মহাপুরুষ // বাদল সৈয়দ
May 2, 2018
দূরত্বের দুর্বিপাক // মায়মুনা লীনা
May 2, 2018

অরণ্যযজ্ঞ // মুহাম্মাদ তালুত

বাইসাইকেল থেকে নেমে দাঁড়াল নৈর্ঋত। হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল গোকূল মেধের দিকে; বগুড়ার মহাস্থানগড়ের এই পুরাকীর্তি আসলেই বিস্ময়কর, তবু আমি ওর বিস্ময়ে শাদা হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকালাম, ওর মত এত গভীরভাবে কাউকে তাকাতে দেখিনি। নৃ যতবার এখানে এসেছে ততবার ঘন্টার পর ঘণ্টা পোড়ামাটির ইটে বানান এই কাঠামো নিয়ে মেতে উঠেছে, মনপ্রাণ দিয়ে ভিজুয়ালাইজ করতে চেয়েছে সেই গুপ্ত, পাল, সেন, সুলতানি সব আমলের মুহূর্তগুলো, এই প্রত্নস্থান সবক’টা যুগের সাক্ষী। ও বলে, পুরাকীর্তি দেখার সময় এটাই নাকি আসল ব্যাপার, সেই সময়ে মনটাকে নিয়ে যেতে হয়, সেই আমলের মানুষগুলোর পায়ের আওয়াজ চারপাশে কান পেতে শুনতে হয়, অনুভব করতে হয় প্রাচীন প্রাণের ছন্দিত স্পন্দন।

বগুড়ায় বদলি হয়ে এসেছি প্রায় সাত মাস। আসার পর এই এলাকার এক উৎসাহী তরুণ মাধব ধরের সাথে আমার অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়, প্রত্নতত্ত্বে বেশ আগ্রহ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পারস্পারিক আস্থা অর্জনের পর সে জানায়, তার এক গোপন ডিসকভারির কথা, এক ফুট বাই এক ফুটের একটা প্রাচীন শিলালিপি, গোকুল মেধের কাছে এক বাড়ির উঠানে মাটির নিচে পাওয়া, যার মর্মোদ্ধারের চেষ্টা করে চলেছে সে একাই। জিনিসটা কালপাথরের ওপর ছেনি দিয়ে খোদাই করা  একটা প্রাচীনলিপি মনে হয়, অক্ষরগুলোর সাথে এখনকার বাঙলার কোন মিল আমি পাইনি। তবে মাধব বলে, ওটা নাকি প্রাচীন বাঙলাই, পালি বা মাগধির মধ্যযুগীয় অপভ্রংশের আরও আগের রূপ মনে হয়েছে ওর। সেই লিপির মর্মোদ্ধার আমার কম্মো নয়, তবে একটা হাই রেজুলিউশনের ফোটো তুলে মেইল করেছিলাম নৃ’র কাছে আরও ছয়মাস আগে। এতদিন তেমন কোন যোগাযোগ হয়নি, হটাত কাল রাতে নৃ এসে হাজির। একটা বাইসাইকেল চাইল, যোগাড় করে দিলাম। শুক্রবার ভোরে দু’জনে মিলে চলে এসেছি বেহুলা লখিন্দরের ডেরায়, বগুড়া শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে। এখন শীতের সময়, কুয়াশায় ছাওয়া এলাকাটা প্রায় জনশূন্যই বলা চলে।

‘এখানে প্রথম আসি আজ থেকে দুই যুগ আগে! তখন বাবার পোস্টিং ছিল গাইবান্ধায়, ওখান থেকে এক পিকনিক পার্টির সাথে এসেছিলাম। এখনও পরিষ্কার মনে আছে এলাকাটায় আসতেই সেই সময় পড়া এদেশীয় রূপকথার নগরগুলোর মত মনে হত। এই স্তুপের সামনে দাঁড়িয়েই বাবা বেহুলা লক্ষ্মীন্দরের কাহিনী বলেছিল।  গল্পটা নিছক লোককথা ধরা হলেও যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং, হয়ত আসলেই কোন সত্য ঘটনা থেকে বিবর্তিত’, নৃ’র ধারণা, দুনিয়ার সব মিথ সত্যের ছায়ায় রচিত। ও এবার স্তুপটার ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল।

‘এস তৌফিক, এই স্ট্রাকচারটা অনেকটা সাউথ আমেরিকার ইনকা পিরামিডের মত, প্রথমে একটা প্লাটফর্ম তৈরি করে সেটা ক্রমান্বয়ে উঁচু করা হয়েছে, আর চারপাশ থেকে টেরাসের মত কুঠুরিগুলো বানানো হয়েছে, পরে আগুনে পোড়া ইট দিয়ে দেয়াল গাঁথা হয়েছে। এটার গড়ন অনেকটা পেরুর কারাল পিরামিডের মত, যেটা কিনা প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে তৈরি ‘নোর্ত চিকো’ সভ্যতার নিদর্শন’।

‘কিন্তু এ জিনিস তো দেড় হাজার বছর আগের।’, আমি বললাম।

‘তা ঠিক, তবে একই ধরণের স্থাপনা প্রাচীন দুনিয়ার অনেক জায়গায় পাওয়া গেছে। এ থেকে বোঝা যায় পরিব্রাজকরা সে যুগেও ছিল আর প্রযুক্তির গ্লোবালাইজেশনও ঘটেছিল। দূরপ্রাচ্যে এমন অনেক স্থাপনা আছে’।

‘পাহাড়পুরের বিহারটা আরেকটু পরে বানানো হলেও ওটার স্থাপত্যরীতিও একই রকম।’, বললাম আমি।

‘হ্যাঁ, এগুলো সবই পাল আমলের বৌদ্ধবিহার বলে ধরা হয়, তবে গুপ্ত আর পাল দুই আমলের ট্রাঞ্জিশন পিরিয়ডের সময় সম্ভবত, কেননা এসব জায়গায় গুপ্তযুগের কিছু নিদর্শনও মিলেছে।’, বলে চলল নৃ। আমরা স্তুপের প্রায় শীর্ষে পৌঁছে গেলাম। ইটের দেয়ালগুলো ভেঙ্গে সিঁড়ির মত আকার নিয়েছে বিভিন্ন স্থানে, তাই ওঠা তেমন মুশকিল না।

‘এটা পাল, সেন দু’যুগেই ধর্মকর্মের যায়গা ছিল, পাল যুগে বিহার আর সেন যুগে শিবমন্দির।’, সকালের আলোয় নৃ’র মুখটা ঝলমল করছে। এবার মেধের একেবারে উপরে আমরা।

মেধটা নিচ থেকে ওপরের দিকে ক্রমশঃ সরু হয়ে উঠেছে, সেই যুগের স্থাপত্যরীতি। কোন ধাতব রিইনফোর্সমেন্টের বালাই ছিল না, পাথর আর পোড়ামাটিই সম্বল, তবুও যথেষ্ট মজবুত যে হত তা বলাই বাহুল্য, নয়ত এত শতাব্দী পেরিয়েও এগুলো অটুট আছে কিভাবে?  উপরে একেবারে কেন্দ্রে ছোট ইঁদারা টাইপের একটা গর্ত, সেন যুগে এটায় শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হত বলে ধারণা করা হয়, তারও আগে হয়ত বৌদ্ধদের পদ্মস্তম্ভচক্র বসানো ছিল।জায়গাটা একটু নিচু, লাফ দিয়ে নেমে পড়ল নৃ। চারপাশের দেওয়ালটা দেখল মনোযোগ দিয়ে, ইটের খাঁজে কলমের নিব দিয়ে একটু ঘষা দিল, কেন তা নুঝলাম না। ‘তৌফিক’, ফিসফিসিয়ে বলল ও, ‘লিপিটা আসলে মাগধি বা পালি কোন অপভ্রংশই না, ওটা অনেকটা প্রাচীন কলিঙ্গের চিত্রলিপির মত, ব্রাহ্মীর একটা শাখা হতে পারে, এখন পুরাই বিলুপ্ত। ওটা আমি ভারতের এক পন্ডিতের কাছে পাঠিয়েছিলাম, সেইই জানাল।’

‘কি লেখা আছে জানতে পেরেছ?’

