কাবেরী গায়েন এর বাবা যখন উরিষ্যার কেশাপুর গ্রাম থেকে সিলেট এ আসে তখন তার বয়স ৩২, জীবনের তুমুল উল্লাস যার দেখা হয়নি কখনো, আবার কোনো একদিন বাপ দাদার ভিটেয় ফেরার স্বপ্ন নিয়ে দেশ আর মাটি ছেড়ে স্ত্রী সন্তান সহ কৈলাশটিলা চা বাগানে এসে মাটির ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলো শৈলেন গায়েন। শুরু হয় চা পাতা তোলবার কাজ, আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হতে থাকে এই জীবন।

এখানে আসবার ঘটনা আরও অদ্ভুত, যখন এদেশে চা পাতা তোলার জন্য কোনো কামিন পাওয়া যেতোনা তখন ভারতের চরম অসচ্ছল গ্রামের মানুষদেরকে এই বলে নিয়ে আসা হত যে তোমাদের ​কোনো কাজ করতে হবেনা, শুধু পাতা ছিড়বে আর টাকা পাবে, ওরা ভাবত বাহ এর চাইতে সহজ কাজ আর কি হতে পারে? মিথ্যে বলেনি দালালচক্র, পাতাই তো ছিড়ে তারা, শুধু বলেনি চা বাগানের তপ্ত রোদের কথা, বলেনি সাপ কিনবা জোকের কথা, বলেনি তুমি অভ্যস্ত হবে তাড়ি খেয়ে ঘুমুতে যাবার, তুমি অভ্যস্ত হবে দাসের জীবনের, তুমি তোমার স্ত্রী, কন্যা, পুত্র সবাইকে কামিন কিনবা কামিনী করে গড়ে তোলবে , তুমি খিস্তি করবে, তুমি কখনই আর বাপ দাদার ভিটেয় ফিরবেনা, তুমি প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু, কিনবা স্বজনের নিখোজ সংবাদ জানবেনা কখনই, তুমি শুধু পাতা তুলবে বৈকি! সত্যের সাথে মিথ্যের কি অদ্ভুত সংগোপন !

তারপর আমাদের নাশতায় চা আসে, কি অদ্ভুত সৌন্দর্য নিয়ে, নানান ফ্লেভার এ,বাহারি পাকেটে, প্রতি এক কাপ চায়ের জন্য প্রায় দুশো লিটার পানি খরচ হয়, হয়ত হিসেবটা আমরা অনেকেই জানিনা, আর বিশ কেজি পাতা তোলার পরে দিন শেষে বেতন এখন সম্ভবত ৪০ টাকা যা বহুবছর ধরে আরও অনেক অনেক কম ছিলো, আমাদের নাশতায় আমরা পান করি বিশুদ্ধ চা, বিজ্ঞাপনে প্রচার হয় বাগান থেকে সরাসরি,ধিতাং ধিতাং তা ধিতাং। প্রতি চুমুক চায়ের সাথে আমরা পান করি কামিন কামিনীদের গায়ের ঘামের কস্তুরী ঘন্ধ, পান করি দীর্ঘশ্বাস, বুঝে কিনবা না বুঝে, কিন্তু হিসাব মেলাতে বসুন, সেই গোল হয়ে আসুন সকলের মতন, সাকো নাকি পেরোতেই হবে?

কাবেরী গায়েন এর বয়স এখন ৬০ কিনবা ৭০, সেই কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে মৃত মানুসের সংখ্যার মতন, (একটা সেমিনার এ গিয়েছিলাম এখানে, বয়স্ক অধ্যাপক, জেনেভা বিশ্ববিদালয়ের, আমদের সবাইকে জিগ্গেস করলেন আপনারা বলুনতো এ যাবত কঙ্গো র গৃহযুদ্ধে কত লোক নিহত হয়েছেন? কেউ বলল কত হবে ৩ মিলিয়ন কিনবা ৪ মিলিয়ন,কেউ বলল ২ মিলিয়ন কিনবা ৩ মিলিয়ন)

​ ​

বয়স্ক অধ্যাপক বললেন দেখুন আপনারা বলছেন ৩ কিনবা ৪ মিলিয়ন, আপনাদের হিসেবের পার্থক্য হচ্ছে ১ মিলিয়ন, জীবন কত সস্তা, অথচ ১১৯৮ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ৫.৪ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়েছেন, এই প্রত্যেকটা মানুষের একেকটা গল্প বলার ছিলো, আর আপনাদের আঙ্গুলের ফাক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে ১ মিলিয়ন লাশ! আমরা কি মানুষ? প্রশ্ন রেখেছিলেন আর আমরা ছিলাম নিরুত্তর।

ফিরে আসি আবার কাবেরী কে নিয়ে, তার কখনো সংসার হয়নি তেমন করে, একবার বিয়ে হয়েছিলো, স্বামী বেচারা মদ খেতে খেতে মারা গেলো, তারপর আর বিয়ে হয়নি সন্তান হয়েছে, সন্তানদের সন্তান হয়েছে, সবাই কামিন, শৈলেন গায়েন মারা গেছেন বহু বছর, তিনি কখনো চা পান করতে পারেন নি, কি অদ্ভুত! কাবেরীর কোনো ধারণা নেই সেকোথা থেকে বাবার হাত ধরে এসেছিলো, সন্তানদের কথা দুরে থাক, বাদ দিন এসব আসুন আমরা ওদের গায়ের কস্তুরী গন্ধ মিশ্রিত চা পান করি, আমরা উন্নত হই, কিন্তু সাকো নাকি পার হতেই হবে, যা নাকি আমাদের চুলের চাইতেও মিহি,

​ আমরা কি প্রস্তত??

[​মেক্সিকোর পুএর্তা ভাল্লার্তা য় কাজের উদেশ্যে গিয়ে পাসিফিক ওসান এর বীচ এ আমেরিকান পর্যটকদের চা খাওয়া দেখে হোটেল রুমে ফিরে]​

 

কাজী মুনতাসীর মুর্শেদ 

গুয়াহাটি, আসাম, ভারত