পরিযায়ী // তারিক হাসান

আকাসিয়া গাছের চাঁদোয়ার নিচে দাড়িয়ে আকাশ তাকিয়ে থাকে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিধোঁয়া আকাশের দিকে । প্রায়ই এসে দাড়ায় ও এ জায়গাটায় । বিশাল লাঙ্গানো হ্রদের এক নির্জন উঁচু পাড়ে এ গাছটা ওকে বিশ্বচরাচর ভুলিয়ে দেয়। অবিশ্বাস্যসুন্দর রূপালী তারাভরা কৃষ্ণনীল রাতের নির্জনতায় নিচের পাথুরে তীরে আছড়ে পরা ঢেউগুলোর শব্দ বড় অপার্থিব মনে হয়। যেদিন জোছনা, সেদিন ওর মন কেমন করা দিন । বহু হাজার মাইল দূরে এক ছোট্ট, শ্যামল দেশের এক নিভৃত গ্রামে ওর শেঁকড় পোতা। মায়ের বড় নেওটা ছিল ও। রাতের এই নিস্তব্ধতায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার এই আঁচলের নিচে আকাশ ওর মাকেই কি খুঁজে ফেরে? প্রশ্নটা মাঝে মাঝে উঁকি দেয় ওর মনে । প্রশ্নের উত্তর নিয়ে কেউ তর্ক করেনি ওর সাথে, ওটা যে রয়ে গেছে ওর মনেই। দূর থেকে জংলী জানোয়ারের সংকেত মেলে , রাত অনেক হ’ল । এবার ফিরতে হবে ওর কোয়ার্টারের সীমানার নিরাপত্তায়। ফিরতে হবে বাস্তবতায়।

 

যেতে যেতে প্রতিরাতে ওর রুটিন চিন্তা চলে । আজো এল । যেদিন প্রথম এসে নেমেছিল ও এই বিশাল দেশটার এই নিভৃত এলাকায়, একটু ভড়কেই গিয়েছিল । পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল একটি দেশ থেকে ও এসেছে । এমনকি সেই নিভৃত পল্লীর নির্জনতাও এখানকার তুলনায় কিছুইনা ।  আগেও কাজ করেছে আকাশ জনমানবহীন সভ্যতাবিবর্জিত জায়গায় । ওর কাজটাই এমন । কন্সট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বিভিন্ন জায়গায় মানুষের স্বপ্নসৌধ বানানোই ওর পেশা । আর নতুন দেশের নতুন অ্যাডভেঞ্চার ওর নেশা । জায়গাটার নাম সাবানা । মা প্রায়ই ঠাট্টা করতো নামটা নিয়ে । ইথিওপিয়ার দক্ষিণ কোণে অনেক অনেক হ্রদ আর পাহাড়ের সম্মিলন । তার মাঝেও এ জায়গাটাকে ওর ভিন্ন মনে হয় । একটা নেশা ধরানো ব্যাপার আছে । শান্ত, শীতল একটা জায়গা, আদর্শ ট্যুরিস্ট স্পট । লাঙ্গানো হ্রদের পানি লাল, প্রাকৃতিকভাবেই। হ্রদের পাড়ে প্রায় খাড়া উঠে গেছে দুশো ফিট মতন, তারপর একটা সমতল চাতাল যেন। এখানেই হচ্ছে নতুন ট্যুরিস্ট রিসোর্ট। পুরো এলাকাটার কেন্দ্র যেন এটা । রিসোর্টের সদ্য বানানো টাওয়ার থেকে পুরো এলাকাটা চোখে পড়ে । বানাতে বানাতেই এই টাওয়ারটার সবচে’ উঁচু পয়েন্টটা হয়ে গিয়েছিল ওর সবচে’ পছন্দের জায়গা । ঐ জায়গাটা থেকে ও দেখতো পুরো এলাকাটাকে । দেখতে দেখতে একদিন চোখে পড়ে গিয়েছিল হ্রদের পাড়ের ঐ নির্জন গাছটা । তারপর থেকে সান্ধ্যরাতের নিত্যসঙ্গী আকাসিয়া ।

 