‘বলা চলে এখন পর্যন্ত কিছুই না।’

‘এই মেধের সাথে কোন কানেকশন আছে?’, শুধালাম আমি।

‘না মনে হয়, তবে হয়ত এখানে দীর্ঘদিন রাখা ছিল। আমি কলিঙ্গ বর্ণমালাটা একটু বোঝার চেষ্টা করলাম এই ছয় মাস ধরে, অনেকটা ইজিপশিয়ান হিয়েরোগ্লিফের মত, মানে ছবি এঁকে লেখা। লিপিটা একটু দেখা দরকার, ব্যবস্থা করতে পারবে?’

‘এখুনি পেয়ে যাবে।’, আমি মাধবকে মোবাইলে কল করলাম, ওকে লিপিটা আনতে বললাম বাসায়। ‘কিন্তু এখানে এলে কেন?’, শুধালাম আমি।

‘ছেলেবেলায় বহুবার এসেছি, তাও খুব দেখতে ইচ্ছে করল, এই স্তুপকে ঘিরে কত শত রহস্য রয়ে গেছে, আমরা আজো জানতে পারিনি, জানার চেষ্টাও সেভাবে করিনি, এ আমাদের জাতীয় দৈন্য। সম্রাট অশোকের কল্যাণে এ এলাকাতেও বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল, কেননা এখানকার মানুষের খুব পছন্দ হয়েছিল অহিংসবাদ।তবে ষড়রিপু দমন করতে গিয়ে বৌদ্ধরা অনেক আবিষ্কার, অনেক রহস্য লুকিয়ে রাখত, যেন অহংকার বা মোহ দ্বারা আক্রান্ত না হয়। বৌদ্ধ শাওলিন সন্ন্যাসীদের ছত্রিশ চেম্বারের রহস্য নাকি আজো অজানা, ওদের অনেকেই নাকি উড়তে পর্যন্ত পারে।’

‘তা এখানে কোন কিছু আঁচ করতে পারছ নাকি?’, আমি কৌতূহলী হলাম।

‘এখানকার মাটির প্রতিটা কণা, ইটের প্রতিটা টুকরো হাজার হাজার বছরের শত শত অজানা রহস্যের সাক্ষী। কিন্তু আফসোস, সে রহস্য হাতড়ানোর নেশায় কাউকে পেল না।’, একটা নির্লিপ্ত কিন্তু আমুদে ঢঙে বলল নৃ। আমি এটার সাথে বেশ পরিচিত, এসময় ওর মুখটা ভোঁতা আর ঠোটটা  বাঁকা হয়ে থাকে, সাথে একটা ভ্রূ কপালে উঠে যায়!

‘শেষমেশ তোমায় পেল নাকি?’, আমি হেসে বললাম। নৃর সাথে আমার সম্পর্ক আসলে অনেক গভীর কিন্তু অন্যান্য অনেক বন্ধুদের যেমন চটুল, সেরকম না। পারস্পারিক একটা শ্রদ্ধাবোধ আছে, ওর সাথে থাকার সময় কেমন যেন একটা পরিচ্ছন্ন অনুভূতি আমার ভেতর চলে আসে; এমনটা আসেনি আর কারও সাথেই।

‘নাহ! ঐ রহস্য এখানকার না। তবে সম্ভবত এখানেই চাপা পড়ে ছিল হাজার বছর ধরে!’, গোকূল মেধের একেবারে শীর্ষে আমরা, চারপাশটা দেখতে দেখতে বলল নৃ।

‘কি সে রহস্য?’, আমি চলে এলাম আসল প্রশ্নে?

‘জানি না কিছুই এখনও, তবে বেশ দুর্বোধ্য আর……হয়ত বা মিথও হতে পারে…এসব লিপির অনেকগুলোরই কোন আগা মাথা পাওয়া যায়নি। আর আমার এখনও সন্দেহ যে ওটার মধ্যে কোন  গুপ্তসংকেত আছে, নিছক কোন আখ্যান বা ঘটনার বিবরণ না।’, কপাল কুঁচকে জানাল নৃ।

‘ইন্টারেস্টিং!’, একটু নির্লিপ্ত ঢঙে বললাম, যদিও ভেতরে ফেটে যাচ্ছিলাম। নৃ’র সাথে কোন অ্যাডভেঞ্চার মানেই জীবনের সেরা রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলোর একটা।

‘ছয় মাস ধরে লিপিটার মর্মোদ্ধারের চেষ্টা করছি। পুরনো লেখা বোঝা ভীষণ জটিল, প্রায়ই ভুল হতে পারে, সঠিক অর্থের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না, তাই পণ্ডিতরা যা বলবে তাইই ইতিহাস মনে করা বোকামি, আর তাছাড়া লিপিতে লেখা থাকলেই সেটাই যে সত্য হবে তার গ্যারান্টিও নাই। কেউ মিথ্যাও তো লিখতে পারে, তাই না?’, দুই হাতের তালু মুখটার ওপর বুলিয়ে বলল নৃ। খানিকটা ক্লান্ত মনে হচ্ছে ওকে, রাতজাগার ফল।

‘হ্যাঁ, History is written by the victors!’, আমিও সায় দিলাম।

‘চল, ফেরা যাক। মাধব মনে হয় ততক্ষণে পৌঁছে যাবে।’

‘আগে আর যেসব লিপি পাওয়া গেছে, এই বর্ণগুলো সেসবের সাথে পুরাপুরি মেলে না, তবে কলিঙ্গের প্রাচীন লিপির সাথেই সব থেকে বেশি মিলেছে।’,আমরা তিনজন বসে আছি আমার স্টাডি রুমে। মাধবের আনা লিপিটা টেবিলের ওপর রেখে একটা ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে  খুব ভাল করে দেখছে নৃ। একটা বর্গাকার পাথরের খণ্ড, পাশগুলো একফুট হবে, একটা কালো শীলপাটার মত লাগছে। টেবিলের ওপর পড়ে আছে আরও বেশ কিছু কাগজ, লিপির যেসব ছবি আমি তুলে পাঠিয়েছিলাম সেসবের প্রিন্ট, অসংখ্য আঁকিবুঁকিতে ভরে আছে, নৃ এনালাইসিস করেছে।

বর্ণগুলো বড্ড অদ্ভুত, বাংলা, হিন্দি অসমীয়া, উড়িয়া কোনটার সাথেই পুরো মিল নেই আর অনেকটা চীনা হরফের মত ফাঁক ফাঁক করে খোদাই করা হয়েছে।

