বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সীমানা: খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি ।। সুব্রত কুমার দাস

কিছুদিন ধরে জোরেসোরে লেখালেখি নিয়ে বসতে গিয়ে হঠাৎ-ই নতুন করে নিজেকে খানিকটা সমস্যাসঙ্কূল অবস্থায় আবিষ্কার করছি। মনে হচ্ছে, যে ঘাটতি বহু আগেই শুরু হয়ে দিনে দিনে পাহাড় হলো তাকে পূরণ করবো কীভাবে! কী উদ্যোগ যথার্থ হতে পারে সে পূরণ প্রক্রিয়ায়? কে বা কারা হবেন যথার্থ কর্মবীর সে উদ্যোগ গ্রহণে?

পুরো ব্যাপারটির মধ্যে অন্য আরও জটিলতা আছে। সে জটিলতা নিয়ে আগে একটু কথা বলে নেই? ব্যাপারটি বলতে গেল একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আসবে। আশা করি সে কারণে আমি ক্ষমার অযোগ্য হয়ে পরবো না। বাংলাদেশ থেকে টরন্টোতে অভিবাসী হয়েছি ২০১৩ সালে। নতুন শহরটিতে আমার পূর্বপরিচিত মানুষজন একবারেই না থাকলেও দ্রুতই পরিচয় ঘটতে থাকলো কমিউনিটির বিপুল সংখ্যক মানুষের সাথে। বলাই বাহুল্য সে মানুষদের সিংহভাগই বাংলাদেশ থেকে আগত। তাদের সকলের মুখেই ‘বাঙালি’ শব্দটা শুনি। টরন্টোতে বসবাসরত বাংলাভাষীদের প্রসঙ্গ এলে শব্দটি উচ্চারিত হয়। কমিউনিটির বিপুল সংখ্যক মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার পর, অনুষ্ঠানাদিতে যুক্ত হওয়ার পর বুঝতে পারলাম শব্দটির মধ্যে কী বিরাট এক ফাঁক রয়ে গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা ‘বাঙালি’ বলতে আসলে নিজেদেরকেই বুঝে থাকেন। পশ্চিম বাংলা থেকে অভিবাসী বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষী সে শব্দে অন্তর্ভুক্ত হন না। প্রবীন এক সাহিত্যকর্মীকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, পশ্চিম বাংলার বাঙালিরাও তো আমাদেরকে সগোত্রীয় মনে করে না। তিনি খুব যৌক্তিকভাবে বললেন, পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা বহু আগে থেকেই অভিবাসী হয়েছেন, বাংলাদেশিরা এসেছেন পরে, কিন্তু বাংলাদেশি বাঙালিদের আগমনে স্বাগত জানানোর মতো ঔদার্য তাঁরা দেখাতে পারেননি। নিজেদের শিল্প-সাহিত্য আয়োজনে তাঁরা কদাচিত বাংলাদেশের বাঙালিদের সম্পৃক্ত করেছেন।

সত্যিই তো… আমিও খেয়াল করলাম দুই দেশের বাঙালিরা একে অন্যের সামজিক অনুষ্ঠানগুলোতেও খুব কম আসেন। সামান্য কিছু পারিবারিক যাওয়া-আসা আছে মাত্র। জানি না, অন্যদেশগুলোতেও প্রবাসী বাঙালিদের এই দূরত্ব একই রকম কি না। সম্ভবত ভিন্ন নয়। তার এক সাম্প্রতিক উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। লন্ডনে গত এক নির্বাচনের রিপোর্ট করতে গিয়ে প্রবাসী এক বাংলাদেশি সাংবাদিক জানালেন যে সেখানে তিনজন বাঙালি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সে-নির্বাচনে চতুর্থ প্রতিদ্বন্দ্বী পশ্চিম বাংলার মানুষটিকে সে-সাংবাদিক ধর্তব্যে আনেননি। তা নিয়ে সোসাল মিডিয়াতে ঝগড়াটি বেশ দেখেছি।

