Independence and National Day Reception-2019
April 17, 2019
মোঃ সাইফুর রহমান
September 2, 2019

নাদিরা সুলতানা নদী

ব্রহ্মপুত্রের মেয়ে’র ‘’জার্নি বাই ট্রেন’’!!!

‘’হোগলা’’ নামে যে গ্রামে থেকে আমার শৈশব শুরু, সেটি এখন নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলায় হলেও তখন ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ছোট একটা থানা। স্কুলে পড়া সেই সব দিনে অন্তত ২/৪ মাস পরপর আমাদের বাবা-মায়ের সাথে “বড় সেই শহর  ময়মনসিংহ’’ বেড়াতে যাওয়ার এক একটা স্বপ্ন-দিন আসতো আমাদের গ্রামীণ জীবনে ভীষণ ঘোর লাগা এক রোমাঞ্চ নিয়ে!!!

বেশীর ভাগ সময় আমরা পূর্বধলা থেকে দুপুরের ট্রেন ধরতাম। সেই ট্রেন এ উঠার আগেও ছিল রোমাঞ্চ, মাঝখানেও রোমাঞ্চ এবং বাড়ি ফেরার পরের অনেকগুলো দিন জুড়েও থাকতো ভালো লাগায় বুঁদ হয়ে থাকা অন্য রকম এক রোমাঞ্চকর সময়। যেদিন আমাদের শহরে যাওয়ার কথা থাকতো তার প্রায় বেশ কিছু দিন আগে থেকেই আম্মার বিশেষ প্রস্তুতি, কে কোন কাপড় পড়বে, সব আগে ভাগে ধুয়ে ইস্ত্রি করে আনা, কয় রাতের জন্যে যাওয়া তার উপর আমাদের মাল সামাল ঠিক করা ইত্যাদি ইত্যাদি।

হোগলা গ্রাম থেকে সেই পূর্বধলায় যেতেই লাগতো প্রায় ঘণ্টা। আগে থেকে বলে রাখা রিক্সায় উঠার আগে আমাদের ভালো সাবান দিয়ে গোসল দিয়ে সবচেয়ে ভালো জামা জুতা মোজা পড়িয়ে দেয়া হত। আর আম্মা আব্বা নিজেরা গুছিয়ে অন্য কিছু গোছানোর আগে আমরা পরিপাটি ভাই বোনেরা লাজুক লাজুক মুখে এদিক সেদিক দুই একটা ঘুরনি মেরে আসতাম। পাড়া পড়শিদের বলেও আসতাম আমরা শহরে যাচ্ছি। তারপর রিক্সায় যখন উঠতাম তখন ক্রমশঃই  রূপান্তরিত হওয়ার পালা স্বপ্নভূক হয়ে চেপে থাকা রাজ্যের সব সুখ উত্তেজনা চাপা দেয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা নিয়ে অতীব ব্যস্ত দুই চোখ দিয়ে প্রথম শহর পূর্বধলায় পৌঁছেই আমাদের বিস্ময়ের পালা শুরু হয়ে যেত। হাক ডাক দেয়া হকার দেখি, দূর দুরান্ত গ্রাম গ্রামান্তর থেকে আসা অন্য মানুষ দেখি। যা দেখি তা দেখেই লজ্জা পাই, আবার দেখি। এর মাঝেই হয়তো চুলের ক্লিপ একটু খসে যাওয়া বা পায়ের এক মোজা নীচে নেমে যাওয়ার মত ভয়াবহ ঘটনা… তাই নিয়ে আম্মার মৃদু মন্দ শাসানী, আম্মা বুঝিয়ে দিতেন শহর মানেই পরিপাটি গোছগাছ ভদ্রস্ত হয়ে থাকা!

