গ্রীসের জলপাই গাছ আর পৃথিবীর গণতন্ত্র – আশির আহমেদ

 

বলেনতো দেখিগ্রীসে জলপাই (অলিভ) এলো কোত্থেকে?

কোত্থেকে আবারবীজ থেকে।

বীজ আসলো কোত্থেকে?

গাছ থেকে।

গাছ আসলো কোত্থেকে?

বীজ থেকে।

ধ্যাৎ।

গ্রীসের জলপাই বীজ থেকে ও আসেনি, গাছ থেকে ও না। রহস্যটা এখানেই।

 

গ্রীসে এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে জলপাই গাছ নেই, এমন একটা রেস্টুরেন্ট নেই যেখানে জলপাই এর কোন মেন্যু নেই। জলপাই আছে সালাদে, আচারে, মেইন ডিশে, ডেযার্টে।

 

দুধ একটা সুষম খাদ্য। খাদ্যের ছয়টি গুণ সবগুলোই দুধে বিদ্যমান। জলপাই হচ্ছে আরেকটি সুষম খাদ্য। আরো কত কত ব্যবহার। শুকনা খান, সালাদে খান, আচারে খান, তেলে খান, সাবান বানান, সুগন্ধি বানান, বডি স্প্রে নেন। জলপাই আছে সর্বত্র।

ইউরোপে আপনি লাঞ্চ করেন আর ডিনার করেন- একধরনের ব্রেড থাকবেই। এক সময় এই ব্রেড খেত বাটার দিয়ে। একটু উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট হলে আপনাকে বাটার দেবেনা। দেবে অলিভ ওয়েল। ব্রেডের সাথে বাটার দিচ্ছে না অলিভ ওয়েল দিচ্ছে সেটা দেখে ও আপনি রেস্টুরেন্ট এর মান নির্ধারণ করতে পারেন।

 

 অলিভ এর গাছ পবিত্র, পাতা পবিত্র। আমাদের নবী নুহ (আঃ) এর নৌকায় যখন কবুতর আশ্রয় নিয়েছিল তখন তার মুখে ছিল অলিভ গাছের একাংশ। অলিম্পিকে ম্যারাথন চ্যাম্পিয়নরা একধরনের পাতার মালা মাথায় পরেন। এগুলো অলিভ পাতা। এরকম কত কত কাহিনি।

 

গ্রীসের জনসংখ্যা যদি হয় ১০ মিলিয়ন, এদের জলপাই গাছের সংখ্যা হচ্ছে ১৫০ মিলিয়ন। জনপ্রতি ১৫ টা করে গাছ। বছরে ৪০ হাজার টন অলিভ ওয়েল উৎপন্ন করে, নিজেরা খেয়ে দেয়ে রফতানি ও করে। পৃথিবীর ২০% অলিভ এই একটা দেশেই তৈরি হয়।

 

২০০৮ সালের কথা। প্রথম বারের মত গ্রীস ভ্রমণে গেলাম। টার্গেট ছিল সামোস আর এথেন্স। এথেন্স থেকে জাহাজে করে ইতালি, ইতালি থেকে ট্রেনে নেদারল্যান্ডস তারপর অস্ট্রিয়া,জার্মানি  হয়ে আবার ইতালি, ইতালি থেকে জাহাজে করে এথেন্স। জাহাজ মানে কতো বড় জাহাজ জানেন? আমাদের কেবিন ছিল দশ তলায়। লিফটে উঠতে হল। পুরো একটা হোটেল রুম। জাহাজের মধ্যেই খান দশেক রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, সিনেমা হল, সুইমিং পুল ৩ টি। কী এক বিশালতা।  ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যায়। ২০০৮ সালেই ওয়াইফাই ছিল। একটু এক্সপেন্সিভ যদিও।

 

জাহাজে কেন চড়তে হলো জানেন?

এথেন্স থেকে ঘণ্টা খানেকের একটা ডোমেস্টিক ফ্লাইট ধরে সামোস পৌঁছলাম বিকাল এর দিকে। অতিশয় ক্ষুদ্রাকার একটা ফ্লাইট। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এসে বিমান খানা একটা এয়ার পকেটে পড়ে গেল। ৩০ সেকেন্ডের মত একটা ফ্রি-ফল এঞ্জয় করতে হলো। নিজেকে নাই নাই মনে হলো। তারপর শুরু হলো

দুল দুল দুলানি

সীটের নীচে লুকানি

দোহাই আল্লাহ এই গ্রীসে জান কবজ কইরনা

 

দুলানির যা দাপট। মনে হচ্ছিলো বাতাসের সাগরে ছোট নৌকা দিয়ে বিশাল বিশাল ৎসুনামির ঢেউ মোকাবিলা করছি। জীবনে যে কয়েকবার মৃত্যু ভয় এসেছিল, এই প্লেন জার্নি তার মধ্যে একটি। রাউন্ড ট্রিপ টিকেট কাটা ছিল। ফেরার পথে ভয়ে এই প্লেনের টিকেট ফেলে দিলাম।