‘খুব সরল চিত্রলিপি টাইপের মনে হয়েছে ডক্টর ভার্গবের কাছে, যেমন এইটা হল গাছ’, একটা বর্ণের মত কিছুর ওপর তর্জনী তাক করে দেখাল নৃ। আমি আর মাধব দেখলাম, একটা বৃত্তের নিচে উল্লম্ব সরলরেখা টানা, রেখার শেষপ্রান্তে আরেকটা অনুভূমিক রেখা, বাচ্চাদের আঁকা গাছের মতই মনে হল এবার। গাছটার চারপাশে ঢেউের মত কতগুলো রেখার গুচ্ছ। নিচে চতুর্ভুজের মত একটা আকারও আঁকা আছে খুব হালকা দাগে।

‘ঢেউ মানে নিশ্চয় নদী’, আত্মবিশ্বাসী বিজ্ঞের মত বললাম আমি।

‘তাঁর মানে? নদী দিয়ে ঘেরা জঙ্গল?’, মাধব জিজ্ঞেস করল।

‘হতে পারে , আবার হয়ত কোনদিনই এসবের মানে উদ্ধার হবে না, প্রায় দুই মিলেনিয়াম আগের লেখা’, একটু অনিশ্চিত সুরে বলল নৃ।

‘আমার তো মনে হয় লেখা আর আঁকার মিশেল’, আমি লিপির দিকে তাকিয়ে বললাম।

‘ঠিক ধরেছ, নিচের লেখাগুলো প্রাচীন কলিঙ্গের কিন্তু ছবিগুলো সংকেতের মত লাগছে’, ভ্রূ কুঁচকে বলল নৃ। লিপির নিচে ডান দিকে কয়েক ছত্র লেখার মত রয়েছে। ‘গাছ, ঢেউ এসব সম্ভবত কোন কিছুর সংকেত, আর লেখাগুলো একটা পদ্য হতে পারে।’

‘গুপ্তধন?’, মাধব একটু উত্তেজিত হল।

‘কিছু বোঝা যাচ্ছে না এখনও।’

‘এই চিহ্ন দুটো চোখ মনে হচ্ছে’, আমি লিপির দু’পাশে দুটো মাকুর মত চিহ্ন দেখিয়ে বললাম। মাকুর ভেতর একটা করে বিন্দু।

‘হ্যাঁ, আর নিচেরটা বন্ধ করে রাখা চোখ হতে পারে’, নৃ দু’টো বৃত্তচাপের মত আকার দেখাল। ‘চর্যাপদে কিছু ভাবতত্ত্বের কবিতা ছিল, সেরকম কিছুও হতে পারে, হয়ত এই সংকেত সেরকম কিছু মিন করছে।’

‘মানে, চোখ দিয়ে দেখা যায় না, মন দিয়ে যায়?’, হেসে ফেলে বলল মাধব। নৃও একটু হেসে সায় দিল, খেয়াল করল, শ্যামলা রঙের ছেলেটার দাঁত আশ্চর্য রকমের সাদা আর ঝকঝকে।

‘আমাকে যে ছবিগুলা পাঠিয়েছিলা সেগুলায় কিছু জিনিস ভালভাবে আসেনি। যেমন এই ফোঁটাগুলা’, শীলপাটার ওপর যেমন খোদাই করা থাকে, তেমন কিছু ছোট ছোট বৃত্তাকার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে শিলালিপিটায়।

গুনে গুনে মোট ছয়টা ফোঁটা পাওয়া গেল। কোন রেগুলার প্যাটার্ন নেই, এখানে ওখানে ছড়ান। তাই আমি বললাম, ‘বহুদিনের পুরনো জিনিস হয়ত ক্ষয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ওসব।’

‘তা মনে হচ্ছে না, সব ক’টা ফোঁটা একই আকারের, আর খোদাইটাও নিখুঁতভাবে করা, বোঝাই যাচ্ছে লিপিকারেরই কাজ।’

‘প্রফেসর কি বললেন?’, প্রশ্ন করলাম আমি।

‘তাঁর ধারণা কলিঙ্গ অক্ষরগুলো দিয়ে একটা কবিতার মত বানানো হয়েছে, একটু ধাঁধাটে টাইপের।’

‘কি বলছে সে কবিতায়?’, আমি নৃকে জিজ্ঞেস করলাম।

‘প্রফেসর ভার্গব তেমন কিছু বলতে পারেননি এখনও। খুব বিজি মানুষ। তবে আমি বর্ণগুলো নিয়ে প্রচুর ঘেঁটেছি এ কয়দিন। মনে হয়েছে, কোন অদ্ভুত কিছুর কথা বলা হচ্ছে, তেমনটা কোথাও দেখা যায় না। কিছু প্রাচীন শব্দের সাথে মিল পাওয়া যায়, সেসব এখন হয় বিলুপ্ত নয় বিবর্তিত।’

‘যেমন?’

‘ধর দেখা যায় না, কিন্তু অস্তিত্ব আছে এমন কিছু, বাতাস টাইপের কিছু হয়ত, লিপিটায় নাকি সেটার অবস্থানও দেওয়া আছে। But does it really make any sense?’

‘চারপাশে নদীবেষ্টিত কোন জঙ্গলের কথা বলা হচ্ছে হয়তো। মাঝখানে একটা গাছ, চারপাশে নদীর ঢেউ।’

‘এমন তো কত জায়গাই আছে এই ভারতবর্ষে, আর দু’হাজার বছর আগে গোটা বঙ্গই জঙ্গলময় ছিল’, মাধব জানাল।

‘হ্যাঁ, তা ছিল বটে, আর তখন জঙ্গলে মানুষ খুব কম যেত, তবে যেত, কেননা রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনীগুলোয় প্রচুর বনজঙ্গলের ঘটনা আছে, ভারতফেরত অ্যালেকজান্ডারের সাঙ্গপাঙ্গরা জঙ্গলবাসী মানুষের কথাও লিখে গেছে। আমার কাছে সবচেয়ে বড় রহস্য মনে হচ্ছে ঐ ছয়টা ফোঁটা আর চতুর্ভুজটা’, কপাল কুঁচকে বলল নৃ, ‘অথচ ফোঁটাগুলা আজই প্রথম দেখলাম আমি।’

‘কি মনে হচ্ছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ফোটাগুলা তো এখানে ওখানে ছড়ানো!’