আর ওই যে শুরুতে ‘লেখালেখি নিয়ে সমস্যা’র কথা লিখেছিলাম সেটার কারণ হলো: দেখছি, সামগ্রিক বাংলা সাহিত্য নিয়ে যা লিখতে যাচ্ছি সেটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। মাত্র দশক দুই আগেও একজন সাহিত্য সমালোচকের এমন দুরবস্থা ছিল বলে মনে হয় না। একটা উদাহরণ দেই? বছরখানেক হলো ভাবছিলাম বাংলা জীবনীমূলক উপন্যাস নিয়ে একটু কাজ করলে কেমন হয়? দেখলাম বাংলাভাষায় শতবর্ষ-প্রাচীন সে ধারাটি রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৮৫-১৯৩০) ‘শশাঙ্ক’ (১৯১৫) বা ‘ধর্মপাল’ (১৯১৬) দিয়ে শুরু করে প্রমথনাথ বিশীর (১৯০২-১৯৮৫) ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ (১৯৫৮) পার করে সত্যেন সেনের (১৯০৭-১৯৮১) ‘আলবেরুণী’ (১৯৬৯) বা ‘কুমারজীব’ (১৯৬৯) হয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের (১৯৩৩-২০০১) ‘শাহজাদা দারাশুকো’ (১৯৯৯) পর্যন্ত মনে হচ্ছে কষ্টেসৃষ্টে আসাই যায়। কিন্তু তারপর? প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্রের কথা তো দুই পাশের মানুষরাই ভুলে গেছেন। ‘জব চার্নকের বিবি’সহ আরও কতো কতো ইতিহাসআশ্রিত গ্রন্থের লেখক তিনি। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ বা কালীদাসের জীবন নিয়ে অমর মিত্র রচিত ‘অশ্বচরিত’ (২০০১) বা ‘ধ্রুবপুত্র’ (২০০৬) বাদ পরে গেলে কী সাংঘাতিক ব্যাপার যে ঘটে যেতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না। সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের ‘বাদশাহ নামদার’ (২০১১), কামরুল হাসানকে নিয়ে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘লড়াকু পটুয়া’ (২০১২), আখতার ইমামকে নিয়ে আনোয়ারা আজাদের ‘শঙ্খকন্যা আখতার’ (২০১৩), আহমদ ছফাকে নিয়ে গাজী তানজিয়ার ‘কালের নায়ক’ (২০১৪), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে মহিবুল আলমের ‘তালপাতার পুথি’ (২০১৫-২০১৭) ইত্যাদির নাম বললেও যুৎসই করে তো বলতে পারছি না বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের কথা। তাঁর ‘অম্বর থেকে আগ্রা’ যে আকবর এবং মানসিংহ নিয়ে কী অসামান্য সৃজন! আমি নিশ্চিত যে বাংলা ভাষায় পশ্চিম বাংলাতে ঐতিহাসিক এবং জীবনীমূলক উপন্যাস আরও অনেক অনেক রচিত হচ্ছে যা আমরা বাংলাদেশের পাঠকেরা জানতে পারছি না বললেই চলে।

এই যে বাঙালি-বিভাজন, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সাহিত্যক্ষেত্রে দুই দেশের বাঙালিদের সমঝোতার বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখছি পরিস্থিতি সেখানে আরও ভয়াবহ। কেন?

কারণ, পশ্চিম বাংলার পাঠক-সমালোচকের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি। প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, পশ্চিম বাংলায় ‘বাংলা সাহিত্য’ বলতে কী বোঝানো হয়? এ প্রশ্ন এ জন্য যে, বাংলা সাহিত্য বলতে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে রচিত সাহিত্যের অনিবার্য অন্তর্ভুক্তি সাধারণভাবে পশ্চিম বাংলায় স্বীকৃত নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে আমরা যখন বাংলা সাহিত্যের শুধু বাংলাদেশ ভূখণ্ডে রচিত সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে চাই, তখন তাকে ‘বাংলাদেশের সাহিত্য’ অভিধা দেই, যা যৌক্তিকও বটে। ভিন্ন ভিন্ন শাখায় এটি বাংলাদেশের কথাসাহিত্য, বাংলাদেশের কবিতা, বাংলাদেশের নাটক ইত্যাদি। বাংলাভাষী সংখ্যাগুরু মানুষ বাংলাদেশের অধিবাসী। এমনকি সামগ্রিক বাংলা সাহিত্য-চর্চায় আয়তন ও মান উভয় দৃষ্টিকোণেই বাংলাদেশের সাহিত্য নিশ্চয়ই মনোযোগের দাবিদার। অথচ শুধু পশ্চিম বাংলার সাহিত্যকেই ওদের অনেকে সহজেই ‘বাংলা সাহিত্য’ অভিধা দিয়ে থাকেন। তথ্য-যুক্তি দিয়ে এ বিষয়টি দেখতে চাই। নিজের সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে বাংলা সাহিত্যের শুধু একটি শাখা কথাসাহিত্য নিয়ে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করছি।

