দূরত্বের দুর্বিপাক // মায়মুনা লীনা
May 2, 2018
তোর মতোন কেউ নেই // শাখাওয়াৎ নয়ন
May 2, 2018

প্রথম দর্শনে প্রেম // মো. জিয়াউল হক

প্রেম বড়ই অদ্ভুত! প্রেমে যে পড়ে, সেই বুঝে এর নেশা মাদকের চেয়েও কয়েক গুণ বেশী! প্রেম কারো জীবনটাকে গুছিয়ে দেয়, আবার কারো জীবনকে মুহূর্তে ধ্বংসও করে। আমাদের এই গল্প সেই প্রেমিককে নিয়ে যে প্রেমে পড়ে সব হারিয়েছে!

“Love at first sight” বা প্রথম দর্শনে প্রেম বলে কিছু আছে কি নেই তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তবে এরকম কিছু একটা যে আসলেই আছে এ ব্যাপারে নোবেলের মনে কোনও সন্দেহই নেই! কারণ বোঝার জন্য কাউকে রকেট সায়েন্স বুঝতে হবে না! তার সরল অর্থ হচ্ছে এই যে নোবেল প্রথম দর্শনেই একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে সম্মান কোর্সের প্রথম ক্লাস করার জন্য নোবেল ক্লাসরুমের দিকে রওনা দেয়। নির্দিষ্ট দালানে প্রবেশ করার সাথে সাথেই পেছন থেকে একটি তরুণীর মধুর মতন কণ্ঠ ভেসে আসে,

– এই যে শুনছেন?

– আমাকে বলছেন?

– জি, আপনাকেই বলছি।

– জি বলুন।

– আচ্ছা, ইংরেজি বিভাগটা কোন দিকে বলতে পারবেন?

– আপনি কি ইংরেজি বিভাগের ছাত্র?

– জি।

– আমিও। আমি ক্লাসরুমের দিকেই যাচ্ছি। চলুন একসাথে যাওয়া যাবে।

– তাহলেতো ভালোই হলো! চলুন।

– আপনার নামটা জানতে পারি?

– এক শর্তে বলতে পারি, যদি ‘আপনি’ ছেড়ে ‘তুমি’ বলো!

– আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি কি তোমার নামটা জানতে পারি?

– আমি ঈশিতা। তোমার নাম?

– নোবেল। কথা বলতে বলতে আমরা ক্লাসরুমের সামনে চলে এসেছি! এই হচ্ছে আমাদের ক্লাসরুম!

– বাহ! বেশ সুন্দর তো!

 

– হ্যাঁ, সুন্দর বটে!

নোবেলকে দেখার পর ঈশিতার মনে কোনও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে কিনা নোবেল তা জানে না, তবে তার মনে যে ভালোবাসার ১০ মাত্রার কম্পন বয়ে গেছে তা নোবেল ছাড়া আর কেউ জানে না! মানে “Love at first sight” বলতে যা বোঝায় আর কি!

একসময় নোবেল ঈশিতার ভালো বন্ধু হয়ে উঠে; বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর ১৪ই ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস”-এ নোবেল ঈশিতাকে তার ভালোবাসার কথা জানায়। ঈশিতাও তাকে ভালোবাসে বলে জানায়। সেখান থেকেই প্রেমের শুরু। রিক্সায় মাইলের পর মাইল অরণ্যে ঘুরে বেড়ানো, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে প্লেটের পর ফুচকা আর চটপটি খাওয়া, হাতে হাত রেখে নদী তীরে গোধূলি লগ্ন দেখা ইত্যাদি চলতে থাকে।

ইতোমধ্যে নোবেল এবং ঈশিতা তাদের বিয়ের পর কয়টি সন্তান নেবে এবং তাদের কার কি নাম হবে সব ঠিক করে রেখেছে! তাদের দুজনের মাঝেই যেন স্বর্গ বিরাজ করে; কারো মনে দুশ্চিন্তার কোনও ছিটেফোঁটা নেই; একে অন্যকে পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত এবং তৃপ্ত।

কিন্তু কার কুনজর লেগেছে কে জানে, এই সুন্দর এবং পবিত্র সম্পর্ক নদীর মতই এক সম্পূর্ণ অন্য বাঁকে মোর নেয়! একদিন ঈশিতা নোবেলকে ফোন করে বলে যে তার বাবা মা তার জন্য এক বিদেশি পাত্র দেখেছে। ছেলে লন্ডনে থাকে। প্রচুর টাকাকড়িও আছে। সে এটাও বলে যে নোবেলের কথা তার বাবা মাকে বলার সাথে সাথে তারা নাকি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে। এসব শুনে নোবেল ঈশিতাকে বলে,

– তুমি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো?

