কখনো এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আমাদের যাত্রা পিচ্ছিল করে তোলে। কারো মাথায় থাকে ছাতা, বেশির ভাগই ভিজে ভিজে হাঁটতে থাকি। সারাদিনের পথচলায় কোনো গ্রাম বা বাড়িঘর কাছাকাছি নেই। চারিপাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত শুধু। মাঝে মাঝে একটি নদী, একটি খাল ও কিছু বট গাছ চোখে পড়ে।  চলার পথে কখনো মানুষের বিষ্ঠা, কখনো খানিকটা গর্ত, কখনো পানির স্রোত, কখনো উঁচু মাটির ঢেলা বাধাগ্রস্ত করলেও আমাদের যাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে না। আঁধার হওয়ার আগেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে।

এই দীর্ঘ যাত্রার অনেকটাই আমি স্মরণ করতে পারছি না। কারণ সেই সময়টাতে মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম কীভাবে এই দল থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। যারা দেশকে শত্রুমুক্ত করার চেষ্টা করছে তাঁদের সাথে যোগ দেব।

নিজ পরিবার এবং আত্মীয়ের সাথে সাথে যাযাবরের মত ঘুরছি ঠিকই কিন্তু সক্ষম যুবক হয়েও দেশের কোন কাজেই আসতে পারছি না বলে নিজেকে  খুব  ছোট মনে হতো। এই ছোট মনে হওয়া থেকে দিনে দিনে নিজেকে ঘৃণা করতে লাগলাম। সেদিন শাহবাজপুরের তামান্না আমাদের সসস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে জানিয়ে গেল। আর আমি? দেশের উচ্চতম শিক্ষাপীঠ, স্বাধীন বাংলাদেশের ডাক দেয়ার অগ্রপথিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও ভয়ে ভয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি!

আমি তো তেমন লোক নই! পারি বা না পারি, সহপাঠীদের তিরষ্কারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্কুলে, কলেজে, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ক্রিকেট খেলেছি, ফুটবল খেলেছি, দাবা, টেবিল টেনিস খেলেছি, ঢাকা কলেজ ও টিএসসির স্টেজে গান গেয়েছি, মিটিং করেছি। উণসত্তরের গণ আন্দোলনের মিছিলে অগ্রপথিক হয়েছি, বক্তৃতা দিয়েছি। ডাকসুর ইলেকশনে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজের দলের আদর্শকে সমুন্নত রেখেছি। খুব কম লোকই যে সময় পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের কথা চিন্তা করেছে, মার্চের সেই এক তারিখেই আমি অস্ত্র বানানোর প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করেছিলাম। আজ ছাত্রলিগের যেসব বন্ধুবান্ধবেরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে, যুদ্ধের জন্য উদবুদ্ধ করতে আমিই তাঁদের বলেছি যে স্লোগানের দিন শেষ হয়ে গেছে। সেই আমি কিনা আজ শত্রু থেকে বাঁচতে ভয়ে ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি! ধিক সেই আমি!

কিন্তু আর নয়! আমাকে এবার আসল দায়িত্ব কাঁধে নিতেই হবে। আমি যুদ্ধে যাব। এখন আমি ছাত্রলিগ বা ছাত্রইউনিয়ন বুঝি না। এখন বুঝি বাংলাদেশ। একে হানাদার মুক্ত করতে হবে। আমি ভারতের আগরতলায় চলে যাব। ছাত্রলিগ এবং আওয়ামি লিগ যদি আমাকে সাথে নিতে না চায়, অগত্যা মনিমামা মেজর খালেদ মোশারফের কাছে ধন্না দেব। তাঁর কাছে নিশ্চয়ই আমি কোন ছাত্র সংগঠন করতাম তা এতো গুরুত্বপূর্ণ হবে না। ভাগ্নে হিসেবে হলেও তিনি আমাকে নিশ্চয়ই কোন দায়িত্ব দেবেন।

