সরো অবাক, ভেবে পায়না সে; চোস্ত ইংরেজি বুঝে স্যার, অশ্রু বোঝেনা ক্যা? // সফিকুল ইসলাম
May 2, 2018
শইীদ বোনের কথা // সাঈদা নাঈম
May 2, 2018

জলের উপর তৈরি জলের বৃত্ত // সনতোষ বড়ুয়া

শ্যমলী অপরাজিতা নতুন বন্ধু হয়েছে শ্রাবনের। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে অপরাজিতাই। শ্রাবণ সব রিকোয়েস্ট কনফার্ম করে না,শুরুতে প্রোফাইল দেখে, কমন ফ্রেন্ড আছে কিনা দেখে, তারপর ভাল মনে হলে কনফার্ম করে। ইদানীং ফেসবুকে ভুয়া নামে লোকজনের আনাগোনা বেশি, তাই সতর্ক হতেই হয়।অন্যের দোষ খুঁজে লাভ কি, তার নিজেরই তো একাউনট দুইটি। শ্রাবন তার আসল নাম নয়, মজা করার জন্যই এনামে একাউনট খোলা। তাও শ্রাবন সাবধানে থাকে তালিকায় বন্ধু সংযুক্ত করার বেলায়।

শ্যামলী অপরাজিতা মেয়েটিকে ফেক মনে হয়নি তার। যদিও আসল নাম কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। নিজের নাম ব্যবহার না করলেও ছবি ব্যবহার করেছে অনেক। যারা ফেক আই ডি তে ফেক ছবি ব্যবহার করে তারা বেশি ছবি ব্যবহার করে না।  অপরাজিতা প্রোফাইলে যে ছবি ব্যবহার করেছে সেই ছবিরসাথে পড়ে আপলোড করা অনেক ছবিরই মিল আছে। এতেও শ্রাবন বুঝতে পারে মেয়েটা ফেক নয়। প্রোফাইল ছবিতে দেখা যায়, মাথায় কোঁকড়ানো চুল, মুখাকৃতি গোলাকার, কপালে পড়ে আছে লাল টিপ। মুখাবয়বে একটু হাসি হাসি ভাব রাখার চেষ্টাও করেছে। এছাড়া এলবামেও কিছু ছবি আছে, তবে অনেকনয়, মেয়েরা যেভাবে বেশি বেশি ছবি দেয় সেরকম নয়। হতে পারে বেশি ছবি দেয়া হয়তো তার পছন্দ নয়। সব মেয়ে কি আর এক রকম হয়?

শ্রাবণেরও কিছু মাথায় ঢুকলে আর বের হয় না, ঘুরপাক খায় অনেকদিন। এখন ঘুরপাক খাচ্ছে অপরাজিতা শ্যামলী। কেন এক অপরিচিত মেয়ে তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল? কেন মেয়েটি তাকে পছন্দ করল। সে নিজে নিজেই কিছু কারন মিলিয়ে দেখতে চেষ্টা করে। মেয়েটি কী কবিতা ভালবাসে? হতে পারে।কারন, শ্রাবণ মাঝে মাঝে ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করে। ভালবাসতে পারে ছবিও, প্রকৃতির ছবি। মনের মত ছবি তুলে সে তাও পোস্ট করে মাঝে মাঝে।  হতে পারে কবিতা, হতে পারে ছবি, যে কোন একটি বা কবিতা–ছবি দুইই মেয়েটির প্রিয় হতে পারে। না হলে সে কেন একজন অপরিচিত ছেলের ফেসবুক ফ্রেন্ডহতে চাইবে? শ্রাবণ অপরাজিতাকে কনফার্ম করার পর অপরাজিতার টাইম লাইন দেখেছে , সেখানে অবশ্য মেয়েটির কবিতা বা প্রকৃতির ভালবাসার মত কোন পোস্ট খুঁজে পায়নি সে। এমনও হতে পারে – সে হয়তো নিজে কবিতা লিখে না, ছবিও তুলতে পারে না, কিন্তু ভালবাসে। যাক ভবিষ্যতেই দেখা যাবে কারকি পছন্দ।