 

প্লেন ছাড়া এথেন্স ফেরার একটাই উপায়। জাহাজ। ১২ ঘণ্টার পথ।

 

সমুদ্র দেখে মন ভাল হয়ে গেল। ভয় কেটে গেল। কী যে সুন্দর সমুদ্র, কী ফকফকে পানি, এমেরাল্ড ব্লু নামে একটা রং আছে। বিজ্ঞান বলে পানির রঙ নেই, আমার চোখ বলছে সামোস এর সমুদ্রের পানির রঙ এমেরাল্ড ব্লু। বাংলায় পান্না নীল।

 

সামোস। মূল গ্রীস থেকে অনেক দুরে তুরস্কের কাছে এই দ্বীপটি বিখ্যাত হলো পিথাগোরাস এর জন্য। তার জন্ম স্থান। মনে আছে, “সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ বাকি দুই বাহুর বর্গের যোগফলের সমান” উপপাদ্য টির কথা? পিথাগোরাস চাচা এই থিওরি দিয়েছিলেন। মতান্তরে এই থিওরি ইরাকে আরো আগে জানা ছিল। সামোসে আর তেমন কিছু নেই। ট্যুরিস্ট আর টুরিস্ট এ ভর্তি। দুপুর বেলা এরা খেয়ে দেয়ে ঘুমায়। সমস্ত দোকানপাট বন্ধ। অফিস আদালত বন্ধ রাখে কিনা জানিনা। এর নাম সিয়েস্তা। দুপুরে খেয়ে একটু ঘুমানো নাকি স্বাস্থ্যের জন্য ভাল।

 

সাইনবোর্ড গুলো দেখছি আর আমার বানানচ্যুতি হচ্ছে। যেমন samos কে পড়ি samosa, আর কেবলই সমুচা  খেতে ইচ্ছা করে। বিখ্যাত খাবার হলো pita gyros আর আমি পড়ি পীথাগোরাস। এই খাবার ওদের শিখিয়েছে তুর্কিরা। চারশো বছর শাসন করে গেছে তুর্কি থেকে আসা মুসলমান ওসমান চাচাদের দল। আমরা যে পিঠা খাই, এটা কি তুর্কিরা আমাদের শিখিয়েছে?

 

সমুদ্রের এতোই প্রেমে পড়লাম যে ইউরোপে বাকি অংশ ট্রেন আর জাহাজে চড়ে কাটিয়ে দেব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।  ইউরেইল পাশ কিনলাম। ১৫ দিনের জন্য। সম্ভবত ৬০০ ইউরো দিয়ে। ট্রেন, জাহাজ দুটোই ব্যবহার করা যায়। নো ফ্লাইট ঝামেলা।

 

জাহাজে করে এথেন্সে পৌঁছলাম ফকফকা সকালে। এথেন্সে কী কী দেখবো – সে এক বিরাট লিস্ট।

 

একজন লোকাল গাইড নিয়ে প্রথমেই গেলাম আক্রোপলিস। গ্রিসের প্রাচীন নগরদুর্গ। পার্থেনন নামের একটা টেম্পল আছে। শহর থেকে একটু উঁচু জায়গায় তৈরি। রাতের বেলা এতো সুন্দর আলোর ঝলক থাকে যে অনেক দুর থেকে ও দেখা যায়। পিলার গুলো কে একেকটা সিংহের পা এর মত মনে হয়।

আড়াই হাজার বছর আগে তৈরি করা এই বিল্ডিং টি কত যে আঘাত চিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছে।

আমাদের গাইড ছিলেন একজন বৃটিশ মহিলা, অনেকদিন হয় এখানে আছেন। গ্রীক এক্সেন্টে ইংরেজি বলেন। T তে যতটুকু না “ট” থাকার কথা তার চেয়ে ও বেশি “ট” উচ্চারণ করেন।  উনি এই আক্রপলিস, পার্থেনন এর কাহিনি শুরু করলেন।

এই যে পিলার ওয়ালা পার্থেনন এর বিল্ডিং খানা দেখছেন, এটার প্রাথমিক ভার্শন টা পারস্যরা এসে ধ্বংস করে।  গ্রীক আর্কিটেক্ট রা পার্থেনন পুনঃনির্মান করেন। পঞ্চম শতাবদিতে খ্রিস্টানরা এসে এটাকে বানায় চার্চ। ১৪ শ সালের দিকে  তুরস্কের অটোম্যান সম্রাট এসে এটাকে বানায় মসজিদ…..

 

তারপর আসে বৃটিশ মামারা। এই বিল্ডিং এর যত নামি দামি পাথর আর ধাতব পদার্থ ছিল, সব  ব্রিটিশরা নিয়ে বৃটিশ মিউজিয়ামে ঢুকিয়ে রেখে বলেছে এইসব মূল্যবান জিনিশ সংরক্ষণ করা দরকার। গ্রীসে থাকলে সন্ত্রাসীরা নষ্ট করে ফেলবে। 

 

এক গ্রীক ভাই বললেন, এই মূল্যবান পাথর গুলো ফেরত আনার জন্য গ্রীক সরকার বেশ কয়েকবার ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন। ফেরত দেননি। আমি বললাম, আমাদের তাজমহলের কোহিনুর এর কাহিনির মত।

 

পার্থেনন এর সামনেই একটা জলপাই গাছ। বললেন, এই জলপাই গাছের বয়স কত জানেন?

