তুষার রাজকন্যা // ঋতুশ্রী ঘোষ
May 2, 2018
মহাপুরুষ // বাদল সৈয়দ
May 2, 2018

ঈর্ষা // তপন দেবনাথ

দু’রমণীকে একসাথে দেখলে আমি ধন্ধে পড়ে যাই, কাকে বাদ দিয়ে কাকে দেখবো সেটাই আমার সমস্যা। এরা দু’জন দেখতে একই রকম নয়। যদি একই রকম হতো- তাহলে একজনকে দেখলেই হতো। দু’জন দেখতে দু’রকম। মিল শুধু এক জায়গায়- এরা দু’জনই সুন্দরী। কেউ কোরো চেয়ে কম নয়। নাম্বার যদি দিতে হয় তবে দু’জনকে একই নাম্বার দিতে হবে। এদেরকে সুন্দরী বলাটা বোধহয় একটু কম বলা হয়। অনিন্দ সুন্দরী বললেই বোধকরি সঠিক বলা হবে। তারা যখন মেলায় আসে বা বাংলাদেশি কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেয়- ধরেই নেওয়া যায় যে অনুষ্ঠানে একটা বাড়তি আকর্ষণ যোগ হলো।

তারা সুন্দরী। নিখুঁত সুন্দরী। বিশাল এই ব্র্রক্ষ্মান্ডের খুব সামান্যই আমি জানি। জানি না বললেই সঠিক বলা হয়। কীভাবে এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ড এত সঠিকভাবে চালু আছে ভাবলে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। একজন পরিচালক যে আছেন এবং তিনিই সব পরিচালনা করছেন সে অস্থিত্ব অস্বীকার করারা কোনো সুযোগ নেই। সে পরিচালক বা জগধীশ্বর এ দু’রমণীকে সৃজন করার সময় একটু অধিক মনোযোগী ছিলেন বলেই মনে হয়। তাঁর কোনো সৃষ্টিই অসুন্দর বা অপ্রয়োজনীয় নয়। তবে নারীর চেয়ে অধিক সুন্দর কিছু সৃজন করেছেন বলে তো আমার নজরে আসেনি। সেই নারীর মধ্যে কেউ কেউ এমন সুন্দরী যে তাদের দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আর এমন দু’জন নারী যদি আমার ভক্ত হয় তাহলে ভাবতেই পারেন- কপাল কাকে বলে।

এ দু’রমণী যদি একসাথে হয় বা আলাদা আলাদা ভাবেও তাদের দেখা যায়- অন্যরা তাদের সাথে ছবি তুলতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সুন্দরী হবার বিড়ন্বনাও আছে বৈকি। লস এঞ্জেলেসে কোনো অনুষ্ঠানে তারা উপস্থিত থাকলে- সংবাদপত্রে তাদের ছবি পাঠালে তা গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়। আসলে এদেরকে উপেক্ষা করা কঠিন। ছবি ছাপানোর ব্যাপারে বেশি কথা বলবো না। তাহেল সচেতন মহল মনে করবে- আমি এদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য- সংবাদপত্রে এদের ছবি ছাপানোর জন্য লবিং করে থাকতে পারি। এই ব্যাপারে যদি আমি অভিযুক্ত হই তাহলে অভিযোগকারীরা আমাকে এই বলে অভিযুক্ত করতে পারে যে- তোমার চেহারা তো পেঁচার মতো, তোমাকে এরা পাত্তা দেয় কেন? কেন তারা আমাতে পাত্তা দেয় সেটা তো অন্য কাহিনি। সব গোঁমড়ই কি উইকিলিকসের মতো ফাঁস করে দিতে হবে? এরা কেন আমাকে পাত্তা দিবে না এমন প্রশ্ন তুলে আমি কাউকে বিভ্রান্ত করবো না। আর কোনো না কোনোভাবে যদি আমি এদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েও থাকি- সে রহস্যও ফাঁস করবো না। যেভাবে হোক এরা আমার বন্ধু হয়ে গেছে। বাংলাদেশি কোনো অনুষ্ঠান হলে এরা আসে, আমি যাই। দেখা হয়, কথা হয়। ভাবের আদান-প্রদান হয়।