‘আমিও বুঝতে পারিনি, তবে প্যাটার্নটা ইরেগুলার হলেও একটা কিছু মিন করছে বলে খটকা লাগছে। ফোঁটা ছয়টা দেখে কিছু একটা মনে পড়তে গিয়ে পড়ছে না আমার।’

‘খিদেয় পেটে ছুঁচো ডন মারছে, চল কিছু খেয়ে নেওয়া যাক’, প্রস্তাব করলাম।

 

একটু বিরক্ত হল নৃ, তবে আমাকে নিরাশ করল না।

বিশাল প্রাতরাশ সারলাম। নৃ বরাবরের মতই একটু কম খেল, কোথাও বেড়াতে গেলে ও খুব কম খায়, তবে বিভিন্ন ফলমূল বেশ খেতে থাকে সারাদিন ধরে। মাধব চলে গেল ওর কিছু ব্যক্তিগত কাজে।

শুক্রবার হলেও বেশ কাজ জমে আছে আমারও। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা একটু গরম, প্রচুর অনুসন্ধানী রিপোর্ট পাঠাতে হচ্ছে ওপরে। কিছু রিপোর্ট  স্ক্রুটিনি করতে হবে। আমি নৃকে একা রেখে চলে গেলাম অফিসে। আমিও বেশ বুঝতে পারছিলাম, ও একা হতে চাচ্ছে। লিপিটাতে কোন দুর্জ্ঞেয় রহস্যের গন্ধ পেয়েছি আমরা সবাই। তবে দু’হাজার বছরে তা এখনও রহস্য আছে কি না, সেটাই বড় রহস্য।

ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। জানলাম নতুন কিছু আর উদ্ধার হয়নি। নৃ আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বগুড়া শহর দেখতে। এই সান্ধ্যভ্রমণটার কথা উল্লেখ করতেই হচ্ছে কেননা গল্পের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা সেসময়েই ঘটেছে।

সাত রাস্তার মোড়ে এসে ও জানাল ওর বাবা যখন সিরাজগঞ্জে চাকরি করতেন তখন বগুড়া আসা হত বেশ ঘন ঘন, আর আসলেই এখান থেকে ও প্রচুর গল্পের বই আর কমিক্স কিনত; সিরাজগঞ্জের চেয়ে বগুড়ায় বেশি বই পাওয়া যেত।

ঘুরতে ঘুরতে একটা দোকানে বঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন নগরী বগুড়ার বিখ্যাত দই খেলাম; খেতে খেতে নৃ শুধাল হাজার বছর আগেও এই বিখ্যাত দই ছিল কি না। আমি জবাব দিতে পারলাম না, তবে জানালাম এখনকার বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস খুব একটা পুরানো না। এ দইকে মূলতঃ খ্যাতিময় করেছেন গৌর গোপাল চন্দ্র ঘোষ নামের এক দুগ্ধব্যবসায়ী। বঙ্গভঙ্গ রদের সময় গৌর গোপাল ভারত থেকে বগুড়া আসেন পরিবার নিয়ে। বগুড়া থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে বর্তমানে শেরপুর উপজেলা সদরে তার আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় নেন। দই বানানোর পদ্ধতি তার জানা ছিল। শুরু করেন দইয়ের ব্যবসা; এর আগে দই এ এলাকায় তেমন প্রচলিতই ছিল না। শেরপুর থেকে দই বানিয়ে হেঁটে ভাড়ে করে আনতেন বগুড়া শহরের বনানী এলাকায়। দইয়ের সঙ্গে তিনি বানাতেন সরভাজা। এ সরভাজা এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় যে, ওই সময়ের জমিদারদের বাড়িতে সরভাজা সরবরাহের অর্ডার পেতে থাকেন গৌর গোপাল। সাধারণের মধ্যেও এ সরভাজার চাহিদা যায় বেড়ে। এ সরভাজাই গৌর গোপালকে এনে দেয় খ্যাতি। একটা সময় সরভাজাই সরার দই হয়ে খ্যাতির তুঙ্গে ওঠে। যে দইয়ের খ্যাতি বগুড়াকে পরিচিত করে দেশ ছেড়ে বিদেশেও। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দইয়ের এ সুখ্যাতিতে বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর নওয়াব পরিবার গৌর গোপালকে ডেকে তাদের প্যালেসের আম্রকাননে জায়গা করে দেন। ষাটের দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত সেইখানেই গৌর গোপালের উত্তরসূরিদের ঘর ছিল। বগুড়ার এই দই এক সময় বৃটেন, আমেরিকা, ভারত ও পাকিস্তান যেত বলে জানা যায়। পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে শেরপুরেই গড়ে তোলা হয় দইয়ের কারখানা। বগুড়ার দই বলতে আসলে শেরপুরের দইকেই বোঝায়।

‘কিন্তু…এই দইয়ের আসল রহস্য হল দুধে যা মানে ও স্বাদে অদ্বিতীয়, আর সেই দুধের রহস্য হল এই এলাকার মাটিতে জন্মানো ঘাসে!’, সহাস্যে জানাল নৃ। ‘এ জন্যই গৌর গোপাল এখানে এসেছিল।’

মজার ব্যপার হল সেই গৌর গোপালের দোকান আজও আছে বগুড়ায় তবে, তার পরিবার পঁয়ষট্টিতে আবার ভারতে চলে যায়। আরও বেশি মজা হল, সেই দোকানে বসেই খাচ্ছি বগুড়ার দই।

দই খেয়ে রওনা দিলাম করতোয়া নদীর ধারে, বগুড়ার প্রাণ বলা যায় যাকে। তীরে পৌঁছে পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকিয়ে নৃ গান ধরল, আজি যত তারা তব আকাশে…সবে মোর প্রাণ ভরি প্রকাশে! আকাশ জুড়ে আসলেই আজ অসংখ্য তারা। নৃ তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকল আর গানটা গাইল একেবারে ভেতর থেকে। বহুবার দেখেছি প্রকৃতি ওকে প্রায়ই বাকরুদ্ধ করে ফেলে।

‘রবিঠাকুরের এই গানটা কিন্তু পূজার গান, ঈশ্বরবন্দনার আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার গান!’, গান থামিয়ে বলল ও, ‘এমন আরও অনেক গান……’, আকাশপানে চেয়ে হঠাত থেমে গেল নৃ।

‘কি হল? কোন রকেট দেখলা নাকি? নাকি উল্কা?’

‘না কিছু না…চল এবার ফেরা যাক।’

নৃর এই আচরণটা আমার মেজাজ খুব খারাপ করে। কিন্তু ও মাঝে মাঝেই এমন করে, কিছুই বের করা যায় না মুখ থেকে, গহিন চিন্তায় ডুবে যায়। বাসায় ফিরে আমি খেতে বসতে চাইলাম কিন্তু ও বলল প্রচুর মিষ্টি খেয়েছে তাই রাতে আর খাবে না।

আমি ওরহান পামুকের একটা বই নিয়ে বিছানায় চলে গেলাম। ও লিপিটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পামুকের বইটা বেশ চুম্বকীয়, আমাকে টেনে ধরল। ঘন্টা দু’য়েক পর নৃর উল্লাসিত গলা শুনতে পেলাম, ভিগু না মিগু বলে চেঁচাচ্ছে মনে হল। আমি ধড়মড় করে বই রেখে ছুটে গেলাম ওর ঘরে।

‘ব্যপার কি? ইয়েতি কোত্থেকে আসল আবার?’

‘মানে??’, নৃ অবাক হল।

‘মিগু মানে তো ইয়েতিই, তাই না? ঐ যে তিব্বতের সেই অ্যাবোমিনেবল তুষারমানব!’

