাজ সেরে রাতের খাবার আশ্রমের বাচ্চাদের সাথে খেয়ে তারপর কিছুটা নিজের জন্য সময় পান। সে সময়টাই আমার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। তাই বেশ রাত নেমেছে। পুরো গ্রাম চুপচাপ। শুধু জোস্নায় বিভ্রান্ত পাখিগুলোর ডাক এ নির্জনতা ভেংগে দিচ্ছে।
তিনি চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, তা হঠাৎ আপনার তাঁকে নিয়ে আগ্রহ হলো কেন? তাঁকে নিয়ে তো তেমন আলোচনা হয় না, ভক্তরা ছাড়া কেউ তেমন তাঁর সম্পর্কে জানেনও না। অবশ্য তিনি নিজেই চাইতেন না আলোচনায় থাকতে।
চায়ের কাপ ঠোঁটে তুলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। সুগন্ধি চা। ইদানিং বেশ জনপ্রিয়াত পেয়েছে। ফল বা ফুলের নির্যাস মিশিয়ে তৈরি। তাই এর নাম দেয়া হয়েছে, ফ্রুটি। আমার ভাল লাগেনা। চায়ের সুগন্ধ যখন স্ট্রবেরি কিংবা গোলাপের ফ্লেভার দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় তখন আসলে মূল স্বাদটাই নষ্ট হয়ে যায় বলে আমার ধারণা। চায়ের নিজের গন্ধই সেরা, সেজন্যই তো এলিজাবেথ আরডেন্ট শুধু চা এর ফ্লেভারে তাদের সবচে দামী পারফিউম বাজারে ছেড়েছে। তারপর ও হালকা চুমুক দিয়ে বললাম, “আসলে তাকে যতোটা অনালোচিত ভাবছেন তিনি তা নন। অনেকের কৌতুহল আছে। নয়তো দেশ বিদেশ থেকে এত লোক আসতেন না।
তাঁর ঠোঁটে হালকা হাসি, চিবুকে মোহিনী টোল, বললেন, তা ঠিক, কয়েকদিন আগে ‘লন্ডন মেইল’ ভেতরের পাতায় লিখেছিল, মিস্ট্রি স্টিল এলাইভ”—- হা, হা, ওরা অনেক বাড়িয়ে লিখেছে। দেয়ার ইজ নো মিস্ট্রি, জাস্ট পিপল প্রিজিউম। মানুষ রহস্য তৈরি করতে পছন্দ করে।
আমি হাসতে হাসতে বলি, আমারও তাঁর ব্যাপারে কৌতুহল আছে। আসলেই তাঁর টার্নিংটা খুব ইন্টেরেস্টিং, তাই না?”
তিনি আবার হাসলেন, রাজকীয় হাসি। বললেন, হা, তাঁর পুরো জীবনটাই ইন্টেরেস্টিং। সারাজীবন পড়াশুনাকে নাকে দড়ি লাগিয়ে ইচ্ছেমত ঘুড়িয়েছেন, কখনো দ্বিতীয় হন নি, সাঁতারে ছিলেন অল পাকিস্তান চ্যাপ, বিতর্ক রাজা হিসেবে সবাই তার আধিপত্য বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছিলেন——
আমি তার কথা কেড়ে নেই, “সম্ভবত হার্ভাডে কিছুদিন শিক্ষক ছিলেন, তারপর কি মনে করে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে জয়েন করেন, তাই না?”