সকাল থেকে আকাশে মেঘ জমেছে। বর্ষার জলবতী মেঘের আনাগোনা বেড়েছে শ্রাবনের ঘুম ভাঙার আগে থেকেই। তাই ঘুম ভাঙতেই শ্রাবণ জানালা দিয়ে দেখতে পেল আকাশ ভর্তি মেঘ। ভীষণ ভাল লাগছে তার। প্রত্যেকদিনের ভোর তাঁর খুবই প্রিয়। ভোরে ঘুম ভাঙলে সে হাঁটতে বের হয়ে যায়, কিছুদূর হেঁটেতারপর বাড়ি ফেরে। একেকদিন একেক দিকে যায়। নতুন পথ আর কত পাওয়া যেতে পারে? তারপরও চেষ্টা করে একটু এদিক ওদিক। হাঁটার পথ যতই তার এক হোক না, কিন্তু ভাল লাগা  নিত্য অন্যরকম। একদিনের সাথে অন্যদিনের মেলে না। প্রত্যেকদিনের ভোর যেন অন্যরকম। রাতে ঘুমোতে যাবারসময় যে পৃথিবী রেখে শ্রাবণ  ঘুমায়, সকালে জেগে সে আর সেই পৃথিবী  দেখে না, দেখে অন্য পৃথিবী। এসব শুধু যে ভাল লাগে তাই নয়, আশ্চর্যও লাগে । এখন ঘরে ঢুকছে ঝির ঝিরে হাওয়া। একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা, বেশ ভালই লাগছে।

বৃষ্টি শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। বাতাস শীতল হয়ে আসছে দ্রুত। হতে পারে কাছে কোথাও বৃষ্টি শুরুই হয়ে গেছে। বাতাসের ভেজা স্পর্শ টের পাওয়া যাচ্ছে। শ্রাবণ আই ফোনটা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। বাড়ির পশ্চিম পাশে পুকুর পাড়ে পৌঁছে উপরে তাকালে বিশাল আকাশ দেখা যায়, এখানেআকাশ যেন একটু বিশাল। খোলা জায়গায় আকাশ তো বিশাল হবেই। জটপট তুলে নিল আকাশের কয়েকটা ছবি। আই ফোনে খুব ভাল ছবি তোলা যায়। মেঘে ভেজা আকাশের ছবি চমৎকার হয়েছে। পোস্ট করার লোভ সামলাতে না পেরে সাথে সাথেই পোস্ট দিয়ে দিল ফেসবুকে। ছবির নাম দেয়া হল ‘ গগনেগরজে মেঘ’। কিন্তু এ নাম তো তার দেয়া নয়, রবি ঠাকুরের কাছ থেকে ধার করা। ধার করা হোক আর যাই হোক এ নামটাই তার পছন্দ।

এখন দুয়েক ফোটা বৃষ্টি পড়ছে। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে শ্রাবন দেখছে পুকুরের পানিতে বৃষ্টির তৈরি জলের বৃত্ত। ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টির এ দৃশ্য তার প্রিয়। এখনো প্রিয়। বৃষ্টি হলেই সে জলের উপর জলের বৃত্ত তৈরি দেখতে থাকে। শুধু বৃত্ত দেখলে তো হবে না, সাথে সাথে তুলে ফেলে কয়েকটি ছবিও। আবার সাথেসাথে পোস্ট। এ ছবির নাম দেয়া হল ‘ জলের উপর তৈরি জলের বৃত্ত’। বৃষ্টি একটু একটু বাড়ছে , ভিজে যাচ্ছে মাথার চুল। ভাল লাগছে তারপরও।