দু’দিনব্যাপী বাংলাদেশি একটা মেলা চলছে। মেলায় বাংলাদেশি একজন প্রকাশকের স্টলে বসে আছি। প্রকাশক সাহেব আমাকে বসিয়ে রেখে কোথায় যেন গেছেন। অবশ্য যে-কোনো মেলায় তিনি স্টল দিলে আমি নিজের থেকে গিয়েই বসি। নতুন বই এর গন্ধ ভালো লাগে। উল্টে পাল্টে বই দেখি। রমণীরা এলেও দেখি। তাদেরকে তো আর ছুঁয়ে দেখতে পারি না, মনের চোখ দিয়ে দেখি। মেলায় এখনো তেমন লোকজন আসেনি। এই দু’দিনের মেলায় বাংলাদেশ থেকে একজন অতি পরিচিত জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী এসেছেন। সুতরাং লোক সমাগম প্রত্যাশিত কিন্তু তা এখনই নয়। লোক সমাগম হবে সন্ধ্যার পর। এ সময় এখানে সন্ধ্যা বলতে কিছু নেই। বিকালের পরেই রাত। অর্থাৎ সন্ধ্যে হয় সাড়ে আটটায়। সুতরাং লোক সমাগম হতে রাত ন’টা। কথা থেকে যায় যে- লোক সমাগম হতে রাত ন’টা কেন? কেন নয় আগে? এখানে সন্ধ্যার পর ছাড়া এ জাতীয় কোনো অনুষ্ঠান জমে না। কেন এমন হয় কেউ জানে না। জানলেও কিছু বলা যাবে না কেননা আয়োজকদের অনেকেই আমাকে চিনে। আয়োজকরা বলবেন দর্শকরা সঠিক সময়ে আসে না বলে আমরা নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু করতে পারি না। আবার দর্শকরা অভিযোগ করবেন যে- আয়োজকরা সঠিক সময়ে শুরু করে না বলেই আমরা নির্ধারিত সময়ে আসি না।

বসে নতুন বই এর গন্ধ শুঁকছি। মাথা তুলে বা দিকে তাকাতেই দেখি মহুয়া আসছে। আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই যে দু’ অস্পরীর মধ্যে মহুয়া একজন। মহুয়া আমার বয়সে ছোট হলেও আমি তাকে আপনি করে সন্বোধন করি। একে তো সে অপরূপ সুন্দরী- তারপরে সুন্দর করে কুচি দিয়ে সবুজ শাড়ি পরেছে আজ- আমার মনে হল- একটি জীবন্ত শিল্প আমার দিকে আসছে। সে আমাকে দেখেছে, আমিও তাকে দেখেছি। তারপরেও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বামহাত উপরে তুলে একটু চিৎকার দিয়ে বললাম- মহুয়া আমি এখানে। আমার অভিব্যক্তি এমন যে মহুয়া আমোকেই খুঁজছে, খুঁজে পাচ্ছে না। মহুয়া হাত নাড়াল। আমি বই এর গন্ধ শোঁকা বাদ দিয়ে আহবমান বাংলার ঐতিহ্যে লালিত একটি শিল্প কীভাবে আমার দিকে হেঁটে আসছে- তাই দেখছি। মহুয়া আমার বুকস্টলের কাছে এল। তাকে স্বাগত জানিয়ে আমার পাশের চেয়ারে বসালাম। আমার উদ্দেশ্য একবারে পরিস্কার- এতক্ষণ যারা এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করছিল- বুকস্টলের কাছে আসছিল না তারা এখন মহুয়াকে দেখে বুকস্টলে আসবে। ২/৪ খানা বই বিক্রি হলে প্রকাশক সাহেব হেসে বলবেল- ভাই আপনি আছেন বলেই ভরসা পাই।