মাসে দু’দিন যাওয়া হয় কাছাকাছি শহরে । প্রতিদিনই যাওয়া যায়। কিন্তু ওর ইচ্ছে হয়না। শহরে যাওয়ার অর্থ হ’ল নিজ দেশে কথা বলতে পারা; ইন্টারনেটের লাইন পাওয়া যায় ।  কোন কোনদিন কানেকশন মেলেনা , নেটওয়ার্ক খারাপ থাকে । আগে বড় বিরক্ত হতো আকাশ । যেদিন থেকে মা হারিয়ে গেলেন অজানার দেশে, আকাশের বুকের একটা তার ছিড়ে গিয়েছিল – ওকে বেধে রেখেছিল দেশের সাথে যেগুলো, তার মাঝে সবচে শক্ত তারটা। সেই থেকে ও আর বিরক্ত হয়না । ওর তিন বোন আর দুই ভাই বহুবার করে বলেছে যেন ও কথা বলে । বলেছে ওকে ফিরে যেতে । ফেরার সময় এখনও হয়নি । লম্বা সময় ধরে বানানো হচ্ছে এই রিসোর্টটা । প্রজেক্টের সবচে’ লম্বা সময় ধরে কাজ করছে ও । অনেকেই এসে কাজ করে চলে গেছে, ও যায়নি। রিসোর্ট প্রজেক্টের কর্ণধারও ওকে নিয়ে খুব খুশি – লোকটা কাজের মানুষ চেনে । যে ছোট্ট, শ্যামল দেশ থেকে আকাশ এসেছে, সে দেশের মানুষ আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে । কখনো কাজে, কখনো নেশায় । কিন্তু এই দেশটায় এখনও খুব বেশি এসে পৌছেনি । এমনকি ইথিওপিয়ার রাজধানীতেও খুব বেশি বাংলাদেশি নেই, যদিও কাজের সুযোগ কম নয়। সবসমেত শ’খানেক নিজের দেশের মানুষ হবে হয়তো । শুনেছে কিছুদিন হলো দূতাবাস খোলা হয়েছে। কয়েকবার দাওয়াতও এসেছে ওর নামে ই-মেইলে বিভিন্ন উৎসবের আগেভাগে । ওর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

 

আজ দিনটা বিশেষ ছিল। দু’বছর আগে এ দিনে মা চলে গিয়েছিলেন । প্রচন্ড বৃষ্টির সময় ছিল । বৃষ্টি হ’লেই সব যোগাযোগ বন্ধ। ফোন, ইন্টারনেট স’ব । পাঁচদিন পরে জেনেছিল মা নেই । সময় কালো সবুজ বর্ণের ক্ষত দিয়ে গিয়েছিল । বহু না থাকায় আস্তে আস্তে বন্ধু-বান্ধবীদের গড়িয়ে যাওয়া সময়ের আড্ডায় ওর অনুপস্থিতি প্রাসঙ্গিক হ’ল। আর আয়ত চোখের যে মানুষটি বড্ড কথা শোনাতো, সেও হারিয়ে গেলো কিছু না বলেই – বর্ষাদিনের ঘেসো ঘ্রাণের মত । বাদলা দিনের প্রথম কদমের সাথে ওর মিতালী হারিয়েছে সে বহুদিন । অঘ্রাণের পিঠা-পুলি আর নবান্ন উৎসব বহু পুরনো স্মৃতি হয়ে মাঝে মাঝে মনে করায় ভালো লাগা দিনগুলির বড্ড অনায়াসে চলে যাওয়া ।

 

রিসোর্টের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । আর দু’মাস প’রে রিসোর্টের শেষ পর্যায়ের কাজ শুরু হবে কিন্তু তার আগে বড় কাজগুলোর সাথে সাথে আকাশের কাজ শেষ হবে । প্রজেক্টের বিদেশী কর্ণধার ওকে অন্য কাজ সেধেছিলেন; এমন কাজের লোক পাওয়াই যায়না। আকাশ রাজি হয়নি । মায়া পড়ে গেছে এখানে, যেতে হবে তাই । এই প্রকৃতির নিয়ম । পুরো দিনের কাজের শেষে চলতি পথে ছোট ছোট অপুষ্ট ছেলেগুলো ভেড়ার পাল নিয়ে ওর গাড়ির পথে ভিড় জমাতো; ছেলেগুলোর ঘনকালো মুখগুলো খুব আপন হয়ে যেত তখন । লাঙ্গানো হ্রদের লাল লাল ঢেউ, আকাসিয়ার মৌন উপস্থিতি, নীরব রাতে তারাদের সাথে সখ্যতা আর ফেরার পথে পথফুলেদের কুর্নিশ মনে পড়বে । তবুও যেতে হবে । হয়তো কিছু হারাবে, হয়তো কিছু প্রাপ্তি যোগ হবে জীবনখাতায় । নতুন দেশে নতুন কোন সৌধের কাজ শুরু হবে । কিছু ব্যাপার সনাতন রয়ে যাবে, পার্থিব রয়ে যাবে – এক আকাশের নিচে । দেশে দেশে ভিন্ন বেশে ঋতু নির্বিশেষে যাযাবরের পথচলা চলবে ।

 

আদ্দিস আবাবা, ইথিওপিয়া