বেশি ভেজা ঠিক হবে না। বৃষ্টি একটু বাড়তে থাকলে ঘরের পথে পা বাড়ায় শ্রাবন। এসময় ফোনে বেজে উঠল এলারট  টোন। ফোন হাতে নিয়ে দেখে প্রথম লাইক দিয়েছে অপরাজিতা শ্যামলী। একই সাথে ইনবক্সেও এসেছে ম্যাসেজ। শ্রাবন দ্রুত হেঁটে ঘরে চলে আসে। বৃষ্টির মধ্যে বেশি ফোন দেখলে পানি ঢুকেযেতে পারে। পানি ঢুকলে  তো ফোনই শেষ, ছবি তুলবে কি আর।

ঘরের ভেতরে একটু অন্ধকার। তবে আলো জ্বালানোর দরকার নাই। আলো জ্বালালেলে তো বৃষ্টি দেখার আনন্দই শেষ। এখন বৃষ্টি নয়, ইনবক্সে ম্যাসেজ দেখাই জরুরী। অপরাজিতা হল নতুন বন্ধু, তার গুরুত্ব একটু বেশি তো হতেই পারে!

অপরাজিতা ইনবক্সে  লিখেছে–আপনি দারুন ছবি তুলতে পারেন তো! শ্রাবন উত্তরে লিখল

–ধন্যবাদ

– আপনার ওখানে কি বৃষ্টি হছে?

– হ্যাঁ, তেমন বেশি না। শুরু হয়েছে মাত্র।

– আপনার কি বৃষ্টির দিন খুব ভাল লাগে?

– ভীষণ। ভীষণ ভাল লাগে, দেখেন না আমার নামও শ্রাবণ !

– আপনার আসল নাম কী?

– এ নামটা নকল ভাবছেন কেন? আপনারই বা আসল নাম কী তাহলে?

– আমার আসল নাম শ্যামলী, সাথে লাগিয়েছি অপরাজিতা। কারন ওই ফুলটা আমার খুবই প্রিয়। যদি পাই খোঁপায় রাখি।

– আমার আসল নামও শ্রাবনের মত, শাওন। আমি শাওনকে শ্রাবণ বানিয়েছি।

– কেন? শাওনই তো সুন্দর, আবার শ্রাবন  কেন?

– এই একটু বদলানো আর কি। তো আপনি কী করছেন এখন?

– কেন? আপনার সাথে চ্যাট করছি!

– সঠিক, তাই তো। আচ্ছা আপনি কি কবিতা ভালবাসেন?

– একটু একটু

– কবিতা লিখেন?

– না, কিন্তু হঠাৎ একথা জানতে চাচ্ছেন কেন?

– এমনি, মনে হল তাই জানতে চাইলাম। সরি

– সরি কেন আবার?

– এমনি

– এমনি এমনি এত কথা বলছেন?

– হ্যাঁ

– বাঙালি প্রেমে পড়লেই না কবিতা লিখে

– তাই? তাহলে আপনি প্রেমেও পড়েননি, কবিতাও লিখেননি তাই তো?

– সেকথা আরেকদিন, bye.

প্রথমদিন এত কথা বলা বা জানতে চাওয়া ঠিক হয়নি। মেয়েটা মাইন্ড করল না তো? একটু  অন্যরকম বোধ করছে শ্রাবণ। এতক্ষণ খেয়ালি করেনি বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পুকুর পাড়ের কড়ই গাছ, ভিজে একেবারে জবুথবু। মাথার ভেতরে কাজ করছে এই মাত্র শেষ হওয়া শ্যামলীঅপরাজিতার সাথে কথাবার্তা, আর অন্যমনস্ক দৃষ্টি পড়ে আছে পুকুর পাড়ের কড়ই গাছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কড়ই গাছ না জানি কি আনন্দ পাচ্ছে। মনে হতেই ইচ্ছে হল সেও ভিজে আসে না কেন?