মহুয়া কবিতা পছন্দ করে সেটা আমার জানা আছে। ৪/৫টি কবিতার বই তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম- এগুলো নতুন এসেছে। মহুয়া আমার বেশ ঘনিষ্ট হয়ে বসেছে। আজ যে শাড়িটা সে পরেছে- সম্ভবত আজই সে সেটা প্রথম পরেছে। শাড়ি থেকে সুন্দর একটা গন্ধ আসছে। পাগলা বাতাস তার শাড়ির আঁচল দিয়ে বার বার আমার মুখ ঢেকে দিচ্ছে। শাড়ি-নারী-বই কেমন যেন সব একাকার হয়ে গেল। আমাদের তাল ভাঙ্গল টিভি চ্যানেলের এক সাংবাদিক। ক্লিক। ছবি তুলে ফেলল সে। মহুয়া তুমি এখানে? তোমাকে খুঁজে খুঁজে আমি হয়রান।
মহুয়া মাথা তুলে সাংবাদিক সাহেবের দিকে তাকাল। কেন সাংবাদিক সাহেব মহুয়াকে খুঁজছে আমার জানা নেই। এখন এই মাঠে যে কজন লোক আছে তাতে যে কেহ যে কাউকে অতি সহজেই খুঁজে বের করতে পারে। আর মহুয়াকে খুঁজে বের করা তো কোনো ব্যাপারই না। হাজার লোকের মধ্যে মহুয়াকে খুঁজে পেতে কষ্ট হবে না। সে যতটা সুন্দরী এবং দৃষ্টিনন্দন পোশাক পরে ও সাজগোজ কওে, তাতে অনুষ্ঠানে আগত কারোই নজর এড়ানোর কথা নয়।

বই এর পাতা বন্ধ করে মহুয়া কথা বলল- কেন সালেক ভাই?
গত অনুষ্ঠানে তোমার উপস্থাপনা খুব ভালো হয়েছিল।
প্রসংগত যে সেটা প্রায় ছ’মাস আগের কথা। তবুও মহুয়ার পাওনা ধন্যবাদ সালেক সাহেব কেন দিবেন না? উপরন্তু মহুয়া সুন্দরী যে!
ও। ছোট করে জবাব দিল মহুয়া। যেন এমন সব ধন্যবাদ সে নিয়মিতই পেয়ে থাকে। ২/১ টা মিস গেলে কিছু হয় না। আবার সে বই এর পৃষ্ঠা উল্টাতে শুরু করল।
ইনবক্সে ছবি পাঠিয়ে দিবেন সালেক ভাই, বললাম আমি। আমার কথার কোনো জবাব দিলেন না সালেক ভাই।
আচ্ছা ঠিক আছে বই কেনো। পরে কথা হবে। সাংবাদিক সাহেব চলে গেলেন। এতক্ষণ এদিক-ওদিক যারা উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করছিল তাদের মধ্যে কয়েকজন এখন বুকস্টলের কাছে এসেছে এবং বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। বই এর মহা মন্দা বাজারে এটাকে শুভ লক্ষণ বলা যেতে পারে। প্রকাশক সাহেব একটু দূরে দাঁড়িয়ে একজনের সাথে কথা বলছে আর মৃদু হাসছে। তার হাসির কারণ আমার জানা নেই। মহুয়া যে কয়েকটি বই কিনবে এটা আমি প্রায় নিশ্চিত। ইতোপূর্বেও সে আমার থেকে বই কিনেছে এবং আমার পছন্দ করা বই সে সবগুলোই নিয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ৪ কপি বই বিক্রি হয়ে গেল। বলুন মহুয়া- আপনার কোনটা কোনটা পছন্দ?
মহুয়া ৩টি কবিতার বই আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি দাম হিসাব করলাম। আমার কাছে পর্যাপ্ত খুচরো ডলার নেই। হাত উঁচু করে প্রকাশক ফারহাদ ভাইকে ডাক দিলাম- ফরহাদ ভাই, খুচরো লাগবে।
ফরহাদ ভাই হাসতে হাসতে আমার দিকে আসছেন। তার হাসি রহস্যাবৃত।
আজ কি আপনি উপস্থাপনা করবেন মহুয়া? প্রশ্ন করলাম আমি.
বিষণœ মুখে মহুয়া জবাব দিল- না। আজ পাপড়ি করবে। ও কি এসেছে?
এখানে বলে রাখি যে, অন্য অস্পরীর নাম পাপড়ি।
আমি এদিক-ওদিক অকারণে মাথা ঘুড়িয়ে বললাম- না তো এখনো দেখিনি। কেন জানি আমার মনে হল- আমি যাতে পাপড়িকে না দেখি, বা অন্য কেউ তাকে না দেখুক- এটাই তার প্রত্যাশা।
মহুয়া বই এর দাম পরিশোধ করে উঠবে উঠবে করছিল। লোকজন এখনো তেমন আসেনি। তাই উঠেই বা কী করবে। গরমের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করা ছাড়া তার বোধহয় আর কিছুই করার নেই। তাই পূনরায় সে অন্য বই অন্যমনস্কভাবে পাতা উল্টাচ্ছে। এতে আমার বেজায় লাভও হচ্ছে। অন্য যারা আমাকে সচরাচর পাত্তা দেয় না এখন তারা বুকস্টলের কাছ ঘেঁষে যাচ্ছে এবং হাই, হ্যালো বিনিময় করছে- কারণটা আপনারা বুঝতেই পারছেন।
একটু পরে ডান দিকে তাকিয়ে দেখি পাপড়ি এদিকেই আসছে। তার আগমন দেখে আমি মনে মনে খুশি হলাম। তাকে আমার পাশে কিছুক্ষণের জন্য বসাত পারলে আরো যে ২/৪ খানা বই বিক্রি হবে- এই ব্যাপারে আমি আশাবাদী। ফরহাদ ভাই আমাকে কিছু খুচরো ডলার দিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেলেন। মহুয়া আমার বামপাশে বসে আছে। পাপড়ি এসে আমার ডান পাশে ধপাস করে বসে পড়ল। আমি যতদিন পর্যন্ত এ দু’জনকে চিনি তারা পরস্পর পরস্পরকে অনুসরণ করে বলে আমার বিশ্বাস। তবে আমি নিশ্চিত নই। কারণ এরা থাকে আমার থেকে অনেক দূরে। দেখা হয় কেবল কোনো বাংলাদেশি অনুষ্ঠান হলেই। পাপড়িকেও আজ বেশি সুন্দর লাগছে। আজ সে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করবে। সাজগোজের সর্বশেষ যে আইটেম আছে সেটাও সে ব্যবহার করেছে। দু’জনকে একসাথে দাঁড় করালে মনে হবে তাদের সাজগোজের কাজটা একজন বিউটিশিয়ানই করে দেয়।