বহুলশ্রুত এবং পঠিত গ্রন্থ ‘বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ দিয়ে শুরু করা যাক। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে। বহু সংস্করণের পর নবম সংস্করণ পূণর্মদ্রণ হয়েছে ১৯৯২ সালে। ‘সৃজ্যমান উপন্যাস সাহিত্য’ শিরোনামের এর সর্বশেষ অধ্যায়টিও প্রায় সোয়া শ’ পৃষ্ঠা। এতে ভারত-বিভাগোত্তরকালের বাংলা উপন্যাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যদিও বাংলাদেশের কোনো ঔপন্যাসিক এতে অন্তর্ভুক্তি পাননি। যেমন পাননি সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা উপন্যাসের কালান্তর’ গ্রন্থেও। যদিও সরোজবাবুর এ বইটি ১৯৬৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়ে নতুন নতুন পরিমার্জিত সংস্করণও বেরিয়েছে। হীরেন চট্রোপাধ্যায়ের ‘বাংলা উপন্যাসের শিল্পীরীতি’ (১৯৮২) গ্রন্থটিতেও ভিন্ন কোনো ভিন্ন চিত্র নয়। ইতোমধ্যে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ভূদেব চৌধুরীর ‘বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্প ও গল্পকার’ (চতুর্থ পরিবর্তিত পরিবর্ধিত সংস্করণ ১৯৮৯) শিরোনামের গ্রন্থটিও একই পথের। অন্য আর একটি প্রবাদপ্রতিম আলোচনাগ্রন্থ ‘আধুনিকতা ও বাংলা উপন্যাস’ও একই খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। আলোচনায় লেখক সর্বশেষ সমরেশ বসু পর্যন্ত এনেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো ঔপন্যাসিক স্থান পাননি এতেও। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর একটি গ্রন্থ ‘বাংলা উপন্যাস:  দ্বান্দ্বিক দর্পণ’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৩, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৯৬)। বর্তমান দশকের পশ্চিম বাংলার উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করা হলেও বাংলাদেশের উপন্যাস নিয়ে আলোচনার উপযুক্ত বিবেচিত হয়নি! যেমনভাবে তপোধীর ভট্টাচার্যের ‘বাখতিন: তত্ত্ব ও প্রয়োগ’ (১৯৯৬) গ্রন্থেও বাংলাদেশের কোন ঔপন্যাসিকের লেখায় সে প্রয়োগ পরীক্ষিত হয় না। সমীরণ মজুমদার সম্পাদিত ‘উপন্যাসশিল্প’ (১৯৯৭) গ্রন্থের চিৎপ্রবাহের উপন্যাস প্রবন্ধটি যদিও একজন বাংলাদেশের সমালোচকের, কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, তিনি বাংলাদেশের কোনো ঔপন্যাসিকের লেখার ‘চিৎপ্রবাহ’ খুঁজে পাননি। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত রূশতী সেনের ‘সমকালের গল্প-উপন্যাস: প্রত্যাখানের ভাষা’র অবস্থাও একই। একই বছরে প্রকাশিত স্বরাজ গুছাইতের ‘বিনির্মাণ ও সৃষ্টি: আধুনিক উপন্যাস’ এ প্রসঙ্গে একটি উল্লেখ্যযোগ্য গ্রন্থ হলেও উপেক্ষিত বাংলাদেশের সাহিত্যের কপালে ভিন্ন কিছু জোটেনি। সুমিতা চক্রবর্তীর ‘উপন্যাসের বর্ণমালা’ (১৯৯৮) বইটিও ভিন্ন কিছু নয়। বেশ মোটাসোটা এ গ্রন্থটিতে ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পশ্চিম বাংলার কথাসাহিত্য আলোচনা স্থান পেলেও বাংলাদেশের একজনও স্থান পাননি। ১৯৯৯-এ প্রকাশিত ড. সুবোধ দেবসেনের ‘বাংলা সাহিত্যে ব্রাত্যসমাজ’ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করায় বাংলাদেশ অনুল্লিখিত রাখার দোষের ভাগ কম পড়ে। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়। এই যে দীর্ঘ তালিকা তার সব ক’টিই বাংলা উপন্যাস/কথাসাহিত্য বলতে পশ্চিম বাংলায় প্রকাশিত উপন্যাস/ কথাসাহিত্যকে বুঝাল! এর আসল রহস্যটা কোথায়? কুক্ষিকরণ? ভূখণ্ডে নাকি উন্নাসিকতায়? অন্য সবাইকে বাদ দিলেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো খ্যাতনামা আধুনিক ঔপন্যাসিকও বাদ পড়ে যান কীভাবে? ‘দেশ বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে নতুন ঔপন্যাসিকের আবির্ভাব হয়নি। বিভাগপূর্বকালের লেখকেরাই এ দেশের প্রথম পর্বের কথাসাহিত্যিক। এ সময়ের শ্রেষ্ঠ লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রথম উপন্যাস লালসালু (প্রথম প্রকাশ ১৯৪৮)। এপার বাংলায় অন্তত বহুদিন পর্যন্ত ওয়ালীউল্লাহর পরিচয় লালসালুর লেখক। চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদোর কথা বা পড়াও অতি সাম্প্রতিক ঘটনা।’ পশ্চিম বাংলার আলোচক তুষার পণ্ডিতের এ বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে ‘দিবারাত্রির কাব্য’ পত্রিকার অক্টোবর-ডিসেম্বর’ ৯৮ সংখ্যায় যার ক্রোড়পত্র ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’। একপক্ষীয় যোগাযোগের কারণেই যে তুষার পণ্ডিতের অভিজ্ঞতা তা বুঝতে বাকি থাকে না। দীর্ঘদিন পশ্চিম বাংলার বই বাংলাদেশে বন্যার পানির মতো এলেও উল্টোক্ষেত্রে উল্টোটিই ঘটেছে। এটুকু মেনে নিলেও এর সামগ্রিক সত্যকে স্বীকার করতে কষ্ট হয়, যখন দেখি শুধু জন্ম নয় পশ্চিম বাংলার সত্তর বছরের বেশি সময় যিনি কাটিয়েছেন, সেই কাজী নজরুল ইসলামের কোন গল্প উপন্যাস নিয়েও উপর্যুক্ত অধিকাংশ গ্রন্থ কোন আলোচনা, এমনকি উল্লেখও হয়নি। তালিকা দীর্ঘ না করেও প্রশ্ন তোলা যায় কাজী আবদুল ওদুদের ‘নদীবক্ষে’ (১৯১৯) বা হুমায়ুন কবীরের ‘নদী ও নারী’ (১৯৪৫) তো কলকাতা থেকেই ছাপা হয়েছিল। সেগুলো বাদ যায় কেন? কাজী আবদুল ওদুদ না হয় দেশ বিভাগকালে চলে এসেছিলেন পূর্ববঙ্গে, কিন্তু হুমায়ুন কবীর? তিনি তো সারা জীবন রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন – তাঁর নামটি কি অবশ্য উচ্চার্য নয়? একদিকে হুমায়ুন কবীরের বাদ যাওয়া অন্যদিকে অদ্বৈত মল্লবর্মণ বা এ রকম আরও বহু অন্তর্ভুক্তি দিয়ে স্পষ্ট হয় – ‘বাংলা সাহিত্য’ বলতে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য ইতিহাসকারেরা কী বোঝাতে চান।