‘আরে ধুর, মিগু না ভৃগু! কি বলি আর কি শুন! ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য, অত্রি, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠ, মরীচি…এরা কারা, মনে পড়ে?’, শুধাল নৃ।

‘বশিষ্ঠ তো বিখ্যাত মুনিঋষি, মহাভারতে আছে, ছেলেবেলায় পড়েছিলাম উপেন্দ্রকিশোরের বইতে।’

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই, আর ওরা সাতজন হল সপ্তর্ষি, মানে সাত ঋষি, সপ্তর্ষিমণ্ডলের সাত তারকা, উরসা ম্যাজরের বিগ ডিপার, ঐ যে প্রশ্ন বোধকের মত চিহ্ন! এবার একটা ম্যাজিক দেখ’, বলে আমার ল্যাপটপ কম্পিউটারে ও সপ্তর্ষিমণ্ডলের একটা ছবি দেখাল, নির্ঘাত ইন্টারনেটে সার্চ করে পাওয়া, আর আমাদের লিপিটার ওপর একটা ট্রেসিং পেপার রাখল; তারপর লিপির ছয়টা বৃত্ত আর সেই গাছের মত ছবিটা ট্রেস করল। তারপর সেই পেপারটা ল্যাপটপের ওপর রাখল, প্রথমে কিছুই মিলল না। কিন্তু এরপর ও ল্যাপটপের ইমেজটা একটু জুম করতেই খাপে খাপে বসে গেল। গাছটা গিয়ে পড়ল, চতুর্থ তারার ওপর।

‘এই তারাটাই হল ভৃগু, এর কথাই লেখা আছে এই ছড়াটায়।’

‘কিন্তু তুমি যে সাতজনের নাম বললে তাতে তো ভৃগু ছিল না!’

‘সপ্তর্ষিমণ্ডলের ঋষিবর্গ কালের পরিক্রমায় চেঞ্জ হয়, একেক সময় একেক ঋষি, পিরিয়ডগুলাকে বলে মানবান্তর। প্রাচীন ভারতে অ্যাস্ট্রোনমি অনেক এগিয়ে ছিল, অন্তত গ্রীকদের তুলনায় তারা তারকা চেনায় বেশ পারদর্শি ছিল। এটা যে সময়ের লিপি সেসময় ভৃগুই ছিল চার নম্বর তারা, আবার স্থান ভেদেও পার্থক্য হয়ে থাকতে পারে। তবে সেটা এখন ইম্পরট্যান্ট না, লিপিটাতে এটাকে ভৃগুই বলা হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নাই। প্রফেসর ভার্গব কবিতায় ‘ভৃগু’ শব্দটা যে আছে তা নিশ্চিত করেছেন।’

‘কিন্তু ভৃগু দিয়ে কি বোঝাচ্ছে এখানে?’

‘সেটাই প্রশ্ন, তবে আমার মনে হয় যেহেতু তারার উন্নতি কোণ দিয়ে ভূপৃষ্ঠের কোন স্থানের অবস্থান লোকেট করা যায় আর প্রাচীন ভারতে এ জাতীয় ত্রিকোণমিতির ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল, সেহেতু লিপিটাতে হয়ত ভৃগুকে রেফারেন্স ধরে কোন স্থানের অবস্থান দেওয়া থাকতে পারে।’

‘খুব জটিল মনে হচ্ছে বিষয়টা।’

‘খুব একটা না হতে পারে, তবে বুদ্ধিটা একটু খাটাতেই হবে। চতুর্ভুজটা একটা ট্রাপিজিয়ামের মত, খেয়াল করেছ? এইবার একটা ব্যাপার দেখ।’, বলে নৃ ল্যাপটপে সেই চতুর্ভুজটার ছবিটা দেখাল। ‘আজকে ট্রেসিং আর স্ক্যান করে কম্পিউটারে নিয়েছি; দেখ এবার’।

ও ইমেজটা একটা সিম্পল ড্রয়িং সফটওয়্যারে ওপেন করল, তারপর ট্রাপিজিয়ামের অসমান্তরাল বাহুদুটো মাউস দিয়ে স্ট্রেইট লাইন এঁকে বিবর্ধিত করল, দুই বাহু কিছু দূর গিয়েই ছেদ করল। তারপর ছেদবিন্দুতে উৎপন্ন সূক্ষ্মকোণের মান বের করার জন্য চাঁদা চাইল আমার কাছে। ছিল না। আনিয়ে নিলাম পাশের একটা বাসা থেকে।

‘এই কোণটাই সম্ভবত আমাদের কাঙ্ক্ষিত লোকেশনের উন্নতি কোণ, সেই চতুর্থ তারকা অর্থাৎ ভৃগুর সাথে।’, কোণটা মেপে দুই হাত কোমরে রেখে বলল নৃ।

‘কিন্তু সমস্যা হল, হাজার বছর আগে সেটা যে অবস্থানে ছিল, তা কি এখনও একই জায়গায় আছে?’

‘এইটা খুবই জটিল ব্যাপার বটে!’, মাথা নাড়ল নৃ, ‘তারার অবস্থান প্রতি নিয়তই পালটাচ্ছে।’

‘কখন ভৃগু নক্ষত্রের এই অবস্থান ছিল তা কিভাবে নির্ণয় সম্ভব? তবে মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।’, বললাম আমি, ‘আমার ক্যাডেট লাইফের কিছু ফ্রেন্ড নেভিতে আছে। ওরা ন্যাভিগেশনে খুব ভালো। ওদের সাথে আলাপ করে দেখা যেতে পারে।’, আমি প্রস্তাব দিলাম।

‘আজই যোগাযোগ কর। Ursa Major এর মাঝখানের তারার কথা বোল, ধ্রুবতারা কিন্তু না।’

আমি কন্ট্যাক্ট করে ফেললাম, ওরা জানাল ব্যাপারটা সম্ভব, তবে মধ্যাহ্ন সূর্যের উন্নতি কোণ হলে খুব দ্রুত অবস্থানটা বলে দিতে পারত, এক্ষেত্রে একটু সময় লাগবে। ওরা প্রথমে সপ্তর্ষির সাথে ওদের স্ট্যান্ডার্ডের আপেক্ষিক অবস্থান বের করবে, তারপর সেটার সাথে তুলনা করে আমাদের প্রত্যাশিত স্থানের অবস্থান নির্ণয় করবে। ততক্ষণে নৃ এই ন্যাভিগেশন বিষয়টা নিয়ে ইন্টারনেটে খানিকটা ঘাঁটাঘাঁটি করে নিল।

 

 

পাঁচদিন পর। আমরা দু’জন এখন কটকা পেরিয়ে ক্ষীরখালির কাছে, জায়গাটা খুলনার সুন্দরবনের একেবারে গহীনে, যেখানে মানুষজনের যাতায়াত নেই একেবারেই। বাঘের ভয় তো আছেই, তাছাড়াও গাছ গাছালি এত ঘন যে মাটির ওপর দিয়ে চলাফেরা করা প্রায় অসম্ভব। বনের ভেতর দিয়ে একটা নৌকা নিয়ে চলেছি, বৈঠা বাওয়া, হরিপদ নামের এক মাঝির, তবে সে এখন নেই। আমাদেরকে নৌকাটা বেচে দিয়ে সে চলে গেছে, কটকার পর আর আসতে চায়নি। এখানে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার আনা নিষেধ, বন্যপ্রাণীকে বিরক্তি করা চলবে না। নৃ’র দেওয়া তথ্যানুযায়ী আমার নেভির বন্ধুরা যে জায়গার লোকেশন বের করেছে তা এই অঞ্চলেই। এক হপ্তার ছুটি ম্যানেজ করে চলে এসেছি। মাধবকে আনা সম্ভব হয়নি, ওর ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।

আসতে আসতে বৈঠা বাইছি আমি, পানিতে বৈঠার ছলাৎ ছাড়া কোন আওয়াজ নাই। নৃ’র হাতে একটা জিপিএস ডিভাইস, ওটায় স্থানাঙ্ক দেখে দেখে এগুচ্ছি আমরা। দুপুরের কাছাকাছি, কিন্তু সূর্যের দেখা নাই, আকাশে আজ খানিকটা মেঘ করেছে। রেঞ্জ অফিসারের কাছ থেকে একটা ড্রাগোনভ রাইফেল সংগ্রহ করেছি, সেটা সাথে আছে, বাঘের হাত থেকে বাঁচার জন্য।

‘এখানে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা কোটিতে এক’, ফিসফিস করে বলল নৃ, ‘তবুও এমন জায়গায় আসতে পেরে মন্দ লাগছে না, কি বল?’