তিনি মাথা দোলান, উপর থেকে নীচে, হা, মাত্র আটাশ বছর বয়সে হার্ভাডের ফুল প্রফেসর হয়েছে। তিনি ছাড়া এ রেকর্ড একমাত্র আছে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সুব্রানিয়াম স্বামির। তবে তাঁর বাবা চাইচিলেন, তিনি যেন সরকারি চাকুরি করেন। কিজে ছোটখাট সরকারি চাকুরি কারার কারণে হয়তো অতৃপ্তি ছিল, ছেলেকে দিয়ে সেটা পূরণ করার চেষ্টা করেছিলেন হয়তো।
আচ্ছা আপনার সাথে তাঁর পরিচয়——
সামনে বসা ‘গ্রেস কেলি’ চোখে চমকে উঠে স্মৃতি, যে কোমল স্মৃতি পরিবেশ আদ্র করে তুলে।
“লন্ডনের ট্রাফালগার স্টেশনে। আমি তখন লন্ডন স্কুল অফ ইকোনোমিকসে পড়ি। সে স্টেশনে নেমে হেঁটে নিজের এপার্টমেন্টে যাচ্ছিলাম, এসময় স্কিন হেডদের খপ্পড়ে পড়ি। ন্যাড়া মাথার এ গুন্ডাদের কাজ ছিল অশেতাংগ বিশেষ করে এ উপমহাদেশের মানুষজনকে অত্যাচার করা। এদের হাতে দু একজন মারাও গেছেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার নির্জনে কোন বাদামী মেয়েকে পেলে তো কথায় নেই। আমাকে যখন ওরা ঘিরে ফেলেছে তখন জনশূন্য রাস্তায় যে দু’একজন লোক ছিল তারা দ্রুত মাথা নিচু করে কিছুই দেখেনি ভাব নিয়ে সরে পড়ে। আর লোকগুলো আমাকে ঘিরে ধরে বিয়ারের ক্যান থেকে তরল পদার্থ ছুড়ে মারছিল। একদিকে থেকে বাঁচতে চাইলে, অন্যদিক থেকে বিয়ারের জল ছুটে এসে আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। এক সময় একজন আমাকে চেপে ধরে, অন্য একজন আমার ঠোঁট ফাক করে কড়া রাস্তায় বানানো মদ মুখে ঢেলে দিল। বলতে বলতে তার চোখগুলো চকচক করতে থাকে, হয়তো পরদিন দ্রুত বেড়ে উঠা বিলেতের কোন নির্মীয়মাণ বাড়ির বেইজমেন্টে শ্রমিকরা আমার লাশ আবিষ্কার করতো, যদি না কাকতালীয়ভাবে তিনি এসে হাজির না হতেন।
তিনি কিভাবে সেখানে এলেন???
এবার তার চেহারায় মুগ্ধতা খেলা করে, তিনি তা ছড়িয়ে দিয়ে বলেন, সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হয়তো এই ট্রেনে আমরা ট্রাফালগার এসেছিলাম। আমি খেয়াল করিনি।
তারপর??? আমার রুদ্ধশ্বাস প্রশ্ন।
তাঁর চোখে খেলা করছে স্মৃতিকাতরতা, তিনি একটি গাছের ডাল ভেংগে নিয়ে সেটাকে কারাতে স্টিক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তার কিন্তু শাওলিন ট্যাম্পলের ডিগ্রি ছিল।রীতিমতো হাতে কলমে ডিগ্রি।”
তার মুগ্ধতা আমাকে ও ছুঁয়ে যায়,” তারপর”।
স্মৃতির ছোট ছোট লাফ তার চেহারায় তিরতির করে কাঁপতে থাকে, “দেখা হওয়ার মাত্র সতেরদিনের মাথায় আমরা বিয়ে করি। সবাই ব্যাপারটাতে খুব অবাক হয়েছিল, বাবাতো রাগ করে কথাই বন্ধ করে দিয়েছিল্ েআর হতভম্ব মা শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোন ভুল হচ্ছে নাতো? আমি উত্তর দিয়েছিলাম, হয়তো হচ্ছে, তবে মা তুমি নিশ্চিত থাকো, এত মধুর ভুল করার সৌভাগ্য আমাদের এ গ্রহের আর কোন মেয়ের কখনো হয়নি, হবে ও না।”
বলতে বলতে তার চেহারায় আলোর ছটা ফুটে উঠে।
“জানেন, আমাদের বিয়ে হয়েছিল তাঁর জীবনের সেরা সময় কাটানো ক্যাম্ব্রিজের সেইন্ট জোন্স কলেজের লাইব্রেরিতে। ওখানকার অধ্যক্ষের প্রিয় ছাত্র ছিলেন তিনি। এখানে কিন্তু ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লসের বিয়ে ও হয়েছিল, এন্ড উই ওয়্যার প্রমিজড টূ ইচ আদার আন্ডার দা ম্যাগনিফিসিয়েন্ট পিকচার অফ দ্যাট ইভেন্ট।”
তার কথা বলার ভংগিতে মদিরতা আমাকে পুরো গিলে ফেলেছে, আমি ঠান্ডা চায়ের কাপ নামিয়ে বলি, তখনতো তার লন্ডনে পোস্টিং ছিল তাই না?