আমরা তখন পথের পাঁচালীর বনে বাদাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে দূরের পোঁ ঝিক ঝিক ট্রেন দেখা ‘’অপু-দুর্গার’ মত কোন ভাই-বোন না, সত্যিকারের ট্রেন এ চড়া কোলাহলের মাঝে অনেক উত্তেজিত সুখী সুখী পিচ্চি ভাই-বোন। তখন ময়মনসিংহ থেকে যে ট্রেনটা আসতো পূর্বধলার পর লাস্ট স্টেশন জারিয়া জাঞ্ঝাইল হয়ে আবার সেই ট্রেনই ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা দিত। পূর্বধলা থেকে যারা ময়মনসিংহ যেত তাদের অনেকেই ট্রেন আসার সাথে সাথে উঠে যেত। টিকেট পূর্বধলা টু ময়মনসিংহ হলেও বিনা টিকেটে আমরা সেই অপরুপ সুন্দর জারিয়া জাঞ্ঝাইল স্টেশন এমনি এমনি ঘুরে আসতাম জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে। হোগলা’র মত সুন্দর একটা গ্রামের বাজারে বসবাস করলেও জারিয়া জাঞ্ঝাইল, পূর্বধলা, শ্যমগঞ্জ, গৌরীপুর, এই সব জায়গাগুলো পাড়ি দিতে দিতেই মনে হত আহা চারদিকে এত সুন্দর আর বিস্ময় আমাদের জন্যে ছড়িয়ে আছে কে জানতো, কে জানতো!!!

শম্ভুগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ শহরে ঢোকার কিছু আগেই ব্রহ্মপুত্র নদী (নদ), ব্রহ্মপুত্রের উপরের টানা সেতুর উপর যখন ট্রেনটা উঠতো জানালা দিয়ে নীচে পানিতে তাকিয়ে ভয় আর বিস্ময়ে কতদিন ভেবেছি হায় জানালা দিয়ে সেই পানিতে পড়ে গেলেই ‘’সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে-রে মন চলে যেতে হবে’’!!! সেই হাহাকার বুকে নিয়ে ট্রেন এর ভবঘুরে গায়ক ভিক্ষুকের গান শুনে নিজের অজান্তেই চোখও ভিজে যেত কত দিন!!!

ক্লাস এইটে উঠেই গ্রাম ছেড়ে ময়মনসিংহ চলে আসি। শুরু হয় হোগলা টু ময়মনসিংহ নিয়মিত যাওয়া আসা। কলেজ এ উঠে মাঝে মাঝেই একা একা যাওয়া আসা শুরু করি, কখনও কখনও কাজিন বা কলেজের দুই/একজন বান্ধবীকে নিয়েও গেছি। ময়মনসিংহ থেকে পূর্বধলা কত শতবার সেই ট্রেন এ, কত শত ছেলেদের পিছু লাগা, কত শত অম্ল মধুর স্মৃতি, অভিজ্ঞতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সুযোগ পাওয়াটা ছিল আমার জীবন ধারা বদলে যাওয়ার সুচনা। একদম শুরুতে মামাদের কেউ না কেউ এসে আমাকে ঢাকা রেখে যেতেন। বাস জার্নি করতে পারতাম না, মাথা ঘুরানো সংক্রান্ত ঝামেলা শুরু হতো, তাই নিতান্ত বাধ্য না হলে ট্রেনই ছিল আমার চলাচল মাধ্যম। হল জীবন শুরু হলো, বান্ধবী পেলাম, এরপর চেষ্টা থাকতো হলের সব পরিচিত বান্ধবীদের এক সাথে যাওয়া আসা করা। যদিও আমার সব সময় সেটা হয়ে উঠতোনা।  নানান কিছুতে যুক্ত থাকায় সেকেন্ড ইয়ার থেকে অনেক সময় দেখা যেত ছুটিতে এক সাথে ময়মনসিংহ গেলেও আসতে হত সবার আগেই। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা ট্রেন এ একা আসার দিনগুলো আজকাল এই পরবাস জীবনে ট্রেনে করে যখন কাজে যাওয়া আসা করি, খুব মনে পড়ে। স্মৃতির মিছিলে সাঁতরে বেড়াই, কুল কিনারা পাইনা যদিও, আজ সেই সব অনুভূতির কিছুটা কলমে তুলে আনার চেষ্টায় বসলাম।