‘তা বটে, এখন বাঘে ঘাড়টা না মটকালেই হয়।’, আমি কিছুটা বিরক্ত, বেহুদা প্রাণটা বাজি রাখতে আমার এত শখ নেই।

‘আমরা জায়গাটায় চলে এসেছি প্রায়,কিছু খেয়ে নেমে পড়ব’, জানাল নৃ।

‘কতদূর হাঁটতে হবে? নাকি একেবারে ধারেই?’

‘জানিনা এখনও, তবে খানিকটা ভেতরে যেতে হবে। ভয় পেও না, বেশিদূর যাব না।’

বনের কিনারা যেখানে নদীর সাথে মিলেছে সেখানে প্রায় সবখানেই প্রচুর শ্বাসমূল উত্থিত হয়েছে। ম্যানগ্রোভ বনের বৈশিষ্ট্যই এটা, জোয়ার ভাটার ব্যাপারটা ট্যাকল দিতেই এই প্রাকৃতিক সিস্টেম। আমরা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা একটা তটে নৌকা ভিড়ালাম।

ব্যাগ থেকে হটপটে রাখা এগ স্যান্ডউইচ ঝটপট বের করলাম, খেয়েই নেমে পড়লাম তীরে। সাথে সাথে পা গোড়ালি পর্যন্ত দেবে গেল কাদায়, দেখে মনে হচ্ছিল শক্ত মাটি। নৌকার কার্নিশ ধরে আবার ওপরে উঠে এলাম, জুতাটা রয়ে গেল কাদায়। নৃ হেসে ফেলল, ‘আমি কিন্তু সন্দেহ করছিলাম যে মাটিটা নরম কিন্তু বলার আগেই নেমে পড়লা, কি আর করার? দাঁড়াও, জুতাটা আগে তুলে আনি।’

জুতাটা গামবুট টাইপের, জঙ্গলে চলার উপযোগি, জুতার ওপর পড়তে হয়। আসল জুতা কিন্তু পায়েই আছে আমার।

নৌকা থেকেই হাত বাড়িয়ে তুলে আনল নৃ আমার গামবুটটা।

‘এখানে নামা যাবে না’, বলে চারপাশটা দেখতে থাকল ও। ঘন গাছে ছেয়ে আছে জঙ্গল। এই  সামান্য চওড়া কাদামাটির তটটা পেরলেই  পা রাখার মত মাটি দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে। ‘মনে হচ্ছে গাছের শেকড়ই ভরসা!’

নৌকা খানিকাটা সরাল নৃ, নদীর ধারে একটা গাছের গোড়ায় নিয়ে গেল, গোড়াটা  অর্ধেকটা পানিতে বলা চলে। তারপর ব্যাকপ্যাক পিঠে বেঁধে গাছের গোড়াটা ধরে ফেলল, বানরের মত ঘুরে মাটিতে নামল। ওখানে মাটিটা শক্ত। আমিও ওকে অনুসরণ করলাম।

‘আসলে প্রায় আধা মাইল ভেতরে যেতে হবে আমাদের, ঝোপঝাড়ের যে ঘনত্ব দেখছি তাতে অতটুকু যেতেই কয়েকঘন্টা লেগে যেতে পারে’, নৃ বেশ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল। প্রচণ্ড বিরক্ত হলাম কিন্তু আমি জানি ওকে ফেরান যাবে না। একটা ছোট কুঠার বের করল ও, ঝোপঝাড় কেটে সামনে এগুনোর জন্য। পিছু নিলাম ওর।

ব্যাগ থেকে এবার বড় একটা স্প্রে বের করল নৃ, নাপিতের দোকানে যেমন বোতল স্প্রে পাওয়া যায় সেরকমের। ওটা থেকে একটা হলদে তরল স্প্রে করতে শুরু করল, বিশ্রী দুর্গন্ধে চারপাশটা ভরে গেল!

‘কি ওটা?’, নাকমুখ কুঁচকে অবাক হয়ে জানতে চাইলাম আমি।

‘চিড়িয়াখানা থেকে সংগ্রহ করা নর বাঘের প্রস্রাব, বাঘ প্রস্রাব দিয়ে নিজের সীমানা চিহ্নিত করে, এক বাঘের প্রস্রাবের গন্ধ পেলে ঐ তল্লাটে আরেকটা বাঘ আসে না! কাল খুলনায় এসে পৌঁছেছে। আশা করি তোমার ড্রাগনভ ইউজ করতে হবে না।

‘তাই বলে এত বিশ্রী গন্ধ?’

‘প্রস্রাব থেকে কি তবে সুগন্ধ বেরুবে? কয়েকদিনের পুরনো, পচে গেছে কিছুটা হয়ত, কিন্তু কাজ ঠিকই হবে, বরং তীব্রতাটা আরও বেশি কাজে দেবে। চল এগোই’, কুড়ালটা দিয়ে একটা ঝুরি ছেঁটে ফেলল নৃ। আমি পিছু নিলাম।

জঙ্গলের ভেতরটার বর্ণনা দেবার ক্ষমতা আমার নেই, বিভূতিভূষণের বিবরণের মতই সুন্দর তবে ভয়ংকরও, বলা যায় ভয়ংকর সুন্দর, ঠিক সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতই। গাছের মধ্যে সুন্দরীই বেশি, তবে গেওয়া, গরান, কেওড়াও আছে। মাঝে মাঝে গাছের ঝুরি আর শেকড়বাঁকর এমনভাবে প্যাচিয়ে আছে, মনে হয় এখানে হাজার বছর মানুষের পা পড়েনি। গাছের কিছুদিন আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে একটা দল এসেছিল বাঘের ওপর ডকুমেন্টারি তৈরি করতে, তারাও নাকি এতদূর আসেনি। এখানে কেউ আসে না, প্রচুর কুসংস্কার আছে এ জায়গা ঘিরে।

খানিক সামনে আরও ঘন হল জঙ্গল, প্রচুর পোকা মাকড়, বিশেষত মাকড়শা আর পিপড়া টাইপের। নৃ ভয় পেতে মানা করল, বলল পর্যাপ্ত ওষুধ এনেছে, সাপে কামড়ের জন্য অ্যান্টিভেনম পর্যন্ত এনেছে, আর এ জঙ্গলে নাকি বিষাক্ত পোকামাকড় নেই। এখন গাছের ওপর দিকে বানর দেখা যাচ্ছে, নৃ জানাল ভালো লক্ষণ, বাঘ আসার সম্ভবনা কম। বানরগুলা আমাদের দেখে পালাল, নৃ বলল এরা আগে মানুষ দেখেনি মনে হচ্ছে। অর্থাৎ জায়গাটাতে আসলেই মানুষের পা পড়েনি বহু বছর।