আমি যুদ্ধে যাব। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় বাধা মা বাবার বাঁধন। আম্মা সব ছেলেমেয়েদের যক্ষের ধনের মত আগলে রাখেন। আব্বা রাজি হলেও আম্মাকে বললে তিনি যেতে দেবেন না।  আবার তাঁকে না জানিয়ে চলে গেলে ভীষণ মুষড়ে পড়বেন। আমি যখন খুব ছোট, বড়ভাই রাগা করে দুয়েকবার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যেতেন। আম্মার তখনকার হা-হুতাশ ও বেতাবি আমার চোখের সামনে ভাসে এখনো। তখন তাঁর কষ্টে আমার বুক ফেটে যেতো। আজ আমি চলে গেলেও তাঁর তেমনি কষ্ট হবে। কিন্তু আমার যেতে হবে। তাহলে তাঁকে বুঝিয়ে বলে যাওয়াই ভাল।

নোয়াগাঁও এর আশ্রয় থেকে বের হয়ে হাঁটা ও নৌকা দিয়ে যাওয়ার এক সময় ধানক্ষেতের আইল ধরে আমি আম্মার সাথে সাথে হাঁটছিলাম, সবার পেছনে। তাঁকে বললাম, দেশের এই প্রয়োজনে আমার মত জোয়ান ছেলের খুবই প্রয়োজন। আল্লাহর কৃপায় আপনার ছয়টি ছেলে সন্তান আছে। আপনার উচিৎ অন্তত একজনকে দেশের জন্য উৎসর্গ করা। আমি যুদ্ধে যাব। পরে আপনি যেন আশ্চর্য না হন, তাই জানালাম। আজ এভাবে হাঁটতে হাঁটতেই এক ফাঁকে আমি সরে পড়বো। আমাকে না দেখে আপনি বিচলিত হবেন না।

হাঁটতে হাঁটতেই আম্মা বললেন বাবারে তোরা তো অন্য সবার সন্তানের মত না। তোরা আমার অনেক আরাধনার সন্তান। আল্লাহর কাছে অনেক চেয়ে বিয়ের অনেক বছর পর তোদের পেয়েছি আমার কোলে। অনেক কষ্ট করে মানুষ করছি তোদের। আমাকে ছেড়ে যাবার কথা বলিস না বাবা। দেশের কাজ করতে যুদ্ধেই যেতে হবে তেমন তো কথা নেই। এই যে তুমি আমাদের দেখে দেখে রাখছো, সেটাওতো দেশের কাজ। তুমি বাবা যুদ্ধে যাবার কথা আর উচ্চারণ করো না।

এবার আমি অনেক শক্ত হয়ে রুক্ষ ভাবেই বললাম, আপনি যতকিছু এবং যাই বলেন না কেন, আমি যাবই। এটিই আমার শেষ কথা। আম্মা অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। কম্পিত কণ্ঠে চিৎকার করে ডেকে উঠলেন, এই শুনুন! সামনে হাঁটতে থাকা আব্বা প্রায় দশ কদম পিছিয়ে এলেন। আম্মা স্বরে ভীষণ উষ্মা মিশিয়ে বললেন, দ্যাখেন তো ও কী বলছে। ও বলছে সে নাকি আমাদের ছেড়ে যুদ্ধে চলে যাবে। আমি কিছু জানি না। আপনি ওকে বুঝিয়ে বলুন।

আব্বা পরম মমতাভরে একটি হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে, দেখি বাবা তোমার হাতটি দাওতো। আমার একটি হাত মুঠো করে ধরে বললেন আয়, আমার সাথে আয়। আমি প্রতিবাদ করতে পারলাম না। একটা অস্বস্তির সাথে হাতটি এগিয়ে দিলাম।

কিন্তু এ কী? তাঁর হাত থেকে আমার হাতের ভেতর দিয়ে তাঁর পিতৃস্নেহ গলে গলে আমার দেহের প্রতিটি কোষে প্রবাহিত হতে লাগলো। আমার মুখে কোন বাক্য উচ্চারিত হলো না। আমরা হাঁটতে থাকলাম পাশাপাশি। কেউ কোন কথা বলছি না। কিন্তু শক্ত করে ধরা তাঁর মুঠির মাধ্যমে তাঁর মনের প্রতিটি কথা যেন আমার হাতের ভেতর দিয়ে আমার মস্তিষ্কে গিয়ে বিদ্ধ হচ্ছে। ছোটকালে দুটো গুনার তার জোড়া দিয়ে টেলিফোনের মত কিছু বানিয়ে ছোটআপার সাথে দুজন দুজনা থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে যেভাবে বাক্যবিনিময় করতাম ঠিক যেন সেই রকম।