বড় হওয়ার সাথে সাথে বেশীর ভাগ সময় আমি যে অদ্ভূত সমস্যাটায় ভুগেছি, সেটা হচ্ছে আমার বয়েস যা তার থেকে কম দেখানো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, অথচ দেখায় স্কুল পড়ুয়া বালিকা’র মত। একা কোথাও রওনা দেয়ার আগে তাই সব সময় চেষ্টা থাকতো আমাকে যেন একটু বড় বড় দেখায়। ময়মনসিংহ থেকে বেশীর ভাগ সময় খুব ভোরের ট্রেন এ ঢাকা রওনা দিতাম। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ভ্রমণ যতটা আনন্দদায়ক ছিল, অবশ্যই ফেরাটা তা ছিলনা। বাসার সব ছেড়ে আসার একটা কষ্ট নিয়ে কাক ডাকা ভোরে রওনা দিতাম। বাসা থেকে বেশীর ভাগ সময় আম্মা বা অন্য কেউ স্টেশন পর্যন্ত সঙ্গ দিতে আসত। আগে থেকে কেটে রাখা টিকেট নিয়ে স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকা পুরো সময়টাই একটু বিমর্ষ কাটতো। কথা খুঁজে পেতামনা, আম্মা উপদেশ দিতেন, আমি শুনতাম। গলায় একটা কান্না জমে থাকতো!!!

তারপর ট্রেন আসছে এই ঘোষণার সাথে সাথে দেখা যেত অন্য উত্তেজনা, টেনশন থাকতো সহযাত্রী কেমন হবে, পাশে যে বসবে সে কেমন হবে। ট্রেনে উঠেই কোন রকমে ব্যাগ রেখে জানালায় বসে অপেক্ষমাণ স্বজনের মুখে চেয়ে থাকা, ছেড়ে যাওয়ার ভীষণ এক কষ্ট বুকে নিয়ে কান্না লুকানোর চেষ্টা করতে করতেই চোখের সামনে সব ঝাপসা। একটু ধাতস্ত হয়েই চারদিক চোখ বুলিয়ে দেখে নিতাম নিরাপদ এবং অনিরাপদ মুখগুলি। ততদিনে এই ময়মনসিংহ টু ঢাকা ভ্রমণকে কাংখিত ও মনে রাখার মত করার জন্যে যা যা করণীয় তার প্রায় সবই রপ্ত করে নিয়েছিলাম। পুরো সময়টাতে ভালো লাগবে প্রিয় কোন লেখকের বই, সিনেমা পত্রিকা, আর চা তো ছিলই, ট্রেন এ বসে বাইরের প্রকৃতি দেখা আর হাতে গরম চা এটা একটা স্বর্গীয় আনন্দ। তবে হে এতদিনে বলতে একটুও দ্বিধা নাই মাঝে মাঝেই মনে হত বইতে পড়া বিশেষ করে সেবা ক্লাসিক বা রোমান্টিকে’র কোন নায়কের মত কারও সাথে বুঝি এই রকম কোন এক ট্রেন যাত্রাতেই দেখা হয়ে যাবে একদিন। কিন্তু বিশ্ববিদ্দালয় জীবনের প্রায় ৬ বছরের সেই ট্রেন যাত্রায় কাংখিত সেই স্বপ্ন পুরুষ আর কোন উপন্যাস থেকে অন্তত আমার জন্যে বাস্তব হয়ে নেমে এলোনা এই ধরনীর বুকে। কত শত রকমের মানুষের সাথে যে দেখা হত, তার মাঝে তেমন কোন যুবকের সাথে যে দেখা হতো না, ঠিক তা না।

দেখা হতো, তবে তার আগে একবার এস এস সি পরীক্ষার পর আম্মাকে নিয়ে ঢাকা বড় খালার বাসা থেকে ফিরছি, ট্রেনে আমাদের সামনেই এক অতীব লাজুক ছেলে তার বড় বোন আর বোধ হয় একটা ভাগ্নে বা ভাগ্নিকে নিয়ে গফরগাঁও আসছে। সব কিছুতেই সেই ছেলের কেমন রহস্যময় হাসি, বড় বোন’কে ঘিরে অসম্ভব কেয়ারিং। প্রতি মুহূর্তে বোনের কি লাগবে সেকি খেয়াল। আমরা মা-মেয়ে দুজনেই মুগ্ধ, তবে এর মাঝেই অন্য এক দুর্ঘটনা, আম্মা কোন এক স্টেশনে জানালা দিয়ে মুখ একটু বাইরে দিয়েছে আর অমনি অন্য কোন কামড়া থেকে জলন্ত সিগরেটের ছাই এসে চোখে লেগে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। আমাদের পুরো কামড়া জুড়ে সেকি উত্তেজনা, কে সেই নরাধম কিছু লোক তাকে খুঁজতে চলে গেল। আমার মায়ের জন্যে সেই হাসিখুশি যুবকের কর্ম তৎপরতা তখন দেখার মত।