পশ্চিম বাংলার সমালোচকদের এমন জবরদস্তির কারণেই কি আমরা বাংলাদেশের জনগণ মেনে নিলাম ওরা ‘বাংলা সাহিত্যের’ উত্তরসূরি আর আমাদের সাহিত্য ‘বাংলাদেশের সাহিত্য’? সেজন্যই কি আমাদের আলোচনা-সমালোচনা গ্রন্থের নাম হয় ‘বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী’ (মুহাম্মদ ইদরিস আলী (১৯৮৫), ‘বাংলাদেশের উপন্যাসে সমাজচিত্র’ (ভূইয়া ইকবাল, ১৯৯১), ‘বাংলাদেশের তিনজন ঔপন্যাসিক’ (শিরীন আখতার, ১৯৯৩), ‘বাংলাদেশের কবিতা ও উপন্যাস: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ (আমিনুর রহমান সুলতান, (১৯৯৬), ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প: বিষয় ভাবনা স্বরূপ ও শিল্পমূল্য’ (আজহার ইসলাম, ১৯৯৬), ‘বাংলাদেশের উপন্যাস: বিষয় ও শিল্পরূপ’ (রফিকউল্লাহ খান,  ১৯৯৭), ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প: জীবন ও সমাজ’ (মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, ১৯৯৭), ‘বাংলাদেশের উপন্যাসে জীবনচেতনা’ (ফরিদা সুলতানা, ১৯৯৯)?