আমাদের মা এবং বাবা দুজনেই আমাদের খুব স্নেহ এবং শাসন করতেন। দুজনকে ভয় করতাম দুরকম। আব্বা আমাকে ইংরেজি ও অঙ্ক করাতেন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকা অব্দি। সাধারণত চুপচাপ, বই পড়তে থাকা আব্বা প্রয়োজনের সময় কথা বলতেন মুখে মিষ্টি এক হাসি নিয়ে। কিন্তু কখনোই হাত লাগিয়ে বা আলিঙ্গন করে স্নেহ প্রকাশ করতেন না। খুব ছোটকালে জ্বর হলে একবার গভীর মমতাপূর্ণ তাঁর কোলে চড়া, পরবর্তীতে দুই ঈদের নামাজ শেষে আলিঙ্গন করা, তাঁকে ছেড়ে কোথাও যাওয়ার আগে বা ফিরে আসার পর পা ছুঁয়ে সালাম করা, এবং কখনো কখনো তাঁর পা টিপে দেয়া ছাড়া তাঁর সাথে দৈহিক স্পর্শের কথা আমার খুব একটা মনে পড়ে না।  কিন্তু তাতে আমার প্রতি তাঁর স্নেহের কোন কমতি ছিল তা কখনোই মনে হয়নি।

সেই রকম একটি সম্পর্ক ভংগ করে আজ তাঁর হাত ধরে চলতে প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি হলেও আমি তা পুরোপুরি উপভোগ করছিলাম। ধরা হাত দিয়েই তিনি যুক্তি দিয়ে যাচ্ছিলেন এই মুহূর্তে কেন আমার যুদ্ধে যাওয়া ঠিক হবে না।

আমাদের অবশ্যম্ভাবী স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা উঠলে আব্বা কদিন আগে যে যে সাম্ভব্য পরিস্থিতির কথা আলোচনা করেছিলেন, আজ সেগুলো যেন আরো জোরের সাথে আমাকে বলে চলেছেন। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা গুরুম গুরুম কামানের শব্দ আমাদের অব্যক্ত কথোপকথনকে থামিয়ে দিচ্ছে। তিনি যেন বলছেন আমরা না চাইলেও যুদ্ধে তোমার অবশ্যই যাওয়া উচিৎ। তোমার মত যুবকরা এগিয়ে না গেলে দেশ কখনোই শত্রুমুক্ত হবে না। যুদ্ধের খাতিরে তোমাকে ঘুরে বেড়াতে হবে বন বাদাড়ে, ভাগ্য ভাল হলে স্থান পাবে অস্থায়ী কোন ক্যাম্পে। কিন্তু তোমার বর্তমান স্বাস্থ্য নিয়ে তুমি কীভাবে যুদ্ধ করবে?

বদহজম বা ডিস্পেপসিয়া রোগ তোমার বহুদিনের সঙ্গী! এই মুহূর্তেও তোমার পেটের অবস্থা ভাল নয়। তোমার মা আছেন বলে বেছে বেছে তোমাকে খাবার দিচ্ছেন। ঢাকার ফজলুল হক হলের খাবার খেয়ে প্রায়ই তুমি আমাশায় ভুগলেও হাসপাতালে থেকে এবং ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছো। বনজঙ্গলে বা ক্যাম্পের জল ও খাবার ফজলুল হক হল থেকে খুব ভাল হওয়ার কথা নয়। একবার অসুখ হলে সেখানে হাসপাতাল, বা ওষুধ, বা শুশ্রূষা পাবে কোথায়? আর কিছুদিন অপেক্ষা কর। নিজের স্বাস্থ্যটা আগে নিজের আয়ত্বে আন যেন বারবার অসুস্থ হয়ে না পড়। তারপর তুমি যুদ্ধে যেও। আমি বাধা দেব না।  তখন আমিই তোমাকে যাওয়ার জন্য তাড়া দেব।