তবে হায় যেতে নাহি দেব তবু যেতে দিতে হয়, গফরগাঁও স্টেশনে যখন ওই ভাই বোন নেমে গেল, আমার হঠাতই মনে হল কি যেন হারিয়ে ফেলছি। আর ওই হাসিখুশী যুবক চোখের সামনে কেমন করে বদলে গেল, ট্রেন না ছাড়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলো এবং অনেক কষ্ট করেও আর হাসতেই পারলনা বেচারা। তখন না ছিল মোবাইল না ছিল ফেসবুক তাই হারিয়েই গেল স্বপ্নের মত রহস্য হাসির সেই মানুষ  …তবে এতকাল পর আমি শিউর না যুবকের করুণ চাহনি সেটা মা না মেয়ের জন্যে!!! কারন আমার মা তখন দুর্দান্ত এক তরুণী!!!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অসংখ্যবার সেই সব ট্রেন যাত্রার প্রায় প্রতিটাই এক একটা গল্পগাঁথা। আজ প্রায় এক যুগেরও বেশী সময় পর লিখতে বসে ক্ষণিক দেখা মনে গেঁথে থাকা চিরদিনের জন্যে হারিয়ে ফেলা কত মুখ আবছা করে মনে পড়ছে। এক ভদ্রমহিলা ঢাকা ছেলের বাসা থেকে ফিরছিলেন ঢাকা ময়মনসিংহের মাঝেই “ক” দিয়ে কি যেন জায়গাটার নাম মনে করতে পারছি না ওখানে থাকেন, আমাকে অল্প কিছু সময়েই এমন আপন করে নিয়েছিলেন, দুজনে এটা সেটা খাই গল্প করি, পান খাই এর মাঝেই উনার গন্তব্য চলে আসে।

আরেকদিন আরেক মধ্যবয়স্ক লোক ‘’মাধুকরী’’ পড়তে পড়তে ময়মনসিংহ ফিরছিলেন। আমি বই পছন্দ করি শুনে বলেছিলেন আমি যেন উনার সাথে যোগাযোগ করি। পুরো সময়টা বই নিয়ে কথা বলতে বলতেই চলে আসা। কিন্তু আমি কোন কারন ছাড়াই আর কোনদিন যোগাযোগ করিনি, করা হয়ে উঠেনি।

ঢাকা থেকে বেশীর ভাগ সময় বিকেলের ট্রেনেই ময়মনসিংহ আসতাম। আরেকবার একাই আসছি, নিজ টিকেট বগি নাম্বার মিলিয়ে আগে ভাগেই উঠে বসলাম। ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার পাশের সীট ফাঁকা দেখে ভিতর ভিতর বেশ খুশীই হই, কেউ না থাকা মানে পাশে কিছু একটা রেখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা। একবারে শেষ মুহূর্তে সিনেমার নায়কের মত হন্ত দন্ত হয়ে এক যুবকের আবির্ভাব। টেরা চোখে দেখে নিয়ে চোখের সামনে বই মেলে ধরে আলগা ভাব নিয়ে নিই আগে ভাগেই। ট্রেন চলতে শুরু করার একটু পরই  বুঝতে পারি এ নায়ক না হলেও নায়কের বন্ধু। কথা ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারেনা। একটা চিরুনি হবে কিনা, চুল আঁচড়াতে না পেরে তার নাকি খুবই খারাপ অবস্থা।