‘আমাজনে অনেক জায়গা আছে যেখানে মানুষের পা পড়েনি, কিন্তু এখানে? মাত্র ষোলশো বর্গমাইল বন, তার ওপর ভেতর ভেতর অনেক জায়গাতেই মানুষের বসত আছে।’, মনে প্রশ্ন জাগল আমার।

‘শুধু আমাজনে না, কঙ্গোর জঙ্গলেও অনেক জায়গায় মানুষের পা পড়েনি এখনও। আমার মনে হয় সুন্দরবনের কিছু জায়গাতেও হয়ত বহুকাল মানুষের পা পড়েনি। কুমির আর বাঘের ভয়, সেই সাথে আমরা খুব একটা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় জাতি নই, তাই না? এমন হতে পারে এখান থেকে আধ মাইল দূরে মানুষ এসেছে কিন্তু ঠিক এইখানটায় আসেনি!’, নৃ মতামত দিল।

সামনে পড়ল বিশাল একটা মৌচাক, জীবনে এত বড় দেখিনি। প্রায় দশফুট নেমে গেছে গাছের ডাল থেকে, ঝুলছে ভয়ঙ্করভাবে। নৃ সাবধান থাকতে বলল। সেইসাথে এটাও প্রমাণ হল, মাওয়ালীরাও এদিকটায় আসেনি বহুদিন, নয়ত চাকটা এত বড় হতে পারত না।

‘চলে এসেছি প্রায়’, জিপিএসের দিকে তাকিয়ে বলল নৃ । প্রায় ঘন্টা খানেক লেগে গেছে আমাদের গন্তব্যের কাছে পৌঁছাতে। ততক্ষণে আমাদের দুজনেরই হাত, মুখ আর ঘাড়ে কিছু কিছু জায়গা ছড়ে গেছে, আপাতত অ্যান্টিসেপ্টিক মলম ডলে দিয়েছি।

‘কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না’, চারপাশটা দেখতে দেখতে বললাম।

‘বিষয়টা খুবই অনিশ্চিত তবুও এইখানটা কেমন যেন একটু আলাদা আলাদা ঠেকছে।’, নৃ’র চোখে মুখে চিন্তার ছায়া দেখতে পেলাম।

‘কেমন আলাদা?’

‘কি যেন, কি যেন…’, বিড়বিড় করতে করতে চারপাশটা খুব ভাল করে পর্যবেক্ষণ করল নৃ। হঠাৎ  বলে উঠল, ‘ইয়েস, পেয়েছি, এখানে কোন প্রাণী দেখা যাচ্ছে না, স্পাইডার বা পিঁপড়া পর্যন্ত না, খেয়াল করেছ?’

‘আরে তাই তো! ব্যপারটা কি?’

‘নিশ্চয় কোন ঘটনা আছে। আমরা একেবারে পয়েন্টে চলে এসেছি, জানিনা কি আছে এখানে, তবে সাবধানে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।’

আমরা ঘুরে গেলাম সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে, পিঠে পিঠ লাগিয়ে চারপাশে চোখ রাখলাম সতর্কভাবে। জঙ্গলে দুইজনই একই দিকে চোখ রাখলে অন্যদিক থেকে আক্রমণ আসতে পারে, তাই এভাবে পজিশন নেওয়াই নিরাপদ। মনে হচ্ছে যেন অদৃশ্য কেউ আমাদেরকে দেখছে, কিন্তু আমরা তাকে দেখতে পাচ্ছি না। আমি ড্রাগোনভ হাতে নিয়ে ফেলেছি ততক্ষণে। নৃ’র হাতেও একটা পিস্তল, ওটাও আমিই রেঞ্জ থেকে ম্যানেজ করে দিয়েছি।

‘ঐ দিকটা একেবারে ফাঁকা মনে হচ্ছে, জঙ্গলের মধ্যে ফাঁকা কেন?’, ফিসফিসালো নৃ। ‘চল, ওখানে যাওয়া যাক’, খেয়াল করলাম, একটু কাঁপছে ওর গলা।

ঘুরে দেখলাম কয়েক গজ সামনেই একটা বড়সড় মাঠের মত ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে। পা টিপে টিপে এগুলাম। কি যেন একটা অস্বাভাবিক কিছু আছে ওখানে, আমাদের দুজনেরই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সিগন্যাল দিল।

‘জঙ্গলের মধ্যে ফাঁকা জায়গা থাকে মাঝে মাঝে, হরিণ চরে সেসব জায়গায়, বাঘের শিকারের লোকেশন। কিন্তু এত বড় মাঠ?’

মাঠটা আসলেই বিশাল, প্রায় দুইটা ফুটবল মাঠের সমান বড়! সবুজ ঘাসগুলো তিন চার ইঞ্চির মত উঁচু, ঘন বুনটের ভেলভেটের মত আস্তর তৈরি করেছে। সচারচর সুন্দরবনের ভেতরে এমন মাঠের ঘাসগুলো হয় বেশ উঁচু, আড়ালে বাঘ পর্যন্ত গুঁড়ি মেরে ওঁত পেতে থাকতে পারে। কিন্তু এখানে অত উঁচু ঝোপঝাড় নেই, পুরাই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

‘ঘাসের দিকে তাকিয়ে লাভ নেই, তৌফিক, আকাশের দিকে চেয়ে দেখ।’, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল নৃ। আমি তাকালাম। কিছুই দেখতে পেলাম না।

‘কি দেখতে পেয়েছ? আমি তো কিছু দেখছি না’, আমি ওর দৃষ্টি লক্ষ্য করে আকাশের দিকে তাকালাম। শুধু মেঘ আর মেঘ, তবে খুব ঘনকাল না, ধূসর । তবে একটা পরিষ্কার ঝকঝকে আলোয় ভরে আছে চারপাশটা, সূর্যের আলোর হলদে ছটা নেই।

‘আকাশের দিকে খুব ভালো করে তাকিয়ে থাক খানিকক্ষণ, দৃষ্টি সরিও না’, নৃ এখনও ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে আছে শূন্যপানে।

এবার তাই করলাম। প্রায় তিরিশ সেকেন্ড লাগলো আমার জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্য অভিজ্ঞতাটা অনুভব করতে। ধীরে ধীরে আকাশের গায়ে চুলের চেয়েও চিকন কিছু রেখা দেখতে পেলাম, আরও ভালো করে ঠাহর করে দেখলাম, সেগুলো মাকড়সার জালের মত সারা আকাশটাই ছেয়ে আছে। এক দেখায় বোঝা যায় না। এত চিকন সেই জালের সুতো, খুব সহজেই বিভ্রম সৃষ্টি হচ্ছে। দৃষ্টি নিচে নামিয়ে দেখলাম জালটা একেবারে মাঠের ওপরে এসে নেমেছে।

এবার নৃ এক অদ্ভুত কাজ করল, মাঠের ভেতর একটু এগিয়ে গেল। সাথে সাথেই জালের গায়ে আটকে গেল ওর হাত। আমি ওর দিকে ছুটে গেলাম। ও খুব আস্তে আস্তে জালটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর জালের সুতোগুলো হাতের তালুতে নিয়ে দেখল। সুতোগুলো সবুজ, এত পাতলা তন্তু আমি কোথাও দেখিনি, মনে হল কয়েক’শ গাছি এক করলে আমাদের চুলের মত হবে।

‘তৌফিক, এটা একটা গাছ! কোন মাকড়সা বা পোকামাকড়ের  তৈরি করা জাল না!!’