পাপড়ি আমি এখানে- পাপড়িকে হাত উচু করে আমাকে দেখাতে হয়নি। যে কেউ-ই বুঝবে একজন অনিন্দ সুন্দরী রমণী পাশে বসে থাকলে আর একজন রমণীকে আহবান করা কতটা বিপদজনক হতে পারে। তাছাড়া ঘটনার পেক্ষাপটও বলে দিচ্ছে যে পাপড়ি অনায়াসেই আমার ডান পাশের খালি চেয়ারে বসবে। যেহেতু মহুয়া আগে থেকেই আমার বাম পাশে বসে আছে। অনেকটা অনিবার্য ভাবেই পাপড়ি এসে আমার ডানপাশের চেয়ারে বসল। আমি এখন দু’জনের গভীর উষ্ণতা অনুভব করছি। আগে থেকেই বসে থাকা মহুয়ার সাজগোজ চোরা চোখে দেখে নিল পাপড়ি। বিষয়টি কীভাবে যেন আমার নজরে এল। পাপড়ি যখন আমাদের দিকে আসছিল মহুয়া তখন বার বার পাপড়ির সাজগোজ পরখ করছিল, নিজের শাড়ির আঁচল ঠিক করছিল, ব্লাউজ টেনেটুনে দেখছিল, চুলে বার বার হাত বুলাচ্ছিল পরিপাটি আছে কিনা। বলে রাখা ভালো যে, কোনো প্রকার দুরভিসন্ধি ছাড়াই আমি তাদের এসব দেখছিলাম।
পাপড়ি বই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। আমার একটু ডিপ্লোম্যাসি করতে ইচ্ছে করছে। পাপড়িকে বললাম- মহুয়া আজ ৩টি কবিতার বই কিনেছে। কটমট দৃষ্টিতে মহুয়া আমার দিকে তাকাল। কোন দৃষ্টি বিশেষজ্ঞ যদি সে কটমট দৃষ্টির অর্থ উৎঘাটন করতেন তার ফলাফল দাঁড়াত- ৩টির কথা বলছেন কেন? ৩০টির কথা বলুন। মহুয়ার দৃষ্টি এড়িয়ে পাপড়ি আমাকে হাতে ইশারা করল তাকে ৪টি বই দেওয়ার জন্য।
আমার ডিপ্লোম্যাসি মনে হয় কাজে দিয়েছে। এই খরার বাজারে একসাথে ৪ খানা কবিতার বই বিক্রি করাকে আমি ঐতিহাসিক কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখলেও ইতিবাচক হিসেবে ভাবতে ইচ্ছে করছে। আমি ধপাধপ করে কিছুটা মহুয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাপড়িকে ৪ খানা কবিতার বই প্যাকেট করে দিলাম। আমার প্রত্যাশা- মহুয়া এখন আমাকে আরো কবিতার বই এর কথা বলুক। পাপড়ি মহুয়াকে ছাড়িয়ে যাক, মহুয়া পাপড়িকে ছাড়িয়ে যাক। বই বিক্রি বাড়–ক।