ফোনটা বালিসের পাশে রেখে খালি গায়ে বেরিয়ে যায় শ্রাবণ। ঘর থেকে চার–পাঁচ পা না যেতেই পুরো ভিজে গেল উদোম শরীর। শ্রাবণ শার্ট কিংবা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে কখনো বৃষ্টিতে ভেজে না, যখন ভিজে, উদোম গায়েই ভিজে। সে বৃক্ষের মত ভিজতে চায়, মানুষের মত নয়। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে আবারপুকুর পাড়ে চলে আসে। ভিজতে ভিজতে বসে পড়ে কড়ই গাছের নিচে। ঘাটে বসে ভেজার চেয়ে গাছের শেকড়ে বসে ভেজার মজাই আলাদা।

পুকুরের জলে এখন হাজার হাজার বৃত্ত। বৃত্ত ভাঙছে বৃত্ত। এ দৃশ্য নিজে অনুভব করা ছাড়া অন্যকে বোঝানো সম্ভব নয়। এখন যদি একটা ছবি তোলা যেত তাহলে ছবির আরেকটা চমৎকার পোস্ট দেয়া যেত। কিন্তু সম্ভব নয়। অসম্ভবও কিছু নয়। ছাতা নিয়ে তো ছবি তোলাই যেতে পারে। কিন্তু এখন সেটাবিষয় নয়, শ্রাবনের মাথায় ঘুরছে অন্য কথা। ভাবছে কী অসাধারন ক্ষমতা এই বৃত্তের! বৃষ্টি জলের এই বৃত্ত তৈরির ছবি দেখেই তো অপরাজিতা কমেন্ট করেছে প্রথম, কথা বলেছে ইনবক্সেও। তাহলে কি মেয়েটিও ভালবাসে এই বৃত্ত? তা’  বাসতেই পারে, না হলে সেই ছবি তার ভাল লাগল কেন? মানুষে মানুষেআসলে কত মিল! আর কতই না অমিল।

আজ মাথায় ঘুরছে শুধু অপরাজিতা। ছবিতে কতজনই তো লাইক দেয়। এসব লাইক আসলে ক্লিক করার মত, তেমন মুল্যবান কিছু নয়। কিন্তু ইনবক্সে এসে কথা বলা, ধন্যবাদ দেয়া অন্য রকম ভাল না লাগলে সম্ভব নয়। এরকম রুচিশীল বন্ধু ফেসবুকে খুবই কম পাওয়া যায়।

বৃষ্টি বাড়ছে, থামছে, বাড়ছে। আজ কোনদিকেই শ্রাবনের ভ্রূক্ষেপ নেই। একেবারে থামছে না বৃষ্টিও। না থামলেই তো ভাল। বৃষ্টি আর মেঘ দেখে দেখে আরও সময় কাটানো যাবে। কী অপরূপ ভালবাসা বৃক্ষ আর মেঘে! মেঘ আদরে আদরে ছুঁয়ে যাচ্ছে গাছের শরীর। কী জানি অপরাজিতার ওখানেও বৃষ্টি হচ্ছেকিনা? হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। বন্ধু ঠিকই, কিন্তু কতদূরের বন্ধু তার কি ঠিক আছে? অনেকেই তো মিথ্যা ঠিকানা দেয় ফেসবুকে। শ্রাবণ মনে মনে ভাবে ফিরে গিয়ে সে আবার যোগাযোগের চেষ্টা করবে। হয়তো কথা শুরু করা যাবে, হয়তো যাবে না। তবে সে একবার চেষ্টা করে দেখবে।

বৃষ্টি কমে আসছে, মেঘ চলে যাচ্ছে দক্ষিণে আরও দক্ষিণে। শ্রাবণ ভেজা শরীরে ফিরে আসে ঘরে। তাড়াতাড়ি পরে নেয় শুকনা কাপড়। একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে শরীরে। চা খাওয়া দরকার। সকালের নাস্তাই তো এখনো করা হয়নি। শ্রাবণ জানে বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজলে অসুখ করে না, একথা মার বলা। মনে আছেএখনো। তাই সে নিশ্চিত যে, শীত শীত করলেও জ্বর আসবে না। হঠাৎ মনে পরে অপরাজিতার কথা। একবার চেষ্টা করা যেতে পারে পুনঃ যোগাযোগের। দেখা যেতে পারে কথা বলে কিনা।