আমি কি পড়ছি, ট্রেন এ কেন পড়ছি, কেন তার সাথে কথা বলছিনা, সিনেমা দেখি কিনা, বাংলাদেশের কোন নায়ক নায়িকা প্রিয় ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন আমাদের হার্ট থ্রুব ‘’সালমান শাহ্‌’র রাজত্ব চলছে, সেই আমার প্রিয় এই কথা শুনে আর যায় কই, জানলাম সে সালমানেরই বন্ধু, সিনেমাতেই কাজ করছে। যত দূর মনে পড়ে রবিন না কি যেন ছিল নাম যুবকের, ঢাকা ফিরলেই রোকেয়া হল গেইটে আসবে একদিন দেখা করতে সেটাও জানালো। আমি কি এক অদ্ভুত কারনে ভুল রুম নাম্বার দিলাম এবং আর যোগাযোগ হলোনা, যদিও পরে একদিন টিএসসিতে দেখা হয়েছিল।

ট্রেনে আমার বয়েসী এক দুজন অন্য কলেজে পড়া মেয়ের সাথেও দেখা হয়েছিল বেশ বার কয়েক। এই ট্রেনেই আরেকবার দেখা হয় দেওয়ান গঞ্জের একটা ছেলে, ছেলেটার নাম ছিল বোধ হয় কাজল। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ আসছি, সব সময়ই যেটা হত একা ফিরছি এটা কিছু না কিছু মানুষের সব সময়ই কৌতুহলের বিষয় হয়ে দাঁড়াত, আমার লাগুক আর না লাগুক অযাচিত উপকার বা যত রকম ভাবে ডিস্টার্ব করা যায় তা করার অপচেষ্টা। সেই বার কি কারনে যেন ভীষণ ভিড় ট্রেন এ, প্রচুর দাঁড়িয়ে যাওয়া লোক। এর আগে একবার এস্তেমার সময়ের ভিড়ে ময়মনসিংহ থেকে ফেরার সময় এত বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, নিজের সীটে তো ভিড় ঠেলে যেতেই পারলামনা। কোন রকম উঠে একটা জানালার পাশে চালের বস্তায় বসে নাক চোখ বুঞ্জে ঢাকা ফিরছি এবং এক সময় ক্লান্তি অবসাদে আনমনে সামনে বসা অন্য এক ভদ্রলোকের পায়ের আঙ্গুল ধরে বসে ছিলাম ভুলে কিছু সময়, হঠাত টের পেয়ে লজ্জায় মরে যাওয়ার মত অবস্থা আমার তখন ।

আবার সেই ভিড় দেখে সেই দুশ্চিন্তার মাঝে ডুবে যাওয়ার আগেই এবার আমাকে সাহায্য করার জন্যে পাশে পাই কাজল নামের সেই ছেলেটাকে। ট্রেনে দেখা আপাদমস্তক ভদ্র আরো একটা ছেলে।

ট্রেন এ সবচেয়ে মজার জার্নি ছিল ঈদের বা লম্বা ছুটিতে বাড়ি ফেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্দালয়ের বিভিন্ন হলে থাকা আমরা সব মিলে কোন কোন সময় প্রায় ১৫/২০ জনের বিশাল দলে ময়মনসিংহ ফিরতাম। সীট এক সাথে না হলেও আমরা চার বন্ধু আমি নাসরীন মায়া সাথী প্রায় সময় এক সাথেই বসতাম। আর জার্নির পুরোটা সময় কারণে অকারণে হা হা হি হি তো  চলতই সময় কাটানোর জন্যে আমরা আগেই ঠিক করে রাখতাম আর কি কি করবো এই জার্নিতে। আর সবচেয়ে মজা লাগত আমাদের কামড়ায় থাকা তাবত ছেলে ছোকরাদের মাঝে আমার অপরুপ সুন্দর বান্ধবীদের ঘিরে এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য দেখে। দেখা যেত তারা সবাই অতীব ব্যস্ত, বারবার এক কামড়া থেকে অন্য কামড়ায় ‘’শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা’’ এমন একটা অবস্থা আর কি।

আমাদের কাছাকাছি এসে কারো অকারণ কাশাকাশি। আর আমাদের যা না ভাব তার থেকে চেহারায় আরো একটু বেশী বেশী ভাব নিয়ে নিতাম যেন কেউ কোন চান্স নিতে না পারে!!! তখন পর্যন্ত আমাদের মাথায় ছিল আমরা যতটা শালীন (!) হয়ে চলবো তার চেয়ে বেশীটুকু চেহারায় যেন ফুটে উঠে। আমরা কাউকে পাত্তা দেইনা এই ভাবই ছিল তখন পর্যন্ত আমাদের চলার পথে মুল মন্ত্র।