বই এর প্যাকেট হাতে নিয়ে পাপড়ি উঠি উঠি করছিল। আজ সে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করবে। কিন্তু এখনো লোকজন তেমন আসেনি। তাই পাপড়িও মহুয়ার মতো বই নিয়ে নাড়াচাড়া করে সময় কাটাচ্ছে। সালেক সাহেব এতক্ষণ কোথায় যেন ছিলেন। পাপড়িকে দেখেই তিনি সসব্যস্ত হয়ে বুকস্টলে ছুটে এলেন। ক্লিক। আমি মাঝে। আমার দু’পাশে পাপড়ি ও মহুয়া।
তোমাকে আমি অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি পাপড়ি। কখন এলে তুমি? বললেন সালেক সাহেব।
মহুয়া বাঁকা চোখে সালেক সাহেবের দিকে তাকাল। তার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে- সালেক সাহেব পাপড়িকে খোঁজেনি। প্রায় একই ধরনের কথা সালেক মহুয়াকেও বলেছিল।
আগ্রহ নিয়ে পাপড়ি জবাব দিল- কেন সালেক ভাই?
আজ তোমার অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করার কথা না?
একটু যেন ভয়ার্ত হয়ে পাপড়ি জবাব দিল- হ্যাঁ, কেন, কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিছু?
না-না । পরিবর্তন হলে তুমি জানবে না?
হাফ ছেড়ে বাঁচল পাপড়ি।
চোরা চোখে মহুয়ার চোখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করলাম। তার যেন প্রত্যাশা- পরিবর্তন হলেই ভালো হতো।
আয়োজকরা মঞ্চে তোড়জোড় শুরু করেছে। শীঘ্র অনুষ্ঠান শুরু হবার অথবা অনুষ্ঠান শুরুর আগের মহড়া শুরুর একটি শুভ লক্ষণ দেখা দিল।
পাপড়ি উঠে দাঁড়াল। আসি মিলনদা।
ঠিক আছে। আবার দেখা হবে কোনো এক শুভক্ষণে।
আমার কথায় পাপড়ি মৃদু হাসল তবে কোনো জবাব দিল না। সে ধীর পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সালেক সাহেব তার ক্যামেরা নিয়ে আগেই মঞ্চের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছেন। এতক্ষণে কিছু সংখ্যক লোক সমাগম হয়েছে যদিও তারা এলোমেলো হাঁটাহাঁটি করছে।
বুক স্টলে এখন আমি ও মহুয়া ছাড়া আর কেউ নেই। মহুয়া তার চেয়ারটা আমার আরো কাছে টেনে আমার বামহাতে আলতো করে একটু চিমটি কেটে বলল- পাপড়ির সাথে আপনার এত কিসের কথা?
উনত্রিশ বছর আগে। হ্যাঁ, ঠিক উনত্রিশ বছর আগে অনেকটা এ রকম একটি ঘটনায় একজন আমাকে চিমটি দিয়েছিল। উনত্রিশ বছর আগের সে চিমটি আজ যেন অনুূভূত হয়েছে আমার।
আমি থ খেয়ে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম- একটু-আধটু কথা না বললে লোকজন বই কিনবে? লোাকজন বই না কিনলে তো আমার মিশন অসস্পূর্ণ রয়ে যাবে।
বই কেনার আর কোনো লোক কি এই লস এঞ্জেলেসে নেই নাকি? একটু যেন ক্ষেদোক্তির সাথেই বলল মহুয়া।
এত সুন্দর করে সাজগোজ করে এসেছে সে কখা তো বলতেই পারলাম না।
আমার কথা শেষ হতে না হতেই মহুয়া যেন ধপ করে জ্বলে উঠল।