মাউন্ট ব্যাটেনের সাথে তার বিখ্যাত কথা কাটাকাটি তখন হয়েছিল?”
মনে হলো, তিনি একটু বিরক্ত হয়েছেন, ব্যাপারটা এতো সরল কথা কাটাকাটি ছিল না, তিনি ভারতের শেষ ভাইসরয়কে বলেছিলেন, আপনারা ভারত-পাকিস্তানের নাগরিকদের বৃটেন ভ্রমনে ভিসা চালু করেছেন, তাদের আসতে দিচ্ছেন না, অথচ আপনারা আমাদের দেশে ভিসা ছাড়াই কিন্তু দু’শ বছর ছিলেন। তখন বৃটেন উপমহাদেশের লোকদের জন্য সদ্য ভিসা ব্যবস্থা চালু করেছে। মাউন্ট ব্যাটেন কিন্তু রিয়্যাক্ট করেন নি, বরং টোস্ট করার সময় বলেছিলেন, আমার হট হেডেড বাংগালী বন্ধুর সম্মানে—-
কিন্তু পরদিন লন্ডন মেইল নিউজ করলো, বেংগলি ডিপ্লোম্যাট রেইজড ফিংগার টু দা ভাইসরয়। অথচ সেটা কিন্তু কোন ফর্মাল অনুষ্ঠান ও ছিলনা। লর্ড মাঝে মাঝেই উপমহাদেশের লোকজনকে ডাকতেন, গল্প করার জন্য। বিশেষ করে তাঁর সাথে মাউন্টবেটেনের সাথে ছিল খুব শ্রদ্ধার সম্পর্ক। তবে এটা ঠিক, লর্ডের মুখের উপর একথা বলতে বিশাল কলিজা লাগে। সেটা তার ছিল।”
এরপর?
“লর্ডের সাথে তার এ কথা নিয়ে নিউজ হওয়ার পর বৃটেন ফরেন অফিস ব্যাপারটা ভালভাবে নিলো না, তাই তাকে প্রত্যাহার করে চিলিতে পোষ্টিং দেয়া হয়।“ তার কন্ঠে একটু রাগ ফুটে উঠে।
সেখানেই কি সালভাদর আলেন্দের মেয়ে পলা আলেন্দের সাথে তার পরিচয় হয়?
“ভুল বললেন, এ ল্যাটিন আমেরিকান লেখিকা চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের মেয়ে ছিলেন না, তিনি ছিলেন তার কাজিনের মেয়ে। কিন্তু মেয়েটির সাথে তাঁর ঘনিষ্টতার কারণে অনেকেই তাকে চিলিয়ান নেতার মেয়ে ভাবে। “বলতে বলতে তাঁর বিরক্তি গোপন থাকে না “আমি ভেবেছিলাম আপনি হোম ওয়ার্ক করে এসেছেন, ব্যাপারটি জানবেন।’’
আমার খুব লজ্জা হয়, কিন্তু কিছু বলি না, কেবল হাসি। ক্ষমা প্রার্থনার হাসি।
‘হা, পলা আলেন্দের সাথে তার বন্ধুত্ব সেখানেই হয়, তবে আলেন্দে নিহত হওয়ার পর পলা আমেরিকায় চলে গেলে বন্ধুত্বটা গভীর হয়, ততদিনে তিনি ও ওয়াশিংটনে বদলি হয়ে গেছেন।”
‘জানি, পলা তার জীবনীতে আপনাদের কথা বলে গেছেন। বিশেষ করে তার কঠিন সময়ে আপনারা দুজন ছিলেন তার বিরাট ভরসা।”
তিনি মৃদু হাসলেন, ও মনে হয় একটু বাড়িয়ে বলেছে। যতটুকু করার দরকার ছিল ততটুকু করতে পারিনি, আমার তখন দুটো স্কুল পড়ুয়া বাচ্চা, নিজে একটা কলেজে পড়াই, সব মিলিয়ে আমাদের ও কঠিন সময় ছিল।”
হা, কিন্তু এতটুকুই বা ক’জন করে?