‘কিভাবে সম্ভব?’

‘নেড়ে দেখ হাত দিয়ে!’

আমি হাত দিলাম, সুতাগুলোর চারপাশে একটা অবয়বের স্পর্শ পেলাম, কিন্তু পুরাই স্বচ্ছ সেটা, মনে হল পানির মত কিছু। বুঝতে পারলাম, ওগুলো আসলে গাছের পাতা, সবুজ সুতোগুলো আসলে পাতার শিরা উপশিরা আর লতা টাইপের কিছু। নৃ জানাল, পানির মত হলেও পাতার ভেতরের ঐ তরলের প্রতিসরাংক প্রায় বাতাসের কাছাকাছি অথবা পাতার ভেতরে এমন কিছু বিশেষ সজ্জায় সজ্জিত আছে যা প্রাকৃতিকভাবেই প্রচণ্ড নিখুঁত একটা প্রতিসরণীয় ক্যামুফ্লাজ তৈরি করেছে। সেজন্যই পাতাটা দেখা যাচ্ছে না। তবে সবুজ শিরা উপশিরাগুলাই সালোকসংশ্লেষণের কাজ করে চলেছে।

‘কিন্তু কাণ্ড কোথায়?’

‘ওটাও ট্রান্সপারেন্ট! কিন্তু আর সামনে যাওয়া ঠিক হবে না। হাজার বছর ধরে বনের প্রাণীরাও এ জায়গাটা থেকে দূরে থেকেছে, বংশপরম্পরায় এটার বিপদ সম্পর্কে সিগন্যাল পেয়ে এসেছে।’

‘আমরা কিছু অংশ কেটে নিয়ে যেতে পারি।’, প্রস্তাব দিলাম আমি।

‘আমার মন বলছে ব্যপারটা ঠিক হবে না! এটার সাথে কোন অতিপ্রাকৃত কিছু জড়িয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে, একে বিরক্ত করা উচিত হবে না।’, নৃ চিন্তিত মনে বলল।

‘এটা কোন যৌক্তিক কথা হল? হাজার হাজার বছর ধরে একটা চাপা পড়ে থাকা রহস্য এভাবে ধামাচাপা দিয়ে চলে যাব? এটা তো একটা গাছ, প্রাণী নয় যে খেয়ে ফেলবে!’

‘সব রহস্যের উদ্ঘাটন মানুষের মঙ্গল বয়ে আনেনি।’

আমি নৃর কথা এবার শুনতে চাইলাম না। ব্যাকপাকে একটা বাউই নাইফ ছিল, বের করে কিছু সুতা কাটতে গেলাম। নৃও দেখলাম আর কিছু বলছে না, অর্থাৎ ওরও আসলে সায় আছে। মন আর মাথা সবসময় একসাথে চলে না।

কিন্তু এবার ঘটল জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা। যেই না কিছু সুতো ছুরিতে প্যাচিয়ে টান দিয়েছি সাথে সাথেই পাতাগুলো থেকে ফিনকি দিয়ে পানির মত তরল বেরিয়ে এল। হাতে লাগল, দেখলাম পুরাই পানি! কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ হল না, একের পর এক পাতাগুলো ফাটতে শুরু করল পানি ভরা বেলুনের মত, আমি যেখান থেকে কেটেছিলাম সেখান থেকে সংক্রামিত হল, গোটা গাছের সমস্ত পাতায় পাতায় ছড়িয়ে পড়ল সেই জলবিস্ফোরণ!

‘পালাও, তৌফিক, সর্বনাশ হয়ে গেছে!!!’

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সমস্ত পাতা ফেটে পড়ল। লাখ লাখ গ্যালন পানি নির্গত হল গোটা মাঠ উপচে গেল মুহুর্তে, জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেল পুরা অঞ্চল। পানির তোড়ে আমরা দুজনেই ভেসে গেলাম। মুহুর্তের মধ্যেই প্রায় দশ ফুট উঁচু হয়ে গেল পানির লেভেল। অদ্ভুত ব্যাপার হল পানির তীব্র স্রোত আমাদের দুজনকেই সেই পথ দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল যে পথে আমরা এসেছি! পথটা যেহেতু পরিষ্কার করাই ছিল, খরস্রোতা পাহাড়ি ঢলের মত আমাদের কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদীর ধারে এনে ফেলল, নৌকোর একেবারে কাছেই, আমরা গাছের ডালপালা ধরে আটকানোর চেষ্টা করিনি, স্রোত এত বেশি ছিল যে ডাল ভেঙে যাচ্ছিল, নয়ত হাত ছিঁড়ে যাবার দশা হচ্ছিল। পরে নৃ হিসেব করে বলেছিল ওইখানটা বেশ উঁচু ছিল কিন্তু একটু একটু করে এগোনোয় আমরা প্রথমে ঢালটা বুঝতে পারিনি, চূড়াটাও উঁচু হয়েছে একটু একটু করেই। ঐ গোটা মাঠ জুড়েই ছিল ঐ গাছটা, আর ছিল অনেক উঁচু পর্যন্ত, কয়েক’শ ফুট হওয়াও বিচিত্র না, নয়ত অত পানি আসল কোথা থেকে? আর পানিভর্তি অদৃশ্য পাতাগুলো ছিল অনেক ঘন।

ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অবস্থায় নদীর পাড়ে দু’জনেই মড়ার মত পড়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। স্নায়ুর ওপর দিয়ে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেছে। নৃ একটা পায়ে বেশ আঘাত পেয়েছে মনে হল। আমার কাঁধে ভর দিয়ে নৌকায় উঠল ও। কিছু পানীয় রাখা ছিল, নৌকায়, দু’জনে চুমুক দিলাম।

‘ওখানে গিয়ে আর কিছুই পাওয়া যাবে না। হাজার বছরের রহস্য একেবারে বিনাশ করে আসলাম। পানির সাথেই মিশে গেল পানি। এমনকি আমি সবুজ শিরা উপশিরাগুলাও পানিতেই গলে যেতে দেখেছি! গাছটা আসলে প্রকৃতির এক অবাক বিস্ময়, হাজার হাজার বছর ধরে বেড়ে উঠেছে, অনেক আগে কোন ঋষিমুনি হয়ত দেখতে পেয়েছিল, তাঁরা জঙ্গলে যেত ধ্যান করতে, তারপর সংকেতে লিখে রেখেছিল ওই শিলালিপিটায়। কেউ বিরক্ত করতে আসেনি বহু শতাব্দী, আমরাই ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম। ঐ সংকেতের মানে ছিল আসলে এটাই, খোলা চোখ আর বন্ধ চোখ দিয়ে অপটিক্যাল ইলুশনের কথাই বলা হয়েছে। দয়া করে এটা নিয়ে আর কোন গল্প লিখো না’, নৃ ক্লান্ত খসখসে গলায় অনুরোধ করল।

‘লিখলে কোন সমস্যা নাই, কেউ বিশ্বাস করবে না, কিন্তু দারুন একটা অ্যাডভেঞ্চারের মজা নিতে পারবে হয়ত’, আস্তে আস্তে দাঁড় বাইতে বাইতে বললাম আমি।