চোখ বড় করে মহুয়া জবাব দিল- আর কেউ কি সাজগোজ করে আসেনি নাকি? আপনি কি মনে করেছেন যে পাপড়ি পুরুষদের দেখানোর জন্য সাজগোজ করে এসেছে?
মহুয়ার কথায় আমার মনে হলো আমি একটি রহস্য উ˜্ঘাটনের দ্বারপ্রাণে পৌঁছে গেছি। সুতরাং আমি একটু কৌশলী হলাম। মহুয়া এখন যেভাবে কথা বলছে সেটা তার স্বভাবজাত নয়। আমার উপর সে ক্ষিপ্ত হওয়ার কোনো কারণও আমার জানা নেই। সে কোনো কারণে বিরক্ত হলে এতক্ষণ এখানে বসে থাকত না।

মিনমিন করে আমি জবাব দিলাম – আমি তো জানি পুরুষদের কাছে আকর্ষণীয় দেখাতেই মেয়েরা সাজগোজ করে।
আমার হাতে চাপ দিয়ে, দাঁত কিড়মিড় করে, দ’ুদিকে মাথা নাড়িয়ে মহুয়া জবাব দিল- জ্বী না স্যার, মেয়ারা পুরুষদের দেখানোর জন্য সাজগোজ করে না। মেয়েরা মেয়েদের দেখানো জন্যই সাজগোজ করে।
আমি ভ্যাবাচেকা হয়ে গেলাম। জগত সংসার আমার কাছে কেমন যেন পানসা হয়ে আসছিল। সারা জীবন মেয়েদের যে সাজগোজ দেখে বিমুগ্ধ হয়েছিলাম তা কি কেবলই অনধিকার চর্চা ছিল?
মেয়েরা মেয়েদের সাজগোজ দেখানোর কী আছে মহুয়া? সাহস সঞ্চয় করে শুননো গলায় প্রশ্ন করলাম আমি।
আছে। আপনি কি মনে করেছেন পাপড়ি এত সাজগোজ করেছে পুরুষদের দেখানোর জন্য?
তাহলে? আমার বিস্ময় যেন কাটছেই না।

মেয়েদের জন্য। সে দেখাতে চায় সব মেয়েদের চেয়ে সে সুন্দরী। তাই তার এত সাজগোজ। বিশেষ করে আমাকে দেখানোর জন্য।
আর আপনি? আপনি এত সাজগোজ করেছেন কার জন্য? আমি আর মুখ চেপে থাকতে পারলাম না।
পূর্ণ দৃষ্টিতে, শরীর ঘুরিয়ে মহুয়া আমার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে এখন রাগের সামান্যতম চিহ্ন নেই।
আপনার জন্য সেজেছি বলতে পারলে ভালোই হতো- দেখলেন না পাপড়ি এসেই কেমন আমাকে নিরীক্ষা শুরু করেছিল। আমি ওর চেয়ে কম কিসে? আমি ওকে সুযোগ দিব কেন?
এতক্ষণে আমার কাছে সব কিছু পরিস্কার হতে শুরু করল। বিধাতার উপর আমার সামান্য রাগ হল। রূপবান আমাকে না করেছেন তাতে দুঃখ নেই কিন্তু আর একটু বুদ্ধিÑজ্ঞান দিলে কী ক্ষতি হতো তাঁর? মহুয়া ও পাপড়ির অভিব্যক্তি তাদের ইর্ষাপরায়ণতা প্রমাণ করে। মেয়েরা যে মেয়েদের দেখানোর জন্যই এত সাজগোজ করে তা আমার জানা ছিল না। যখন থেকে মেয়েদের দিকে তাকাতে শিখেছি তখন থেকেই তো মনে হতো মেয়েরা পুরুষদের দেখানোর জন্যই সাজগোজ করে। দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাসে আজ এভাবে চিড় ধরবে তা যেন আমার কল্পনাতেও ছিল না। মহুয়ার কথায় আমি যেন একটু হতাশই হলাম।
এমন থ খেয়ে গেলেন কেন মিলনদা? মহুয়ার কথায় আমর সম্বিত ফিরে এল।
না-না, আর কিছু বলতে পারলান না আমি। আমার যেন আর কিছু বলারও নেই।
মেয়েদের দিকে তাকাতে পুরুষদের কোনো বাঁধা নেই, বলল মহুয়া। আমি যেন হারানো রাজ্য ফিরে পেলাম। মেয়েরা যার জন্যই সাজগোজ করুক না কেন পুরুষদের সেদিকে তাকাতে কোনো বাধা নেই।
হঠাৎ করেই আমার একটা কথা মনে পড়ল। একটু আগে ঈশ্বরের উপর যে সামান্য একটু রাগ হয়েছিল সেটাও উবে গেল। আমি তৃপ্ত দৃষ্টিতে মহুয়ার দিকে তাকালাম।
কিছু বলবেন মনে হয় মিলনদা?

