অরণ্যযজ্ঞ // মুহাম্মাদ তালুত
May 2, 2018
প্রথম দর্শনে প্রেম // মো. জিয়াউল হক
May 2, 2018

দূরত্বের দুর্বিপাক // মায়মুনা লীনা

শহরে নিজের বাড়ি না থাকা মানে যাযাবর জীবন। আজ এখানে তো কাল ওখানে। প্রয়োজনের টান যখন যেখানে, সেখানেই থাকা। আমাদের এ বাসায় আসার দু’মাস হতে চললো কেবল। ভালোভাবে এখানকার সবার সাথে পরিচয়ও হয়ে উঠেনি বলতে গেলে। সিকিউরিটি গার্ড, কেয়ারটেকার মিলিয়ে ওরা তিনজন থাকে। প্রয়োজনের খাতিরে ওদেরকে চিনতে হয় তাই চিনি। দরকারে কিছু কথা বলতে হয়, তাই বলি। তিনজনই বেশ ভদ্র, মার্জিত। এদের মধ্যে বেশ লম্বা একজন সিকিউরিটি গার্ড আছে। শ্যামলা গায়ের বরণ, গোলগাল চেহারা, মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল। এসব অবশ্য আজকেই দেখলাম। আগে কখনো খেয়াল করিনি। কখনো ভালো করে চেহারার দিকে তাকিয়েছি বলেও মনে পড়ে না। বাসায় ঢুকতে বের হতে সালাম দেয়। না তাকিয়েই সালামের জবাবটা দিয়ে গদগদ ভাব নিয়ে নিজের কাজে চলে যাই। কখনো হাতে ব্যাগ ট্যাগ থাকলে হাত থেকে নিয়ে বা রিকশা থেকে নামিয়ে লিফটে তুলে দেয়। দু’হাত আটক দেখলে লিফটের বাটনও প্রেস করে দেয়। এ পর্যন্তই। নামও জানতে চাইনি কখনো। দরকার হয়নি তাই। আমার ছেলের মুখে শুনেছি এর নাম রাব্বি। ফজলে রাব্বি। আমি নিশ্চিত না যদিও। তবুও রাব্বিই বলি। আমাদের বাসায় তিনটা বাচ্চা। আমার ছেলে আলোক আর ওর দুই চাচাতো বোন রিহা, নূহা। রিহার বয়স দু’বছর চার মাস। একটু বেশিই চঞ্চল। সবার সাথে মিশে খুব। মাঝেমাঝে বাসায় বেশি কান্নাকাটি বা বিরক্ত করলে নিচে পাঠিয়ে দিই। গ্যারেজে গিয়ে খেলে ওদের সাথে। দারোয়ান, কেয়ারটেকার সবাই খুব আদর করে। কোলে নিয়ে ঘুরে। চিপস, চকলেট, এটা সেটা কিনে দেয়। যদিও আমি বারণ করে দিয়েছি এগুলা দিতে। শুনে না। টাকা দিতে চাইলেও নেয় না। ইদানিং দেখি রিহা রাব্বিকে দেখলে কোলে উঠার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। চেয়ারে বসা থাকলে আঙুল ধরে টেনে তুলে কোলে নিয়ে হাঁটতে বলে। একবার তার কাছে গেলে সহজে আসতে চায় না। আজকেও বাইরে থেকে ফেরার সময় রাব্বির কাছে রয়ে গেছে। কোনোভাবেই বাসায় আনতে পারছিলাম না। অনেকক্ষণ পরে রাব্বি নিজেই ওকে কোলে নিয়ে উপরে এসেছে। তাও বাসায় ঢুকতে চায় না মেয়ে। জোর করে নিয়ে আসায় সে কী কান্না! একেবারে ফ্লোরে গড়াগড়ি করে কান্না। তখন কী এক কথার উপর এক পর্যায়ে রাব্বি বললো আগামী এক তারিখে বাড়ি চলে যাবে। যাবে মানে একেবারেই যাবে। চাকরি ছেড়ে চলে যাবে। এটা শুনার পর এই প্রথমবার মনে হয় আমি সরাসরি তার দিকে তাকিয়েছিলাম, একটুখানি। কেন জানি খুব মায়া লাগলো। এরপর যে আসবে সেতো এর মতো ভালো নাও হতে পারে। চেনা মানুষ চিরতরে দূরে চলে যাবে ভাবলেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে যেন। সে যেই হোক। ঝর্না নামে একটা মেয়ে আমাদের বাসায় প্রায় সাত বছর ছিল। ‘কাজের মেয়ে’ হিসেবে। একটা সময়ে মেয়েটার বাবা মা বিয়ে দিয়ে দিবে বলে ওকে নিয়ে গেলো। মেয়েটা চলে যাওয়ার পরে ওর জন্য আমি কতদিন যে কেঁদেছি! রান্নাঘরে ঢুকলে ওর গুছিয়ে রাখা জিনিসে খুব দরকার না হলে হাত দিতাম না আমি। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম আর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠতো। হায় বিধাতা, কী দরকার ছিলো আমার মনটা এমন নরম কাদামাটি দিয়ে গড়ার!! রাব্বিকে জিজ্ঞেস করলাম, – বাড়ি কোথায়? – নীলফামারী। – ওখানে কি কোনো কাজ টাজ ঠিক করা হয়েছে? না কি ব্যাবসার ব্যবস্থা? – না ম্যাম, ওসব কিছু না। গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করবো। – তাহলে এই চাকরি ছেড়ে দেয়ার কারণ কী? কোনো সমস্যা হচ্ছে এখানে? – বাড়িতে রিহার মতো একটা মেয়ে আছে আমার। দু’বছর তিনমাস বয়স। এটুকু বলার সময় চোখের মধ্যে পিতৃস্নেহ জ্বলজ্বল করে উঠছিল তার। আমার মাথা নিচু হয়ে গেছে আপনা থেকে। মুখে বলতে পারিনি ‘বাবা, তোমাকে স্যালুট’… একটা গল্প মনে পড়ছিল তখন- বাবা ইরানে থাকতেন একসময়। প্রতিদিন বিকেল হলে অফিসের কাছের পোস্ট অফিসের সামনের মাঠের পাশে গিয়ে বসে থাকতেন। পোস্ট অফিস কলোনির অনেক বাচ্চা খেলা করতো সেই মাঠে। বাবা বসে বসে বাচ্চাদের হৈ-হুল্লোড় দেখতেন, বাচ্চাদের সাথে মজা করতেন, বাচ্চাদের সাথে খেলতেনও মাঝেমাঝে। শুধু কোলে নিতেন না। বিদেশ বিভূঁইয়ে অন্য কারো বাচ্চা কোলে নিয়ে যদি কোনো কথা শুনতে হয়, এই ভয়ে। এক বিকেলে এরকম মাঠের পাশে বসে বাচ্চাদের ছুটোছুটি দেখছিলেন। মনটা বিষন্নতায় আগাগোড়া ছেয়ে ছিলো সেদিন। নিজের ছেলেমেয়েদের কথা মনে পড়ছিল খুব। মনটা তখন কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের এক ছোট্ট গ্রামে উড়ে চলে গিয়েছে। যেখানে উঠোনের ঘাসে বসে খেলা করছিল বাবার তিন বছর বয়সের ছেলেটা। তিন মেয়ের পরে একটামাত্র ছেলে। অনেক বেশি আদরের। বাবার চোখ ছলছল করে উঠছিলো। পোস্ট অফিসের একজন কর্মকর্তা প্রায়ই বাবার বসে থাকা লক্ষ্য করতেন। সেদিন বাবার বিষন্নতা লক্ষ্য করেই হয়তো সেই অফিসার এগিয়ে এলেন। কাছে এসে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, – দেশ কোথায় তোমার? – বাংলাদেশ – ছোট বাচ্চা আছে ওখানে তোমার? – জ্বি, তিন বছরের একটা ছেলে আছে। আর দুই মেয়ে। এক মেয়ে দেড় বছর বয়সে মারা গেছে। কলেরায়। ভদ্রলোক ঘরে ফিরে গেলেন। একটু পরে নিজের প্রায় তিন বছর বয়সী ছেলেকে কোলে নিয়ে বাবার সামনে এসে বাড়িয়ে ধরে বললেন, – নাও, একে বুকে নিয়ে রাখো। বুকটাকে ঠান্ডা কর ইয়ং ম্যান। কেন যে তোমরা সামান্য ক’টা বেশি পয়সার জন্য আদরের সন্তান, পরিবার, পরিজন রেখে বিদেশে এসে পড়ে থাকো! দেশে ফিরে যাও ইয়ং ম্যান। কয়টা ভাত কম খাও তবুও মায়া মমতা নিয়ে বাঁচতে তো পারবে। সেই অফিসারের কথায় হোক বা অন্য যে কারনেই হোক বাবা তার কিছুদিন পরেই ইরানি আর্মির চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। আর যান নি। আগের চাকরিতেই আবার যোগ দিয়েছিলেন, দেশে থাকতে যেটা করতেন। কাছে থেকে আদরে শাসনে সন্তানদের মানুষ করে তুলেছেন। এখন বুকে হাত দিয়ে গর্ব করতে পারেন যে তার প্রত্যেক সন্তান ‘সৎ মানুষ’ হয়েছে। টাকা-পয়সা নয়, এই সততাটুকু নিয়ে যেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটাতে পারেন এটাই একমাত্র চাওয়া বাবার এখন। নিজের জন্য এবং সন্তানদের জন্যও। বাবার সেদিনের সেই তিন বছরের ছেলেটিও এখন পরিবার, পরিজন, আদরের সন্তানকে ফেলে অনেক দূরে থাকে। জীবন-জীবিকার তাগিদ কিংবা ভাগ্যের নির্মম পরিহাস… যাই বলি, যে কোনো দূরত্বই পীড়াদায়ক। সন্তানের জীবনে বাবার শূণ্যতা কখনো, কোনো কিছু দিয়েই পূরণীয় নয়। কাছে থাকুক সব বাবারা। আদরে শাসনে বাবার বুকের পাঁজরে থেকে বেড়ে উঠুক জগতের সব সন্তানেরা।

___________________________________

ঢাকা