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলবেন হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে ওরা কি কিছুই করে নি? হাসান বা ইলিয়াসকে নিয়ে ওদের ভিতর তাঁরাই কিছু করেছেন, যাঁরা পূর্ণতই প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আর ইলিয়াসকে নিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহী প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের প্রতি ইলিয়াসের নিজের ভাবনা আমাদের কারও অজানা নয়। আবুবকর সিদ্দিক? তাও না হওয়ার মতোই। তারও বাইরে? তসলিমাকে নিয়ে যে হৈ-হৈ-রৈ-রৈ তার কারণ প্রথম থেকেই স্পষ্ট। হুমায়ূন আহমেদ বা ইমদাদুল হক মিলন যে প্রসাদ পেয়েছেন, তাকে সোনামাপা নিক্তিতে মাপতে হবে।

এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক সেই আলোচনা গ্রন্থগুলোর দিকে, যেগুলোতে বাংলাদেশের সাহিত্য অল্প হলেও আলোচনায় এসেছে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল সত্য গুহের ‘একালের গদ্যপদ্য আন্দোলনের দলিল’ (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৯৯)। দ্বিতীয় সংস্করণে হয়েছে ‘অধুনা (বাংলা সাহিত্যের দু’মহল) ১৯৭০-১৯৯৮’ অংশটি। অধুনার ৪৮ থেকে ৮১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বাংলাদেশের সাহিত্য। কালানুক্রমিকতা না মেপে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাল উল্লেখ না করে এতে বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে হয়েছে এবড়ো থেবড়ো কিছু আলোচনা। লেখক ও গ্রন্থ নামের বিপুল ভ্রান্তির জন্যও গ্রন্থটি আর্কাইভে স্থানলাভযোগ্য। আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শামসুদদীন আবুল কালাম, শামসুর রহমান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আহমদ ছফা, কায়েস আহমেদ প্রমুখ কেউই বানানরোষ থেকে রক্ষা পাননি। একই লেখকের নাম একই পৃষ্ঠাতেও ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ড. নজরুল ইসলামের ‘বাংলা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস’ গ্রন্থটি এ সংক্রান্ত আলোচনায় বিশিষ্টতার দাবিদার। আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের কালানুক্রমিক ধারায় সেখানে পশ্চিম বাংলার লেখকেরা অন্তর্ভুক্ত হন। আর বাংলাদেশের উপন্যাস একটি ভিন্ন শিরোনামে জায়গা পায়। কেন? তবে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তপোধীর ভট্টাচার্যের ‘উপন্যাসের সময়’-এ বিচারটি বেশ পক্ষপাতশূন্য মনে হয়। একই বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত পশ্চিম বাংলার বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘হৃদয়ের একুল-ওকুল’ পড়লে বোঝা যায় লেখক বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সমঝদার পাঠক। ২০০০ সালে প্রকাশিত সত্যেন্দ্রনাথ রায়ের ‘বাংলা উপন্যাস ও তার আধুনিকতা: বিষয় ও কাল বিশ্লেষণ’-এ বিশেষভাবে উল্লেখের দাবিদার। পশ্চিম বাংলার ঔপন্যাসিকদের পাশাপাশি সেখানে আলোচিত হয়েছেন যথাক্রমে আবু ইসহাক, শহীদুল্লাহ কায়সার, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এ ছাড়াও অন্য কারও নাম কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তা লেখক গ্রন্থের শুরুতে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ১৯৪৭-এর ভারত বিভাগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় কোন জটিলতা আছে বলে মনে হয় না, যেহেতু সীমান্তের বাধা তখনও সৃষ্টি হয়নি। যোগাযোগ ও ভাব বিনিময়ে কোনো অন্তরায় তখন ছিল না। ১৯৪৭-এর পূর্ব পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য বলতে আমাদের বাংলা ভাষায় সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপকেই মেনে নিতে হবে, যার উত্তরসূরী ১৯৪৭-পরবর্তী পশ্চিম বাংলা এবং তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশ দু’অঞ্চলই। পরবর্তীকালের সাহিত্যও বাংলা সাহিত্যেরই সাম্প্রতিক ধারা, বাইরে নয়। তবে যদি উভয় বাংলার সাহিত্যের সামগ্রিক আলোচনা না হয়ে কোনো একটি অংশের খণ্ডিত আলোচনা হয়, তবে সেখানে বন্ধনী ব্যবহার করে স্থান উল্লেখই কি শ্রেয় নয়? এ বিষয়ে পণ্ডিত সমাজের কাছে একটি নীতির্নিধারণ কাম্য। এমন দূর-অস্ত অবস্থার জন্যে দায়ী অনুঘটকগুলো কী কী? পশ্চিম বাংলাতে বাংলাদেশের বই না যাওয়া সেগুলোর অন্যতম। বেশ ক’বছর ধরে কলকাতা বইমেলাতে বাংলাদেশ প্যান্ডেলের উপস্থিতি সামান্য হলেও সে ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বাংলাদেশের বইমেলাতে পশ্চিম বাংলার বই না থাকার ঘাটতি কেমনে যে পূরণ হবে!

সে ঘাটতির কারণেই কি বাংলাদেশের আলোচক সুধাময় দাস এমন একটি বই লেখেন? ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘বাংলা উপন্যাসে চিত্রিত জীবন ও সমাজ’-এ তিনি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময়কালে রচিত উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করলেও পশ্চিম বাংলায় রচিত কোনো উপন্যাসকে আলোচনায় আনেননি। পশ্চিম বাংলা সাহিত্য-আলোচকদের দীর্ঘদিনের ‘বাংলা সাহিত্য’ অভিধার বিকৃত ব্যবহারের কারণেই কি সুধাময় এমন শিরোনাম বেছে নিয়েছেন?

বাংলাকে যদি আমরা পৃথিবীর বুকে একটি শক্তিশালী ভাষা এবং সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই তাহলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এখনই গ্রহণ করা প্রয়োজন। দিন যতো যাচ্ছে, ততোই দূরত্ব বাড়ছে। সকলকেই এই বিভাজন এবং খণ্ডিত মনোভাব আহত করছে। নেতৃস্থানীয়রা এই বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনায় এনে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি ও সাংস্কৃতিক উৎসব বিনিময়ের উদ্যোগ নিলে উপকার হবে। আলোচনা হতে পারে লেখক-লেখক পর্যায়ে। সন্দেহ নেই অন্তর্জাল সে দূরত্ব ঘোচাতে ভূমিকা রাখছে খানিকটা। কিন্তু আরও বহু বহু উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যিক যা বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য বিষয়ে বাংলাভাষী মানুষদের মধ্যে দূরত্ব কমাতে সাহায্য করবে। বাঙালি জাতির সামূহিক কল্যাণ্যের প্রশ্নেই কাজটি অত্যাবশ্যক।

  • সুব্রত কুমার দাস: টরন্টো