ডান হাত নাড়িয়ে তিনি আমাকে ডিসমিস করে দিলেন, “করে, বন্ধুর জন্য করতে হয়।” তারপর তার চোখে বিষাদ ঝিলমিল করে উঠে, সেটি শুধু কঠিন নয় অবিশ্বাস্য সময় ছিল। পলার মেয়েটিকে নিয়ে তাঁর হ্যাজবেন্ড স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। গাড়িটি লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে আছড়ে পড়ে, সাথে সাথে মারা যায় পলার স্বামী, মেয়েটিকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।সে তখন ছিল জর্জ ওয়াশিন্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে। দশদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ডাক্তাররা ঘোষনা করেন, কোন লাভ নেই, লাইফ সাপোর্ট খুলে নিয়ে মেয়েটিকে শান্ততিেেত মরতে দেয়া উচিত।”
“কিন্তু পলা রাজি হন নি, তাই না?” আমি কিছুটা ঝুঁকে আসি।
“হা, সে ঘোষনা করে, হাসপাতাল না রাখলে সে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যাবে, কিন্তু সাপোর্ট খুলতে দেবে না।”
তারপর?
তিনি আবার হাসলেন, হাসি এমন বিষন্ন হয় আমার জানা ছিল না। হাল্কা আলোয় তার গালের টোল পরিষ্কার দেখা যায়। এক সময়ের পাগল করা টোল। “পলা মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলো। ডাক্তাররা “না” করে দিয়েছেন, কোনভাবেই মেয়েটির চিকিৎসা সম্ভব নয়। পলা মুখের উপর সবাইকে বলে দিলো, ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিলেও সে ছাড়বে না। যেদিন হাসপাতাল থেকে সে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, সেদিন আমরা সেখানে ছিলাম। তার রুদ্ররূপে আমরা হতভম্ব। বাচ্চার জন্য মরিয়া এক বাঘিনিকে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম।
গাড়িতে আমি শুধু তাঁর হাত আকড়ে ধরে বললাম, এখন কি করবে ভেবেছো?
সে ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিলো। রাগে গনগনে সে মুখে চকচক করছে জেদ। বাচ্চাকে বাঁচানোর জেদ।”
উত্তেজনায় আমার হাত কাঁপতে থাকে, আমি তা লুকানোর চেষ্টা করতে করতে বলি,
‘তারপর তিনি কোমায় থাকা মেয়েকে গল্প বলা শুরু করেন?’

কেমন যেন শীত শীত লাগছে, তিনি তাতে উষ্ণতা ছড়িয়ে বললেন,’ হা, সে ঘোষনা দিলো, সে মেয়ের পাশে বসে গল্প শুনাবে, যে গল্প শুনিয়ে সে তাকে ছোটবেলায় ঘুম পাড়াতো। আর মেয়েকে ডাকবে, ফিরে আসার ডাক।তাঁর বিশ্বাস ছিল শুধু গল্প শুনিয়ে সে মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। দিনের পর দিন সে মেয়েকে গল্প শুনিয়েছিল।”
তাঁর কন্ঠে টুংটাং ঝরে পড়তে থাকে বেদনা। আমি জানি কি হয়েছিল, তারপর ও জিজ্ঞেস করি, মেয়েটি কি ফিরে এসেছিলো?”