এবং একা চলতে গিয়ে আরো কত রকম মন্ত্র যে নিজে নিজেই শিখে নিয়েছিলাম। যখন থেকে একা ঢাকা ফিরতাম, ট্রেন জার্নিটা কোন না কোন ভাবে পার করে দিলেও সব সময় সমস্যা হত কমলাপুর রেল স্টেশনে নেমে। বারো রকমের মানুষ এইটা ভুল প্রমান হয়ে যেত এই স্টেশনে নেমেই। সেই হল জীবনের পুরোটা সময় দেখা পেয়েছি ভয়ঙ্কর সব রকমের মানুষের। ট্রেন থেকে নামার একটু আগে থেকেই যে প্রস্তুতিটা নিতে হতো সেটা হচ্ছে নিরাপদ এক দুইটা আলাদা মানুষ বা পরিবার খুঁজে বের করা। কখনও তাদের বুঝতে দিয়ে বা কখনও তাদের বুঝতে না দিয়েই মিশে যেয়ে একটা হাঁটা দিতে হত, যেন আমরা একসাথেই এসেছি। আর যদি বাড়তি ব্যাগ টানার জন্যে কাউকে দরকার হতো সেটাও দেখে শুনে কোন কিশোর ছেলে বেছে নিতে হত। তরুন বা বয়স্ক মাল টানা লোক দিয়ে এমন সব অভিজ্ঞতা হয়েছিল দুই একবার, তারপরও দেখা যেত ট্রেন থেকে নামার আগেই খেটে খাওয়া সেই মানুষেরা অন্য রকম এক ব্ল্যাকমেইল শুরু করে দিত।

এরপর ভিড়ের মাঝে হাঁটতে যেয়েও দুই জোড়া চোখ সব সময় যথেষ্ট ছিলনা, ডান বাম পিছনের চোখ ভীষণ সচল রেখে দেখতে হতো অনাকাঙ্ক্ষিত কোন কালো হাত এসে কোনভাবে ছুঁয়ে যায় কিনা।

আর দুই একবারের কোন না কোন ঘটনায় ভীষণ অসহায় হয়েই দেখা যেত শুধু এই স্টেশনটুকু নিরাপদে পার হওয়ার  জন্যেই কাউকে না কাউকে ভাই মামা চাচা’র মত মনে করে তাকে নিয়ে বেবি ট্যাক্সি স্ট্যান্ড পর্যন্ত এসে আরো একটা ভাই-মামা বা চাচার মত নিরাপদ মানুষ খুঁজে বের করে তবেই হল গেইটে পোঁছাতাম।

এখনকার একলা চলা মেয়েরা নিশ্চয়ই অনেক সাহসী, আমার থেকে তো বটেই তবে মেয়েদের সেই আমার আমল থেকেই অন্য রকম সাহসী বা কৌশলী হতে হতো। আমি সাহসী যতটা না ছিলাম তার চেয়ে একটু বেশীই ছিলাম বিনয়ী। আর এই বিনয় বলা বাহুল্য সব সময় সবটুকু সুরক্ষার জন্যে যথেষ্ট ছিলনা। তাই অনেক বারই প্রিয় প্রিয় সেই সব ট্রেন জার্নি স্টেশনে নেমেই ঝড়ের মত কোন দমকা হাওয়ায় তিতকুটে হয়ে যেত, সেই সব গল্প আজ তবে নাই বলি।

শুধু আরো একবার বলি আমার মন আজও হারায় সেই ঢাকা টু ময়ময়সিংহ ট্রেনে করে ‘পোঁ ঝিক ঝিক পোঁ ঝিক ঝিক শব্দের খোঁজে!!!

 

// নাদিরা সুলতানা নদী

কলামিস্ট, সহযোগী সম্পাদক, প্রশান্তিকা

প্রাক্তন ছাত্রনেতা/ সংস্কৃতিকর্মী

উপস্থাপিকা, রেডিও বাংলা মেলবোর্ন

মেলবোর্ন, ভিক্টোরিয়া,অস্ট্রেলিয়া

……………………………………….