ফোন হাতে নিতেই দেখে স্ক্রীনে ম্যাসেজ দেখা যাচ্ছে অপরাজিতার। প্রথমে মেঘের ছবি, তারপর লিখেছে– কোথায় আপনি? দেখেই মনটা শান্ত হয়ে এল। যাক নিজে থেকে আর নক করতে হবে না, মেয়ে নিজেই নক করে বসে আছে। দ্রুত উত্তর লিখে শ্রাবণ

– আছি, একটু বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়েছিলাম। sorry for late.

– আমি তো মনে করলাম সেই সময় হঠাৎ চলে যাওয়ায় মাইন্ড করেছেন।

– না, মাইন্ড করিনি, মাইন্ড করব কেন?

– একা একা ভিজলে?

– হ্যাঁ, একাই তো, দু’জন পাব কই? আর একা ভেজার মজাই তো আলাদা।

– হুম

– আপনার পাঠানো মেঘের ছবিও ভাল হয়েছে। ওখানে কি বৃষ্টি হচ্ছে?

– না এখনো শুরু হয়নি, তবে হতে পারে। আকাশে ঘন কাল মেঘ।

– মেঘ বৃষ্টি আপনার ভাল লাগে?

– লাগে না আবার?

– বৃষ্টিতে ভিজতে ভাল লাগে?

– লাগে

– তাহলে তো আমার সাথে আপনার বেশ মিল আছে!

– তাই?

– তাই তো মনে হচ্ছে। আজ আরও মেঘ বৃষ্টির ছবি তুলবেন, পোস্ট দিবেন। আমি মেঘ বৃষ্টি খুবই ভালবাসি। আমিও মেঘের ছবি তুলব, পোস্ট দিব, দেখব কার ছবি ভাল হয়!

– ভাল প্রস্তাব

– তাহলে আজ সারাদিন আমরা মেঘ বৃষ্টির ছবি তুলব আর পোস্ট করব।

– ঠিক আছে।

– প্রকৃতির সাথে আমরাও ছবিতে থাকতে পারি কী?

– না , আমরা ছবিতে থাকব না

– কেন?

– থাকব কেন?

– না থাকবই  বা কেন?

– না, থাকব না। আমরা প্রকৃতির সাথে থাকব, ঘুরব ফিরব কিন্তু কোন সেলফি নয়।

– ঠিক আছে তাই ভাল।

শ্রাবণ সকালের নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়ে ছবির খোঁজে। আজ তার তুলতে হবে দারুন দারুন সব ছবি। বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় প্রজাপতিরা বের হয়েছে, উড়ছে ঝোপে ঝাড়ে। পাতায় পাতায় ফুলে ফুলে। পুকুরের পাশে রাস্তা, রাস্তায় খাদের পাশে  অযত্নে বেড়ে ওঠা জঙ্গলে উড়ছে, উড়ে উড়ে ঘুরছে ফিরছে। সাজানোবাগানে প্রজাপতির ওড়াউড়ির চেয়ে অযত্নে বেড়ে ওঠা জঙ্গলে তাদের ওড়াউড়ি অনেক সুন্দর, আকর্ষণীয়। বৃষ্টি ভেজা এক মাদকীয় ঘ্রান পাওয়া যাচ্ছে। বৃষ্টি ভেজা ফুলের উপর বসা প্রজাপতির ছবি দারুন হতে পারে। শ্রাবণ এখন সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে। ধীর গতিতে পা ফেলে ফেলে যেতে চাচ্ছে ফুল আরপ্রজাপতির কাছে, কিন্তু কাছে গেলেই প্রজাপতি উড়ে চলে যাচ্ছে। তুলতে পারছে না কোন ছবিই। ছবিই বা আর কি তুলবে , মনের ভেতর তোলপাড় তুলছে শ্যামলী অপরাজিতা। মেয়েটাকে ছবিতেই বশ করতে হবে।