তিনি হাসেন, ভেজা, আদ্র কান্না, “মাতৃস্নেহ কি কোনদিন সন্তানের মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে পেরেছে?” তারপর লুকানো ভেজা চোখ পরিষ্কার টলটল করে বিন্দু তৈরি করে, “মেয়ে চলে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর পলাকে পাওয়া যায় পটোম্যাক নদীতে। সম্ভবত আগের রাতে ঝাপ দিয়েছিলো।”
“তারপরই কি আপনারা দেশে ফিরে আসেন।”
“হা”।
“কিন্তু কেন, এত সুন্দর ক্যারিয়ার।”
তিনি আবার হাসেন, তীব্র বেদনায় নীল হাসি, ঠিক জানি না। এর কিছুদিন পর তিনি একদিন ভোরে আমাকে ডাকলেন, তখন ওয়াশিংটনে নরম গরম নেমেছে, বাগানে ফুটেছে সামারের শত রঙের ফুল। তিনি চা খাচ্ছেন, সামনে ওয়াশিংটন পোষ্ট। বললেন, দেশে ফিরে আসতে চান, একদম পৈতৃক ভিটায়। এখানে কাটাবেন বাকী জীবন। আমি অবাক, কী বলছেন তিনি!!! গন্ডগ্রামে গিয়ে আমরা কিভাবে থাকবো? ঢাকাতেই তো ছুটিতে গেলে ঠিকতে পারি না। কিন্তু তিনি শুধু বললেন,” আমি যাবো।”

আপনি রাজী হলেন, বাচ্চারা?
“হাঁ , আমি রাজি হলাম। কারণ আমি তাঁর চেহারায় পরিষ্কার আলো দেখলাম।বিশ্বাস করবেন না জানি, তবু বলি, আমি নিশ্চিত সে আলোর উৎস এ দুনিয়া নয়। সেটি ছিল অপার্থিব আলো। তাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার ছিলোনা।”
আমি কোন ভাষা খুঁজে পাই না, অনেক্ষণ থমকে থেকে বলি, তারপর ফিরে এলেন? তাঁর এ সিদ্ধান্তের সাথে কি পলার ব্যাপারটার কোন সম্পর্ক ছিলো?
“আমি ঠিক জানি না। তবে তিনি ফিরে এলেন। এখানে এসে তিনি এ আশ্রম করলেন , কী ভাবে যেন মানুষ বিশ্বাস করা শুরু করলো, তিনি স্বাভাবিক কেউ নন, উপরওয়ালার খুব প্রিয় একজন মানুষ। যদি ও তিনি সারা জীবন বলে গেছেন, তিনি আর দশজনের মতোই সাধারণ। কিন্তু গ্রামের সহজ সরল মানুষেরা তা বিশ্বাস করলোনা।”
বাইরে তক্ষক ডেকে উঠে, রূপবতি তরুণির রূপে ফেটে পড়ছে জোসনা। তিনি একটু চমকে উঠেন, তারপর উঠে দাঁড়ান, বলেন “অনেক রাত হল, ঘুমাতে যান।”
তাঁর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। কি অপরূপ পাখিদের বিভ্রান্ত করা চাঁদের আলো। এর মধ্যে মাঝরাতের নিস্তব্দতা ভেংগে একটি ভ্যান এসে থামে। একজন মহিলাকে নিয়ে দুজন পরুষ নেমে আসেন। মহিলাটি আর্ত স্বরে বিলাপ করেছেন, পুত—– পুত রে—–আমার পুতের জান ভিক্ষা দেন গো—-, বাবা, আপনার উসিলায় ভিক্ষা দেন——, আমার জন্য আপনি হাত তোলেন বাবা—–, আমি জানি আপনি সব দ্যাখেন—- পুতরে—-
তাঁর বিলাপের সাথে চিলির পলা আলেন্দের বিলাপের কোন তফাৎ নেই। বিপদাপন্ন সন্তান বাঁচানর যে বিলাপ, তার ভাষা দুনিয়ার সব জায়গায় এক এবং অভিন্ন।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমি একা একা আবছা মানুষগুলোকে দেখতে থাকি। গন্ডগ্রামে প্রায় মাঝরাতে এমন অতিথির আগমনে আমি অবাক হই না। তাঁরা এসেছেন, কিছু দূরে শুয়ে থাকা মানুষটির কাছে। তাদের ভরসার মানুষ। তাঁরা বিশ্বাস করেন, শুধু মানুষটির কবরের পাশে দাঁড়ালেই সমস্যা আর সমস্যা থাকেনা।
পাখিরা আবার ভোর হয়ে গেছে ভেবে আবার অস্থির ডেকে উঠে।
কী বিভ্রান্তির জ্যোৎস্না!!!!!