আমি সামনের দিকে মাথা ঝাঁকালাম। মনে পড়েছে মহুয়া- কয়েক বছর আগে ব্রিটিশ একটি সাময়িকীতে এ রকমই একটি জরিপের ফল প্রকাশিত হয়েছিল যে- ‘মেয়েরা মেয়েদের দেখানোর জন্যই সাজগোজ করে, ছেলেদের জন্য নয়’। এ কথাটা কেন যে এতক্ষণ আমার মনে পড়ল না?
মনে পড়লে কী করতেন? পাপড়িকে আরো একটু বেশি দেখে রাখতেন?
আমার একটু রোমান্টিত হতে ইচ্ছে করল। এমনিতেই এতক্ষণ বড় একটা ধকল গেছে। মহুয়া কাছে থাকতে পাপড়ি কেন?
মহুয়া চোখ সরু করে আমার দিকে তাকাল। আমার এ অস্ত্র কী কাজে দিবে আমার জানা নেই। আপতত আত্মরক্ষার কৌশলও হতে পারে।
মঞ্চ থেকে কেউ একজন ঘোষণা করছে- আজকের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করবেন লাস্যমযী পাপড়ি। আমি এখন মাইক দিচ্ছি পাপড়িকে।
মাইকের ঘোষণা শুনে মহুয়া কান খাড়া করল। ঘোষণাটি যেন তার মনে একটি জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। কিছুটা অসহিষ্ণু দৃষ্টিতে মহুয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল- পাপড়ি কী কী বই নিয়েছে তার একটি করে কপি আমাকে দিন। আর আমি আগে কী কী বই নিয়েছি তা যদি পাপড়িকে বলছেন তো আপনার সাথে আড়ি। জীবনের তরে সম্পর্ক থাকেবে না।
আমি সুবোধ বালকের মত পাপড়ি যে যে বই নিয়েছে তার একটি করে কপি মহুয়াকে দিলাম কিন্তু আমার চুলকানি কমছে না। আমার ইচ্ছে করছে মঞ্চে গিয়ে পাপড়িকে বলে আসি- তুমিও যে বই নিয়েছো মহুয়াও সে বই নিয়েছে। মহুয়া আগে যে ৩টি বই নিয়েছে সেটা তোমার জানা নেই।

আমার কেন যেন দৃঢ় বিশ্বাস জম্মেছে আমি এ রকম করলে- পাপড়ি মঞ্চ থেকে নেমে আসবে মহুয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাকি বই ৩টি সংগ্রহ করতে। তাতে অনুষ্ঠানের বিঘœ ঘটবে। অনুষ্ঠান সুষ্ঠু পরিচালনার খাতিরে আমি আমার চুলকানিটা অবধমিত করে রাখলাম। জীবনে কত কিছুই তো সয়ে যেতে হয়, গোপন করে যেতে হয়, আপোস করতে হয়।

আমার চুলকানি বাদ দিয়ে আমি কী যেন বুঝতে চেস্টা করলাম। কোথাও একটি অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছে বোধহয়। জটিল কোনো বিষয় সামনে এলে আমি তাৎক্ষনিক কিছু উদ্ঘাটন করতে পারি না। আমর বুদ্ধি ভোতা বলে সময় লাগে। কেউ কাউকে নাহি ছাড়ে সমানে সমান- এ রকম কি কিছু ঘটছে নাকি?

লস এঞ্জেলেস,যুক্তরাষ্ট্র