প্রেমে নির্মোহ হলেও, শ্রাবন মেয়েদের প্রতি নির্মোহ নয়, মেয়ে সংঘ তো তার ভালই লাগে। কিন্তু কারো সাথে বাঁধা পড়তে তার ভাল লাগে না। তবে চর্চা করা যেতে পারে নির্মোহ প্রেম। শ্রাবনের ইচ্ছেগুলো অনেকটা  এরকম– নাটাই বিহীন সুতা নিয়ে আকাশে উড়ুক ঘুড়ি তার। বাঁধা পড়ে গেলে তো মরা নদীর জল।সে থাকতে চায় স্রোতস্বিনী নদীর প্রবাহ হয়ে। একটাই তো জীবন, কারো সাথে আটকা পড়ে লাভ কি ?

এর মধ্যে প্রজাপতি–ফুল, প্রজাপতি–সবুজ পাতার ছবি হয়ে গেল দশ বারটা, এসব থেকে বেছে বেছে পোস্ট করবে   তিন–চারটে। আর কি কি ছবি তোলা যায় ভাবছে শ্রাবণ। এসময় দেখা গেল রাস্তার পাশে খাদের হাঁটুজলে মা মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে সাথে নিয়ে পোনা। বাহ, চমৎকার তো। দারুন একটা ছবি হতেপারে এটাও। পানি, মাছ, পোনার কাছাকাছি গেল শ্রাবণ। টপাটপ তুলে নিল কয়েকটা ছবি। দেখে নিল আরেকবার। ভাল হয়েছে। আবারো মনে আসা যাওয়া করছে অপরাজিতা শ্যামলী। হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে আবার পুকুর পাড়ে। বৃষ্টি না হলেও আকাশ থেকে ছোট ছোট জলের কনা ভেসে এসে পড়েছেপুকুরের জলে। জলে ভাসছে সেই বৃত্ত। তবে হাল্কা হাল্কা বৃত্ত। এবারও তোলা হল কয়েকটা ছবি। আবারো কি জলের উপর জলের বৃত্ত তৈরির ছবি পোস্ট করবে সে? মনে মনে ঠিক করে একই ছবি আবারো পোস্ট করলে অসুবিধা কি? একই বিষয়ে দশটা ছবি তুললে দশটা তো দশ রকমই হয়। নিজের সাথেবোঝাপড়া করে নেয় শ্রাবণ। সে কেন ভালবাসে এই জলের উপর তৈরি জলের বৃত্ত ? এ রহস্যের কোন ভেদ করতে পারেনি সে। করবেও বা কিভাবে? মনে আসা যাওয়া করছে অপরাজিতা শ্যামলী। কেমন মেয়ে সে ? সেও ভালবাসে জলের উপর জলের বৃত্ত? মানুষে মানুষে এত মিল কিভাবে হয়? বৃষ্টি তো অনেকেইভালবাসে, কিন্তু জলের উপর জলের বৃত্ত ভালবাসে আর ক’জন? অপরাজিতার প্রতি অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে যেন। কেন এই অনুভূতি ? এখানেও তৈরি হচ্ছে এক অন্যরকম বৃত্ত। বৃত্ত স্পর্শ করছে বৃত্তের শরীর। বৃত্ত ভেঙ্গে দিচ্ছে বৃত্তের শরীর। শ্রাবনের মনের ভেতরই তৈরি হচ্ছে বৃত্ত, ভাঙছে বৃত্ত। পরস্পর স্পর্শকরছে পরস্পরের শরীর। বৃত্ত ভাঙছে বৃত্ত, বৃত্ত স্পর্শ করছে বৃত্ত। জলের উপর তৈরি জলের বৃত্ত।

( সনতোষ বড়ুয়া– ছড়াকার, গল্পকার। ওয়াশিংটন ডি সি )