অনেক অনেক দিন আগের কথা। এখানকার রাজা একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন। প্রতিযোগিতায় যে জিতবেন তাকে দেয়া হবে এথেন্স শহরটির দায়িত্ব। প্রতিযোগিতায় নামলেন সমুদ্র সম্রাট চাচা পসেইডন আর তার ভাতিজি এথিনা। পসেইডোন ছিলেন অনেক শক্তিশালী। তাকে বলা হতো সমুদ্রের রাজা।

দেখাও কে কী ক্ষমতা দেখাতে পারো।

প্রতিযোগিতা শুরু হলো। বিচারক হলেন জনগণ। জনগণকে যিনি খুশি করতে পারবেন, সেই পাবেন এথেন্স শহর।

পসেইডন তার বিশাল ত্রিশূল মাটিতে গেঁথে হু হা হা হুঙ্কার দিলেন। বেরিয়ে আসলো একটা পানির ফোয়ারা। জনগণ পানি পেয়ে খুশি হলেন কিন্তু খেয়ে বুঝলেন ইহা সমুদ্রের পানি। বললেন, “নোনতা !!কট্টাহ”

এবার দেবী এথিনার পালা।  পার্থেনন এর বিল্ডিং এর সামনে কিছু একটা বুনলেন, গাঁথলেন। ওখান থেকে বেরিয়ে এলো জলপাই গাছ। এই জলপাই গাছ গ্রীসের জন্য খাদ্য, অর্থনিতির উৎস হয়ে দাঁড়ালো। যা থেকে আজো গ্রীক রা খেয়ে বেঁচে আছেন। জনগণ রায় দিয়েছিলেন এথিনার পক্ষে।

এতোদিন এটাকে একটা কল্পকাহিনী বলেই মানুষ জানতো। এইতো কয়েক বছর আগে এই জলপাই গাছটির মূল পরীক্ষা করে বয়স জানা গেল। বিজ্ঞান বলছে কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর।

 

তার মানে কী দাঁড়াল – গ্রীসে জলপাই গাছ থেকে ও আসেনি, বীজ থেকে ও আসেনি। গ্রীসের জলপাই গাছ এই এথিনা দেবীর যাদুর সৃষ্টি। এখন বিশ্বাস করেন আর না করেন এটা আপনার ব্যাপার।

 

কিছু ট্রিভিয়া (জেনে লাভ থাকতে পারে, না জানলে ক্ষতি নেই)

(১) এথিনা হচ্ছেন পৃথিবীতে প্রথম জনগণের রায়ে নির্বাচিত হওয়া প্রথম নেতা/নেত্রী। গণতন্ত্রের মূল কথা। পার্থেনন এর বিল্ডিং টা এখন একটা গনতন্ত্রের ও প্রতীক। আমেরিকার হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে অনেক বিল্ডিং পারথেনন এর কনসেপ্ট দিয়ে তৈরি। সারা দুনিয়ার আর্কিটেকচার ইঞ্জিনিয়ার দের জন্য বিল্ডিং ডিজাইনের মডেল।

(২) অলিম্পিক শুরু হয় খৃষ্টপূর্ব ৭৭৬ সালে। ১২০০ বছর পর ৩৯৩ সালে ব্যান করে দেয়া হয়। পৌত্তলিক (অনেকটা নাস্তিক) ধর্মীয় উৎসব করে আসছিল বলে। ১৮৯৬ সালে ১৪টি দেশ, ২৪১ এথলিট আর ৪২ টি আইটেম নিয়ে মডার্ন অলিম্পিক শুরু হয়। প্রতিবার অলিম্পিকে যে মশাল খানা বহন করা হয় তা শুরু হয় কিন্তু গ্রীসের অলিম্পিক স্টেডিয়াম থেকে। একটা প্যারাবলিক মিরর সুর্য থেকে তাপ নেয় সেই তাপ দিয়ে মশাল ধরানো হয়।

(৩) গ্রীক অক্ষর গুলো মনে আছে? যারা উচ্চতর গণিত বা পদার্থ বিদ্যা পড়েছেন। আলফা (A), বেটা (B), গামা (G), ডেল্টা (D), কাপ্পা (K), পাই  (P) ইত্যাদি। এই অক্ষর গুলো পরিচিত ছিল বলে দশ মিনিটেই মোটামুটি এদের সাইনবোর্ড গুলো পড়তে পারলাম। জেনে থাকবেন Alpha আর Beta থেকেই তৈরি হয়েছে Alphabet যা ইংরেজিতে “অক্ষর” বলে জানে।

জাপান