একসময় বহুদূরের একটি গ্রামকে বাঁয়ে রেখে আমাদের কাফেলা এগিয়ে চললো। ক্ষেতে কাজ করতে থাকা কৃষক থেকে জানা গেল গ্রামটির নাম গোকর্ণ-জেঠাগাঁও। আব্বার চেহারাটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমার হাত ছাড়িয়ে নিলেন। হাত দিয়ে গ্রামটি আমাদের দেখালেন। এখানে জন্ম না হলেও এটি তার পৈত্রিক গ্রাম। দাদা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিয়ে করে সেখানেই ঘরজামাই হয়েছিলেন। আব্বার সাথে এই গ্রামের সম্পর্ক ছিল খুবই কম। হাঁটতে হাঁটতে তিনি আবার আমার হাতটি ধরলেন। এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না আমাকে। আমি যে কোন সময় হাতছাড়া হয়ে চোখের আঁড়াল হয়ে যেতে পারি!

দুই হাতের সংযোগ দিয়ে এখন আমার যুদ্ধে না যাওয়ার আব্বার যুক্তি শুনতে শুনতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে তাঁর যুক্তিকে মেনেও নিচ্ছিলাম।

এভাবে কত ঘণ্টা ধরে হাঁটছিলাম জানি না। কারো কোন অভিযোগ ছিল না। ইদানীং আমার বাম পায়ের তালুতে ব্যথা শুরু হয়েছে। তিনমাসে পাঁচ জোড়া জুতা বদল করেও কোন উন্নতি টের পাচ্ছি না। আমার বয়স আজ সত্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রূত। সেই বয়সে আমার শারীরিক সক্ষমতা কেমন হবে তা ভেবে সন্দিগ্ধ হই।

অথচ একাত্তরের সেই এপ্রিলে আব্বার বয়স ছিল একাত্তর বছর। এর আগে অনেকবারই তিনি অসুস্থ এবং দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তা আমরা ভাইবোনেরা সবাই জানি। কিন্তু গুণ্যক যাওয়ার দীর্ঘ ও দুর্গম পথটি তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন কোন অভিযোগ বা অনুযোগ ছাড়াই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস জুড়ে সারা বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধবনিতা সবাইকেই এভাবে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাযাবরের মত ঘুরতে হয়েছিল। প্রত্যেকে নিজেকে নিয়ে নিজে ব্যস্ত ছিল। তাই সেদিন এবং এতোদিন ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি একাত্তর বছর বয়সে আব্বা কীভাবে আমাদের সাথে এতোটা পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধই সবাইকে সেই শক্তি জুগিয়েছিল। কিন্তু আজ বয়সজনিত কারণে নিজের স্বাস্থটি কেমন হবে ভাবতে গিয়ে একাত্তরে আব্বার শারীরিক ও মানষিক অনুভুতি কেমন হয়েছিল তার ভাবনা আমাকে পেয়ে বসেছে।

আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান গবেষণায় ‘প্যারাবায়োসিস’ নল-লাগানো পদ্ধতিতে একই প্রজাতির দুটো প্রাণির দেহে প্রবাহিত রক্তের সংযোগ ঘটানো হয়। পরীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে যে এভাবে প্রবাহিত যুবকের রক্ত বৃদ্ধের দেহে বার্ধক্য বিলুপ্ত করে যুবকসুলভ  জীবনীশক্তির যোগান দেয়।  সেদিন হাত ধরে চলতে গিয়ে আমার ও আব্বার দেহের রক্তের সংযোগ ঘটেনি ঠিকই, কিন্তু মনের ভাবের ও অনুভুতির যে আদানপ্রদান হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। আজ আমার দুই যুবক পুত্র যখন পাশে দাঁড়ায়, হাতে হাত রাখে, বা আলিঙ্গন করে, তখন তাদের সান্নিধ্য, তাদের উপস্থিতি, তাদের স্পর্শ আমার মনে সাহস জোগায়।

একাত্তরের সেই দিনটিতে আমার হাতটি শক্ত করে ধরে রেখে আব্বাও কি আমার যুবশক্তির তেজ তাঁর দেহে স্থানান্তর করতে চাইছিলেন? তাঁর বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা আয়ত্বে রেখেছিলেন?

সূর্যাস্তের পর আমরা গুণ্যক পৌঁছেছিলাম।

  • ৬ই জানুয়ারি, ২০১৭, ওয়াসিংটন ডিসি