– এটা আবার কেমন প্রশ্ন?

– হ্যাঁ বা না বলো?

– তোমার কি মনে হয়?

– আমার যাই মনে হোক, আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই!

– হ্যাঁ।

– তাহলে তোমার বাবা মাকে শক্তভাবে বলতে পারো না যে আমাকে ছাড়া তুমি কাউকে বিয়ে করবে না?

– বলেছি, কিন্তু তারা কেউই আমার কথা পাত্তা দেয়নি!

– তুমি কি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে?

– না।

– তাহলে চলো পালিয়ে বিয়ে করি!

– সেটা কি উচিত হবে?

– কেন হবে না?

– আমরা এখনও ছাত্র! এই অবস্থায় বিয়ে করাটা মনে হয় কোনোভাবেই ঠিক হবে না।

– তাহলে কি আমরা কখনও এক হতে পারবো না?

– দেখা যাক কি হয়!

দেখতে দেখতে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসে, পরীক্ষা শেষ হয়, ফলাফলও চলে আসে। ইতোমধ্যে নোবেল এবং ঈশিতার ফোনে কথা হয়, দেখাও হয়, যদিও তা আগের মতন নয়।

একদিন ঈশিতার ফোন বন্ধ পাওয়ায় নোবেল বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সে ঈশিতার ফ্ল্যাটের পাশের ফ্ল্যাটে থাকা তার বান্ধবী লাবণ্যকে ফোন করে ঈশিতার সম্পর্কে জানতে চায়,

– লাবণ্য, ঈশিতার ফোন সারাদিন ধরে বন্ধ! সে কি বাসায় আছে? তুমি জেনে আমাকে একটু জানাবা প্লিজ!

– লাবণ্যরতো আজ বিয়ে হয়ে গেছে! সে এখন তার স্বামীকে নিয়ে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দিয়েছে। আজ রাতের ফ্লাইটে লন্ডন যাচ্ছে!

– কি বোলো? তুমি আমার সাথে মশকরা করছো নাতো?

– না, না, মশকরা করবো কেন? যা সত্যি তাই বলেছি। ঘরোয়া পরিবেশে বিয়ে হয়েছে।

ঈশিতার বিয়ের কথা শোনার পর নোবেলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে! তার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয় না। মনে হয় যেন কোনও এক পাহাড়ের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে! তার কাছে জীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন মনে হয়। মনে অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছে বলে নোবেল সেই বেদনা ভোলার জন্য নেশার পথ বেছে নেয়। অবিরত নেশা করতে করতে একসময় সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়।

দুই বছর পর ঈশিতা তার স্বামী অর্ককে নিয়ে দেশে ফিরে আসে। এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় আসার পথে এক মোড়ে জ্যামের কারণে গাড়ি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তখন ঈশিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে নোবেলকে দেখেই আঁতকে উঠে! যদিও নোবেল তার সেই পূর্বের নোবেল নেই! কংকালসার দেহ, উস্কখুস্ক চুল, ছেঁড়া কাপড় পরা নোবেলকে দেখে আর কেউ চিনুক না চিনুক ঈশিতা ঠিকই চিনতে পেরেছে।

মনের অজান্তেই ঈশিতার মুখ ফুটে “নোবেল” শব্দটি বের হবে হবে ভাব, এমন সময় রাস্তা পরিস্কার হয়ে যায়। গাড়ি সামনে এগিয়ে যায়। মানুষ অতীতকে পেছনে ফেলে যেমন সামনে এগিয়ে যায়, তেমনি ঈশিতাও নোবেলকে আরও একটিবার পেছনে ফেলে সম্মুখে ধাবমান হয়!

***********